খেলা ও ধুলা

আফগানরাও খেলে, আমরাও খেলি…

একই সময়ে দুটো ম্যাচ হচ্ছে, একটা দুবাইতে, অন্যটা আবুধাবিতে। বাংলাদেশ যখন ভারতের বিপক্ষে খেলছে, আফগানিস্তান তখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে।

পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথমে ব্যাটিং-এ নেমেছিল আফগানিস্তান। একাদশ ওভারের প্রথম বলেই দ্বিতীয় উইকেটটা হারিয়েছিল তারা, স্কোরবোর্ডে দলীয় সংগ্রহ তখন মাত্র ৩১। সেখান থেকে রহমত শাহ আর হাশমতুল্লাহ শাহিদী মিলে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন দলকে। রহমত ফেরার পরে শাহিদীকে সঙ্গ দিয়েছেন অধিনায়ক আফগানী। একদিকে দেখেশুনে খেলেছেন শাহিদী, অন্যদিকে রানের ফোয়ারা ছুটিয়েছেন আফগানী। দুজনের ব্যাটিং দেখেই তাদের পরিকল্পনাটা বোঝা যাচ্ছিল পরিস্কার। 

আফগানরা জানে, স্কোরবোর্ডে ২৩০/২৪০ রান জড়ো করতে পারলেই তারা ফাইট দিতে পারবে, সেরকম বোলিং অ্যাটাক তাদের আছে। সেই নির্ধারিত লক্ষ্যেই ছুটেছে তাদের ব্যাটসম্যানরা। শাহিদী যেমন শেষদিকে হাত খুলে মেরেছেন, কারণ তখন মারার সময়, রান বাড়ানোর সময়। অথচ খানিক আগেও তিনি ছিলেন দিঘীর জলের মতো শান্ত, কারণ তখন তার টিকে থাকার দরকার ছিল, ঝুঁকি নেয়া বারণ ছিল, হাত খুলে খেলতে মানা ছিল। ক্রিকেটের এই বেসিক নিয়মগুলো মেনেই ১১৮ বলে ৯৭ রানের দারুণ একটা ইনিংস খেলেছেন শাহিদী। ৮২ স্ট্রাইকরেটটা হয়তো এযুগের ক্রিকেটে বেমানান লাগবে, কিন্ত এই ইনিংসটার দাম যে কতটা, সেটা যারা ম্যাচ দেখেছেন তারাই জানেন।

বাংলাদেশের ইনিংসে যাই। ব্যাটসম্যানদের অ্যাপ্রোচ দেখে মনে হচ্ছিল ব্যাটিং করাটা দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিণ কাজ, এই উইকেটটা বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বোলিংবান্ধব উইকেট! অথচ ভারতীয় দল ব্যাটিঙে নামতেই ভোজবাজীর মতো বদলে গেছে সব। বাংলাদেশী বোলারদের বেধড়ক পিটিয়েছেন রোহিত-ধাওয়ান-ধোনিরা। সাত উইকেটে ম্যাচ জিতে নেয়ার পথে তাদের একটুও বিপাকে ফেলতে পারেনি মাশরাফির দল। 

বাংলাদেশ, এশিয়া কাপ, ভারত, লিটন দাস, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম

সমস্যাটা উইকেটের নয়। তীব্র গরম, ব্যস্ত সূচী কিংবা ভ্রমণের ঝামেলার অজুহাত দেখানোটাও বোকামি। বাংলাদেশ যেমন টানা ম্যাচ খেলছে, আফগানিস্তানও তেমনই খেলছে। সমস্যাটা আমাদের ব্যাটসম্যানদের চিন্তাভাবনায়, শট সিলেকশনে। কেউ সেধে সেধে আত্মহত্যা করতে চাইলে তাকে বাঁচানো তো সম্ভব নয়। আমাদের ব্যাটসম্যানেরা একেকটা সুইসাইডাল শট খেলেছেন, বলের ভালোমন্দ বিবেচনা না করে তেড়ে মারতে গিয়ে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে এসেছেন। দলের স্কোর সমৃদ্ধ হবে কিভাবে?

কোন বলটা খেলবো, কোন বলটা মারবো এটা জানা যেমন জরুরী, তেমনই কোন বলটা ছেড়ে দেবো সেটা জানাটাও খুব জরুরী। সেটাই আমাদের ব্যাটসম্যানেরা ভুলে যান বারবার। নইলে এক্সট্রা বাউন্সের বলটাকে পুল করার দরকার ছিল না লিটনের। জাদেজাকে একই রকমের বলে পরপর দুটো চার মারার পরেও হ্যাটট্রিকের আশায় তৃতীয় বলটাকেও ওপরে তুলে কেন খেলবেন সাকিব আল হাসান? মুশফিক কেন ফিল্ডার মজুদ আছে জেনেও রিভার্স সুইপ করতে গেলেন? তাদের কি সত্যিই কোন পরিকল্পনা ছিল? সাকিব-মুশফিকের মতো সিনিয়র খেলোয়াড়েরা যখন জেনেশুনে বিষপান করেন, তখন আর কী-ই বা বলার থাকতে পারে? 

বাংলাদেশ, এশিয়া কাপ, ভারত, লিটন দাস, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম

টপ ফাইভের পাঁচজনই যখন বিগ শট খেলতে গিয়ে উইকেট ছুঁড়ে আসেন, তখন হতাশায় নির্বাক হয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু বোধহয় করারও থাকে না। কেন আমাদের শুধু বাউন্ডারি মেরেই রান বের করতে হবে? কেন শুধু শট খেলার দিকে ঝুঁকতে হবে? সিঙ্গেল-ডাবলসে কি রান আসে না? বাংলাদেশ দলের সবাই মিলে ২৯৫ বল খেলেছে, এরমধ্যে রান এসেছে ১০৫টি বল থেকে। বাকী ১৯০ বলই ডট! পঞ্চাশ ওভারের একটা ইনিংসে যখন বত্রিশ ওভার শুধু ডট বলেই যায়, তখন সেই ইনিংস যে ভাঙাচোরা হবে, সেটা নতুন করে বলে দেয়ার কি আছে?

প্রায় একই রকমের শুরু করে আফগানিস্তান যেখানে পঞ্চাশ ওভারে ২৫৭ রান জড়ো করলো, আমরা সেখানে ১৭৩-এ থামলাম! ক্রিকেটটা আফগানরা আমাদের অনেক পরে খেলা শুরু করেছে। কিন্ত খেলাটার বেসিক জিনিসগুলো ওরা যতোটা ভালো আয়ত্ব করেছে, আমরা তার ছিঁটেফোঁটাও পারিনি বোধহয় এখনও! 

বাংলাদেশ, এশিয়া কাপ, ভারত, লিটন দাস, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম

তারপর পাকিস্তানের দিকে তাকান। ২৫৮ রানের টার্গেটে খেলতে নেমেছে তারা, শুরুতেই ফখর জামানকে হারিয়ে একটা ধাক্কা খেয়েছে। ইমাম উল হক আর বাবর আজম কি চমৎকারভাবে সেটা সামাল দিলেন! ১৫৪ রানের দুর্দান্ত একটা জুটিও হয়ে গেল দুজনের! ইমাম উল হকের এটা বারোতম ওয়ানডে ম্যাচ, বাবর আজমের ৪৯তম। তারা যদি জুটি গড়ে ইনিংস বিল্ড আপ কিভাবে করতে হয় সেটা বুঝতে পারেন, সাকিব-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ’র মতো পোড়খাওয়া ক্রিকেটারেরা কেন পারবেন না?

এরকম খাপছাড়া পারফরম্যান্সের পরে ভীষণ হতাশ লাগে। যেন চারিদিকে অসীম অন্ধকার জেঁকে বসেছে। পঞ্চপাণ্ডব থাকায় হুটহাট জয় আসছে, প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া যাচ্ছে। ওরা যেদিন থাকবেন না, তখন কি হবে? জিম্বাবুয়ে বা ওয়েস্ট ইন্ডিজের পরিণতি বরণ করতে হবে না তো আমাদের? এই শঙ্কাটা ভাবায় খুব…

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close