খেলা ও ধুলা

আফগানরা ভারত-পাকিস্তানকে হারিয়ে দিলেও সেটা অঘটন হবে না

ডিজিটাল স্কোরকার্ডে তখন লেখা উঠেছে, Afganistan beat Sri Lanka by 91 runs… দলের জার্সি পরে মাঠে আসা কয়েকশো শ্রীলঙ্কান সমর্থকের চোখেমুখে তখনও অবিশ্বাস, যদিও ম্যাচে হেরে যাওয়াটা নিশ্চিত হয়ে গেছে আরও বেশ খানিকটা আগেই। বাংলাদেশ নাহয় বলেকয়ে শ্রীলঙ্কাকে হারায়, কিন্ত আফগানিস্তানের কাছেও যে তারা হেরে যাবে, সেটা হয়তো সমর্থকদের ভাবনার রাডারেও ছিল না। সমর্থকেরা আবেগে ভাসেন, নইলে তাদের বোঝা উচিত ছিল, গত কয়েক বছরে আফগানিস্তানের ক্রিকেট যেভাবে এগিয়েছে, আর শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট যেভাবে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে, তাতে রশীদ খানদের কাছে ম্যাথিউসদের হারটা ‘অঘটন’ নয় মোটেও।

ক্রিকেট দুনিয়ায় সবচেয়ে দ্রুত উন্নতির পথে এগিয়েছে বোধহয় আফগানরাই। যুদ্ধবিদ্ধ্বস্ত এই দেশটা থেকে দারুণ প্রতিভাবান কিছু খেলোয়াড় একই সময়ে বেরিয়ে এসেছেন। ২০১৪ সালের এশিয়া কাপে বাংলাদেশকে হারিয়ে তারা জানান দিয়েছিল, প্রতিপক্ষের জন্যে আতঙ্ক হয়েই এসেছে তারা। এরপর থেকে উন্নতির গ্রাফে আফগান ক্রিকেটের পথচলাটা কেবল উর্ধ্বমুখী। আইসিসির সহযোগী দেশগুলোর মধ্যে টানা কয়েক বছর সেরা পারফরম্যান্স ধরে রেখেছিল তারা, সেটার পুরস্কার হিসেবে তো টেস্ট স্ট্যাটাসও পেয়েছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে-টি-২০ সিরিজ জিতেছে, জিম্বাবুয়েকে নাকানী চুবানি খাইয়েছে একটানা। ক’দিন আগে তো বাংলাদেশও টি-২০ সিরিজে ধবলধোলাই হয়েছে এই দলটার কাছে। 

আফগানিস্তান, এশিয়া কাপ, রশীদ খান, মোহাম্মদ নবী, মুজিব উর রহমান, লেগস্পিন

সব দলেরই এক বা একাধিক ‘সোনালী প্রজন্ম’ থাকে। এখন মাশরাফি-সাকিব-তামিম-রিয়াদ-মুশফিকদের এই প্রজন্মটা যেমন আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসের গোল্ডেন জেনারেশন, ঠিক তেমনই এই মূহুর্তে আফগানিস্তানেও তাদের সোনালী প্রজন্মের ক্রিকেটারেরাই মাঠ কাঁপাচ্ছেন। শেহজাদ-ইহসানউল্লাহ’র উদ্বোধোনী জুটিটা দারুণ, রহমত শাহ, হাশমাতুল্লাহ বা আসগার আফগানের বড় ইনিংস খেলার সামর্থ্য আছে পুরোপুরি, দ্রুত উইকেট পড়ে গেলে ইনিংস মেরামতের কাজটাও তারা দারুণ পারেন। শেষদিকে নেমে রানের চাকা দ্রুত ঘোরানোর কাজটা করছেন মোহাম্মদ নবী বা নাজিবুল্লাহ জাদরান। এমনকি লেজের দিকে রশীদ খানও দারুণ সব ছক্কা হাঁকাতে জানেন!

তবে ব্যাটিং নয়, আফগানিস্তানের মূল শক্তির জায়গাটা তাদের বোলিং। লেগস্পিন বিস্ময় রশীদ খান তো আছেনই, অফব্রেকে ব্যাটসম্যানদের নাকাল করতে জুড়ি নেই মুজিব উর রহমানের। সতেরো বছরের এই তরুণ উনিশ ওয়ানডে খেলে ৩৯টি উইকেট ঝুলিতে পুরে নিয়েছেন ইতিমধ্যেই! রশীদ তো রেকর্ডই করে ফেলেছেন, দ্রুততম শত উইকেটের মালিক হয়ে। সাথে আছে মোহাম্মদ নবীর ডানহাতি অফব্রেক। বোলিঙে দারুণ এই ভ্যারিয়েশনই আফগানদের সাফল্যের অন্যতম কারণ। 

রশিদ খান, আফগানিস্তানের ক্রিকেট, লেগস্পিন, সানরাইজার্স হায়দরাবাদ

দুইপ্রান্ত থেকে সমানে স্পিনিং অ্যাটাক শুরু করে প্রতিপক্ষকে বিপদে ফেলতে জুড়ি নেই আফগানিস্তানের। বিশ্বজুড়ে এত জায়গায় ফ্র‍্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট খেলে বেড়ানোর পরেও রশীদ তো এখনও ব্যাটসম্যানদের কাছে মোটামুটি দুর্বোধ্য রয়ে গিয়েছেন, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুজিব আর নবীর অফব্রেক। দুই প্রান্ত থেকে বলের দুই রকমের ঘুর্ণি ব্যাটসম্যানদের বিভ্রান্ত করে মূহুর্তেই, মূল্যবান উইকেটটা ছুঁড়ে আসতে বাধ্য হন তারা। সন্ধ্যার পরে এই কণ্ডিশনে বলের সুইং কিভাবে আদায় করে নিতে হয়, সেটা আফগান স্পিনারদের চেয়ে ভালো বোধহয় কেউই জানে না। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দশ উইকেটের ছয়টাই পেয়েছেন এই তিন স্পিনার, অপর দুটো পেয়েছেন পেসার গুলবদন নাইব।

আফগানদের এই দলটা বেশ তরুণ, দলের প্রতি তাদের ডেডিকেশনটাও দেখার মতো। একেকটা রান ঠেকাতে ফিল্ডারেরা বদ্ধপরিকর থাকেন যেন। এক রশীদই যেমন ভীষণ স্বতস্ফূর্তভাবে সারা মাঠে দাপিয়ে বেড়ান, সেটা নিশ্চিতভাবেই বাকীদের ভেতরের তেজটাকেও বের করে আনে। তার ওপর আরব আমিরাতের এই কণ্ডিশনটা এই দলের খেলোয়াড়দের ভীষণ পরিচিত। পুরো স্কোয়াডের সবার মিলে এখানে মোট ২২৭ টি ওয়ানডে ম্যাচের অভিজ্ঞতা আছে, এশিয়া কাপের অন্য যেকোন দলের চেয়ে ঢের বেশি যেটা! এই অভিজ্ঞতাও তাদের বাড়তি সুবিধা এনে দিচ্ছে এই আসরে। পরিচিত কণ্ডিশনের সুবিধাটা ভারত-পাকিস্তান বা বাংলাদেশের চেয়ে অনেকটা বেশিই পাচ্ছে আফগানিস্তান। 

আফগানিস্তান, এশিয়া কাপ, রশীদ খান, মোহাম্মদ নবী, মুজিব উর রহমান, লেগস্পিন

এই দলটার আরেকটা জিনিস বেশ ভালো লাগে, সেটা ওদের উত্তুঙ্গ আত্মবিশ্বাস। ওরা কি পারবে, কতটুকু পারবে সেটা মাঠেই প্রমাণ হবে। কিন্ত খেলা শুরুর আগেই যেভাবে তারা প্রতিপক্ষকে চেপে ধরতে চায়, মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে চায়, সেই অ্যাপ্রোচটা দারুণ প্রশংসনীয়। অনেকে হয়তো রশীদ বা নবীদের এশিয়া কাপ জেতার বাসনা নিয়ে হাসাহাসি করবেন, কিন্ত সত্যিটা হচ্ছে, দলের স্পিরিটটা অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয় এই কথাগুলো। রশীদ যখন বলেন তারা বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবছেন না, এশিয়া কাপ জেতাটাই তাদের লক্ষ্য, তখন কিন্ত আলতো করে ‘এই ম্যাচ জিততেই হবে’ টাইপের প্রেশারটা বাংলাদেশ দলের ওপরেই চলে আসে। এই মাইন্ড গেমগুলো নবীন আফগানিস্তান ভালোই খেলছে।

এবারের এশিয়া কাপ জেতার সামর্থ্য হয়তো আফগানিস্তানের নেই। তবে এই দলটাকে হেলাফেলা করার সুযোগও নেই। খর্বশক্তির বাংলাদেশ তো বটেই, বাগে পেলে পাকিস্তান কিংবা ভারতকেও হারিয়ে দেয়ার সামর্থ্য আছে তাদের। এশিয়া কাপের সুপার ফোরে এরকম ঘটনা ঘটলেও অবাক হবার কিছুই থাকবে না, আর সেগুলোকে অঘটনা বলাটাও উচিত হবে না বোধহয়…

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close