অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

মিশন অ্যাডলফ আইখম্যান- মোসাদের টপ সিক্রেট অপারেশন!

১১ই মে ১৯৬০, দিনটা বুধবার, সময় সন্ধ্যের কাছাকাছি।

স্থান গ্যারিবল্ডি স্ট্রীট, বুয়েন্স আয়ার্স, আর্জেন্টিনা। সূর্যের আলো মরে যায়নি এখনও, পথের ধারে সাঁঝবাতিগুলো জ্বলে ওঠার অপেক্ষায় আছে। আবাসিক এলাকায় ঢুকেছে এই রাস্তাটা, এই সময়টায় লোকজনের আনাগোনা কম থাকে। আজ কেন যেন একদমই নেই। হুটহাট দুয়েকজন চোখে পড়ছে। পথের ধারে একটা পার্ক, বিকেলে খানিকটা ভীড় ছিল। তবে এখন প্রায় ফাঁকা। সন্ধ্যা নামার আগেই সবাই ছুটেছে শহরের কেন্দ্রস্থলের দিকে, বড় রাস্তায় ফানুস ওড়ানো হচ্ছে, চলছে আলোকসজ্জা। স্বাধীনতার দেড়শো বছর উদযাপন করছে আর্জেন্টাইনরা। ফাঁকা পার্কের এখানে সেখানে বসে আছে জনা দশেক লোকজন, কেউ বাদাম চিবুচ্ছে, কেউবা হাত পা এলিয়ে বসে আছে ক্লান্ত শরীরে। হঠাৎই বাতাসে শীষের তীক্ষ্ণ আওয়াজ শোনা গেল ধারেকাছে কোথাও। সঙ্গে সঙ্গে গা ঝাড়া দিয়ে সচকিত হয়ে উঠলো সবগুলো শরীর! আরও আধঘন্টা আগেই বাজার কথা ছিল এই শীষের আওয়াজ।

মধ্যবয়স্ক মানুষটা বাস থেকে নেমেছে, হেঁটে আসছে এই পথ ধরে। এদিক দিয়েই বাড়িতে যেতে হয় তাকে, রোজ এই বাসস্ট্যান্ডেই তাকে নামিয়ে দিয়ে যায় বাস। গ্যারিবল্ডি স্ট্রীটের শেষমাথায় ওর বাড়ি, গত কয়েকদিন ধরে রেকি করা হচ্ছে জায়গাটা। দিনের কোন সময়ে কি ঘটে, কে কখন আসে কখন যায় সবকিছু ওদের নখদর্পণে। দুনিয়াকে চমকে দেয়ার মতো একটা অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে পাঠানো আর্জেন্টিনায় হয়েছে আটজনের দলটাকে, একজনকে গ্রেফতার করে নিয়ে যেতে হবে সবার অলক্ষ্যে। কাজ শেষ হবার আগে কাকপক্ষীতেও টের পাবে না কিছু। আর যদি ওরা ধরা পড়ে কোনভাবে, তাহলে রাষ্ট্র সরাসরি অস্বীকার করবে ওদের অস্তিত্ব- এমনটা জানে এই দলের প্রত্যেকেই। তবে নিজেদের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস আছে ওদের, প্রত্যেকেই শরীর আর মেধার সর্বোচ্চ সামর্থ্যের পরীক্ষা দিয়েই সিক্রেট এজেন্ট হিসেবে সুযোগ পেয়েছে মোসাদে। হ্যাঁ, ওরা ইজরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্ট।

ধূসর রঙের একটা কোট মানুষটার গায়ে, তাকে সবাই রিকার্ডো ক্লিমেন্ট নামে চেনে এখানে। তবে তার আসল পরিচয় বের করে ফেলেছে মোসাদ, তাকে ধরতেই আটজন চৌকস এজেন্ট উড়ে এসেছে আর্জেন্টিনায়। সে হেঁটে আসছে সামনের দিকে, অস্বাভাবিক কোন কিছু এখনও চোখে পড়েনি। গলায় মাফলার জড়ানো একজন এগিয়ে গেল তার দিকে, লোকটার নাম পিটার মালকিন, সেও মোসাদের এজেন্ট। ক্লিমেটের সামনে গিয়ে পথ আগলে দাঁড়ালো সে। ক্লিমেট খানিকটা বিরক্তি নিয়েই তাকালো সুঠামদেহী পিটারের দিকে। আশেপাশের তখন মৌমাছির গুঞ্জন, একটা সেডান কার নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে পাশে, যার যার অবস্থানে থেকে দুজনকে ঘিরে ফেলেছে জনাদশেক মোসাদ এজেন্ট। অনেক দেরীতে ব্যপারটা বুঝতে পারলো ক্লিমেট, কিন্ত বাধা দেয়ার সুযোগটা পেল না সে। দুপাশ থেকে দুজন জাপটে ধরলো তাকে, পেছন থেকে একজন এসে চেপে ধরলো মুখ। পিটার মালকিন পকেট থেকে ক্লোরোফরম মাখা রুমাল বের করলো একটা, চেপে ধরলো ক্লিমেটের নাকে। জ্ঞান হারালো সে। গাড়িতে তোলা হলো সত্তর কেজি ওজনের শরীরটা, একটা কম্বলের নীচে ঢেকে দেয়া হলো ক্লিমেটকে। গাড়ীটা ছুটে চললো বুয়েন্স আয়ার্সে মোসাদের একটা সেফ হাউজের উদ্দেশ্যে। অপারেশনের অর্ধেকটা সফল হয়েছে, ধরা পড়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কুখ্যাত নাজী অফিসার এবং হিটলারের বিশ্বস্ত সহচর অ্যাডলফ আইখম্যান, পরিচয় গোপন করে গত পনেরোটা বছর আর্জেন্টিনায় লুকিয়ে ছিলেন যিনি! এবার ওকে আর্জেন্টিনা থেকে ইজরাইলে নিয়ে যাবার পালা, সবার অলক্ষ্যে, সন্তর্পণে!

ইজরাইল, আর্জেন্টিনা, ইহুদী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মোসাদ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে অ্যাডলফ আইখম্যান নামটা ছিল ইহুদীদের জন্যে সাক্ষাৎ আতঙ্কের। বিশেষ করে নাজী কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বা বন্দীশালাগুলোতে তার নাম শুনলেই কেঁপে উঠতো বন্দীরা। এই কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলো চলতো নাৎসি বাহিনীর লেফট্যানেন্ট কর্নেল পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত থাকা আইখম্যানের আদেশে, নিত্যনতুন অত্যাচারের ফর্মূলা আবিষ্কার করে ক্যাম্পগুলোতে সেগুলো পরীক্ষা করে দেখার নির্দেশ পাঠাতো এই বিকৃতমস্তিস্ক মানুষটা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষভাগে ১৯৪৫ সালে হেনরিখ হিমলার ইহুদী নিধন বন্ধের নির্দেশ দিলেও, উর্ধ্বতন কর্মকর্তার এই আদেশ অমান্য করে নিজের কাজ চালিয়ে গিয়েছিল আইখম্যান। ইউরোপের বেশ কিছু অঞ্চল, বিশেষ করে হাঙ্গেরীকে একেবারে বধ্যভূমিতে পরিণত করে ফেলেছিল সে।

বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে, হিটলার আত্মহত্যা করেছিলেন, কিন্ত তার চ্যালাচামুন্ডারা পালিয়ে গিয়েছিলেন একেকজন একেক দিকে। কেউ হিটলারের রাস্তা বেছে নিয়েছিল পালিয়ে থাকতে না পেরে, কেউবা ধরা পড়ছিল। ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গিয়েছিল আইখম্যান। নাম পরিবর্তন করে এখান থেকে সেখানে পালিয়ে বেড়িয়েছিল সে। শেষে আশ্রয় নেয় আর্জেন্টিনায়, নাম নিয়েছিল রিকার্ডো ক্লিমেট। এদিকে ইজরাইলের সিক্রেট এজেন্টরা হন্যে হয়ে খুঁজছিল এই কুখ্যাত খুনীকে। যেকোন মূল্যে আইখম্যানকে ধরতেই হবে- এমনটাই ছিল তাদের পণ।

বিভিন্ন জায়গা থেকে মাঝেমধ্যেই ইজরায়েলি গুপ্তচরেরা খবর পেত, এখানে-সেখানে দেখা গেছে আইখম্যানকে, কিংবা অমুক জায়গায় পালিয়ে গেছে সে। কিন্ত সেগুলোর সবই ছিল ভুয়া খবর। এরমধ্যে একবার বুয়েন্স আয়ার্সের নামও এসেছিল, কিন্ত ভোল পাল্টে ফেলা আইখম্যানকে খুঁজে পায়নি ইজরাইলি এজেন্টরা। এমনকি মোসাদের কাছে আইখম্যানের কোন ছবিও ছিল না। পরে তার ভাইয়ের কাছ থেকে কৌশলে পুরো পরিবারের একটা ছবি উদ্ধার করা হয়, সেটা ১৯৬০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ঘটনা।

তবে এর আগেই আইখম্যানের অবস্থানের একটা সুনিশ্চিত খবর পেয়ে গিয়েছিল মোসাদ, এবং সেটাও বেশ কাকতালীয়ভাবে। আইখম্যানের এক ছেলের নাম ছিল ক্লাউস আইখম্যান, সে প্রেম করতো আর্জেন্টিনায় বসবাসরত এক জার্মান বংশোদ্ভুত ইহুদী মেয়ের সঙ্গে। প্রেমালাপে মাঝেমধ্যেই বাবার বীরত্বের কথা গর্বভরে বলতো ক্লাউস, তবে তার জানা ছিল না, খাল কেটে কুমীর নিয়ে আসছে সে। প্রেমিকা সিলভিয়া তার প্রেমিক এবং প্রেমিকের পরিবার সম্পর্কে জানিয়েছিল তার বাবা লোথার হারম্যানকে, তিনি আবার অশউইৎজ ট্রায়ালের এক বিচারক ফিজ বুয়েরের পরিচিত ছিলেন। হারম্যান মেয়ের কাছে পাওয়া খবরটা জানান বুয়েরকে। সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের একটা অংশে যেন মৌমাছির চাকে ঢিল পড়ার অবস্থা হলো, ছুটোছুটি শুরু হয়ে গেল ইজরাইলের সিক্রেট সার্ভিসে। ওরা নিজেদের একজন এজেন্টকে পাঠালো আর্জেন্টিনায়।

ইজরাইল, আর্জেন্টিনা, ইহুদী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মোসাদ

সেই এজেন্ট এসে সিলিভিয়ার সঙ্গে কথাবার্তা বললো, সিলভিয়াও রাজী হলো ইজরাইলের হয়ে কাজ করতে। পরিকল্পনা মোতাবেক তাকে পাঠানো হলো প্রেমিক ক্লাউসের বাড়িতে। ক্লাউস তখন ঘরে ছিল না, দরজা খুললো অ্যাডলফ আইখম্যান স্বয়ং। তবে সে নিজের সঠিক পরিচয় সিলভিয়ার কাছে দিল না, বললো সে ক্লাউসের দূর সম্পর্কের চাচা হয়। কিছুক্ষন পরে ক্লাউস বাড়ীতে এলে সিলভিয়া লক্ষ করলো, আইখম্যানকে সে বাবা বলে ডাকছে। সিলভিয়ার আর বুঝতে বাকী রইলো না, যার খোঁজে তাকে এখানে পাঠানো হয়েছে, সেই চিড়িয়া ঘরেই আছে।

আইখম্যান বুয়েন্স আয়ার্সেই আছে- এই ব্যপারে নিশ্চিত হবার পরে আর দেরী করলো না মোসাদ, দ্রুত একটা টিম বানানো হলো ত্রিশজনের। এপ্রিলের শেষদিকে স্পেশাল এজেন্ট রাফী এইতানের নেতৃত্বে ওদের মধ্যে আটজন উড়ে গেল আর্জেন্টিনায়। টানা দেড় সপ্তাহ রেকি করা হলো আইখম্যানের ওপর, আর আশেপাশের এলাকায়, বিশেষ করে গ্যারিবল্ডি স্ট্রীটে। আইখম্যানকে গ্রেফতারের পর নয়দিন ধরে মোসাদের বেশ কয়েকটা সেফ হাউজে রাখা হয়েছে, বারবার বদল করা হয়েছে অবস্থান। এত কষ্ট আর এত সময় অপেক্ষার পর পাওয়া গেছে এই খুনীকে, কোনভাবেই তাকে হাতছাড়া করতে চায়নি মোসাদ। বিশেষ একটা বিমানে করে একই সময়ে ইজরাইলি একটা প্রতিনিধিদলকে পাঠানো হয়েছিল বুয়েন্স আয়ার্সে, বলা হয়েছিল, সরকারের পক্ষ থেকে আর্জেন্টিনার স্বাধীনতার ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েছেন তারা। তবে ভেতরের গল্পটা অন্যকিছুই ছিল। বিশে এপ্রিল রাতে আইখম্যানকে ইনজেকশন পুশ করে অচেতন করা হয়, তারপরে ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্টের পোষাক পরিয়ে তোলা হয় সেই বিমানে। বাইশে এপ্রিল, বন্দী হিসেবে ইহুদী রাষ্ট্র ইজরাইলের মাটিতে পা রাখে অ্যাডলফ আইখম্যান-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়টায় যার হাতে লেগে ছিল লাখো নিরপরাধ ইহুদীর রক্ত!

এরপরের গল্পটা সংক্ষিপ্ত। ট্রায়ালে ষাট লক্ষ ইহুদী হত্যার দায়ে অভিযুক্ত করা হয় আইখম্যানকে। নিজের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করার সুযোগও দেয়া হয় তাকে। আইখম্যান দাবী করেছিল, সে কেবল হুকুম পালন করেছে, নিজেকে সে অপরাধী মনে করে না। কিন্ত ধোপে টেকেনি সেই দাবী। বিচারকেরা তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন। ১৯৬১ সালের ১১ই ডিসেম্বর তাকে ফাসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, সেই মৃত্যুদণ্ডের মূহুর্তটা ইজরাইলের ন্যাশনাল টিভি এবং রেডিও স্টেশন থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল। আইখম্যানের মৃতদেহ পুড়িয়ে ছাইগুলো ফেলে দেয়া হয়েছিল সাগরে।

তথ্যসূত্র-

১/ http://www.jewishvirtuallibrary.org/the-capture-of-nazi-criminal-adolf-eichmann

২/ http://www.history.com/this-day-in-history/eichmann-captured

৩/ http://www.holocaustresearchproject.org/trials/eichmanntrialcapture.html

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close