‘দর্শকদের কাছে টাকা কোনো ইস্যু না, ইস্যু হলো কন্টেন্ট…’

আদনান আল রাজীবের অফিসে যখন পৌঁছালাম, তখন তার অফিস প্রায় খাঁ খাঁ! কেউ নেই নাকি! হুট করে একজনকে দেখলাম, তাকে বলতেই বললেন- আদনান ভাই উপরের তলায় এডিটিং প্যানেলে আছেন, আপনি ভাইয়ার রুমে বসেন, আমি তাকে জানাচ্ছি। আদনান আল রাজীবের রুমটা ছোটখাটো কিন্তু ছিমছাম, দেয়ালে ওয়েস এন্ডারসনের “দা গ্র্যান্ড বুদাপেস্ট হোটেল” সিনেমার বিরাট পোস্টার। অপেক্ষা করতে লাগলাম, একসময় তিনি আসলেন। মুখে সেই চিরচেনা নায়কসুলভ হাসি। অবশেষে শুরু হলো আড্ডা।

Ad

সাকিব- ফেসবুকে শুরুতে আপনার নাম ছিল প্রিয় আদনান ভাই। এই নামের কারণ কি? আবার এই নাম চেঞ্জ করে বর্তমান নাম মানে আদনান আল রাজীব নাম দেয়ার কারণ?

আদনান- শুরুতে আমি যখন আসলে ফেসবুকে আসি, তখন ফেসবুক ওয়াজ ফর ফান। তখন তো সবাই ফেসবুকে ছিলও না। আমিও ফেসবুকের ব্যাপারে খুব একটা সিরিয়াস ছিলাম না, জাস্ট এই নামে একটা প্ল্যাটফর্ম আছে, সবার সাথে কানেক্টেড থাকা যায়- এই আর কি। তখন আমার একটা ফ্রেন্ড আমাকে বলল যে- তোমার নাম আসলে প্রিয় আদনান ভাই হওয়া উচিত। আমি বললাম- ক্যান? তখন সে বলল- না মানে সবাই তোমাকে বেশ পছন্দ করে, তোমার সম্পর্কে ভাল কথা বলে, তুমি সবার প্রিয় মানুষ- তাই এই নামটা তোমার সাথে যায়! আমিও ফান করে দিয়ে দিলাম এই নাম। ঐ অবস্থায় ছিল অনেকদিন। অনেকে বলতো দেখা হলে- আরে প্রিয় আদনান ভাই, কি খবর? এরপরে ফেসবুক যখন অনেক সিরিয়াস হলো, সবাই আসতে থাকলো, আমার একটার পর একটা কাজ পোস্ট করতে থাকলাম, তখন দেখলাম ফেসবুকে ফান জায়গাটা আসলে নাই, এটা সিরিয়াস একটা প্ল্যাটফর্ম হয়ে গেছে। তাছাড়া ক্লায়েন্টরা আমার কাজ দেখে আমাকে আর খুঁজে পায় না এই প্রিয় আদনান ভাই নামে, তাই নাম চেঞ্জ করে আসল নামটা দিলাম। ভাবলাম ফাতরামি বাদ দিয়ে এবার একটু ভদ্র হই! (হাসি)

সাকিব- রেদওয়ান রনি ভাই আপনাকে আবার আধখানা নান ডাকেন। সেখান থেকে নাকি আদনান শব্দটা আসছে! এটার রহস্য কোথায়?

আদনান- কোন রহস্য নাই। ও তো আমাকে একেকদিন একেক নামে ডাকে। আধ খানা নান মানে তো অর্ধেক নান!

সাকিব- তার মানে কি আপনি অর্ধেক নান খেয়ে সারাদিন থাকেন?

আদনান- আরে নাহ! আমি তো পারলে এক বসায় চার পাঁচটা খাই!

সাকিব- আপনার শুরুটা হয় ২০০৩-এ ছবিয়ালের সাথে। সেটা কীভাবে একটু বলবেন কি?

আদনান- তখন আমার কাজ দরকার, ফ্যামিলি প্রবলেম ছিল। আমার বোন ফারুকি ভাইয়ের ফ্রেন্ড ছিল, লাইক দূরসম্পর্কের। ঐভাবে আমি ফারুকি ভাইয়ের সাথে দেখা করি। আমি তখন এ লেভেলে জয়েন করব। কাজ দরকার খুব, সব বললাম ফারুকি ভাইকে। তিনি সব শুনে বললেন- আদনান, তুমি আসলে যেভাবে বড় হইছো, সেটা তুমি এখানে কীভাবে ব্যবহার করবে সেটা আমি জানিনা। তুমি তো অনেক আরামে বড় হইছো, তোমার ফ্যামিলি ভাল ছিল, হঠাৎ আজকে প্রবলেম হইছে এই কারনে তুমি কাজ করতে চাচ্ছো, কিন্তু আমি জানি না আসলে তুমি এখানে কতদিন কাজ করতে পারবে। তবে তোমার ইচ্ছা থাকলে তুমি করতে পারবে। আমার আসলে তিনজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হইলেই এনাফ, যদিও অলরেডি আমার কাছে ৭ জন আছে। তুমি জয়েন করলে আটজন হবে। এরপর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- তুমি পারবে? আমি কিছু না ভেবেই বললাম- পারব। যদিও তখনও আমি কিচ্ছু জানতাম না, কিচ্ছু না মানে কিচ্ছু না। অ্যাডি কি জিনিস, তার কাজ কি- কিচ্ছু না! আমি আসলে খুব কেলাস টাইপের ছিলাম, কাজ করব না- এরকম ছিলাম। ঐ আপু অনেক জোর করছিল, বাসা থেকে একটু প্রেসার ছিল যে কিছু একটা কর, নিজের জন্য কিছু একটা কর। নিজের একটু চিন্তা কর। আমি ছোটবেলা থেকে অনেক সিনেমা দেখি। কিন্তু বড় হয়ে আমি বিরাট সিনেমার ডিরেক্টর হব- এরকম কিছুই আমার মাথায় ছিল না। সিনেমা দেখতাম অনেক। বাট এরকম কোন ফিউচার প্লান ছিল না। এরপরে কাজ শুরু করলাম- শুরু করে দেখি- খুব মজা পাচ্ছি কাজ করে। এরপরে তো চলছে…

সাকিব- এরপরে ছবিয়াল থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার কারণ?

আদনান- এটার কারণ হচ্ছে ততদিনে অনেকেই বের হয়ে যাচ্ছিল ছবিয়াল থেকে। তিনজনের মত বের হয়েছিল প্রথম দিকে। প্রথমে বের হয় শরাফ আহমেদ জীবন আর আশুতোষ সুজন। বের হয়ে তারা অলরেডি নাটক বানাচ্ছে, ছবিয়াল উৎসব করছে। এরপরে রাজিব আহমেদ ছিল একজন- সেও বানানো শুরু করলো। এরপরে রনি আর ফাহমি ভাই। আমার সত্যি কথা বলতে বের হওয়ার কোন ইচ্ছা ছিল না। কোন ফিউচার প্ল্যান ছিল না যে কাজ করব, ফেমাস হব। যা করতাম প্রতিদিন, সেটা করতেই ভাল লাগতো। নির্দিষ্ট কিছু মানুষের সাথে দেখা হতো, তাদের সাথে কাজ করতাম- এটাই ভাল্লাগতো আমার কাছে। তখন একদিন ফারুকি ভাই আমাকে ডেকে বললেন, যেটা বাকিদের বলেছিলেন- ‘এবার তোমাদের হাই টাইম নিজে নিজে কাজ করা, আমাকে অ্যাসিষ্ট করা বন্ধ কর এবার।’

ততদিনে আমার সাথে যারা কাজ করতেন তারা অলরেডি হিট। রনি তখন- একজন রেডিও জকির গল্প বানায়, ফাহমি তখন হিট। তাদের তুলনায় আমার ব্যাংক ব্যাল্যান্স জিরো- মানে কাজের ব্যাংক ব্যাল্যান্স আর কি! আমার ব্যাংকে কোন কাজ নাই নিজের, আর তারা সমানে কাজ করে যাচ্ছেন (হাসি)। ঐটা নিয়া আসলে আমার কোন চিন্তাও ছিল না। তো ফারুকি ভাই যখন বললেন এভাবে- আমি খুব ইমোশনাল হয়ে গেলাম। কান্নাকাটি করলাম। আমার সাথে ছিলেন ফারুকি ভাইয়ের ভাই…

সাকিব- গোলাম কিবরিয়া ফারুকি?

আদনান- হ্যাঁ। তো আমরা দুইজনে খুব ইমোশনাল হয়ে গেলাম। এরপরে বের হয়ে গেলাম। বের হয়ে ভাবলাম- কি করব? একবছর কাজই খুঁজতে হইছে জাস্ট। যদিও কপাল ভাল, বের হওয়ার প্রায় সাথে সাথে তিনটা টিভিসির কাজ পেয়ে গিয়েছিলাম, সেটা আমাকে হেল্প করেছে। এরপরে এক বছর গ্যাপ দিলাম। এরপরে আস্তে আস্ত কাজ হলো…

সাকিব- টিভিসির মেকিংয়ে চ্যালেঞ্জটা কোথায় আসলে?

আদনান- টিভিসির চ্যালেঞ্জটা আসলে অনেক বড়। অনেকে মনে করে- নাটক যারা বানায় তাদের জন্য টিভিসি বানানো কোন ব্যাপার না। অথবা কেউ টিভিসি বানালে, সে সিনেমা বানাতে পারবে না। কিন্তু জিনিসটা আসলে এরকম না। এটা আসলে আলাদা একটা ফর্ম। টিভিসি আসলে ফিকশন, ফিল্ম, টেকনোলোজি- সবকিছুর একটা মিক্সচার। আপনি অনেক ডিটেলে কাজ করতে পারবেন। আপনাকে স্টাইলিশ হতে হবে টিভিসিতে কাজের ক্ষেত্রে, এখনকার সময়টাকে বুঝতে হবে, তা নাহলে কমার্শিয়াল কাজ করাটা বেশ মুশকিল। কারনে এটার সাথে মার্কেটিং জড়িত। ক্যামেরা, লাইট, স্টোরি সবকিছু নিয়ে এখানে কাজ হয়।

সাকিব- আপনার কি মনে হয় আমাদের এখানে যেসব বিজ্ঞাপন হয়, সেগুলোতে ইমোশন আর হিউমার থাকার কারণে সেগুলো বেশি চলে?

আদনান- হ্যাঁ। আমাদের এখানে আসলে স্টাইলাইজেশনের সুযোগটা কম। ম্যাস পিপল আসলে জীবনমুখী, সারাদিন কাজ করে এসে, প্রেসার থেকে এসে তারা আসলে এমন কিছু দেখতে চায়, যা দেখলে তারা হাসবে, একটু ইমোশনালি কানেক্ট করতে পারবে। এটা বাইরের দেশেও আছে।

সাকিব- বাইরের দেশে নাকি শুধু এই উপমহাদেশে?

আদনান- এখানে তো কিছুটা বেশি আছেই, কিন্তু বাকি সব জায়গাও প্রায় সেইম অবস্থা। কয়েকদিন আগে বেস্ট টেন টিভি কমার্শিয়াল দেখছিলাম অ্যাড ফোরামে, সেখানকার অধিকাংশই এরকম ইমোশনাল গল্প নিয়ে তৈরি।

সাকিব- আপনার কি মনে হয়, এটাই হওয়া উচিত?

আদনান- কেমন হওয়া উচিত সেটা আসলে আমার কাছে কিছু মনে হয় না। আমার কাছে মনে হয় দিনশেষে আমি প্রোডাক্ট বেচতে পারতেছি কিনা আমার বিজ্ঞাপন দ্বারা, ক্লায়েন্ট খুশি কিনা, দর্শক গল্পের সাথে প্রোডাক্ট কানেক্ট করতে পারছে কিনা- সেটা দরকার। এখানে আসলে জ্ঞান দেয়ার কিছু নাই, ইন ফ্যাক্ট ফিল্মমেকিংয়েই জ্ঞান দেয়ার কিছু নাই। আলটিমেটলি উদ্দেশ্যে একটাই, প্রোডাক্ট ঠিকমতো বেচতে পারতেছে কিনা, সেটার জন্যই তো আসলে এত খরচ।

সাকিব- তো কি শুধু বিজ্ঞাপন নিয়েই থাকবেন? আর কিছু করবেন না? আপনার ছোটপর্দার সব কাজ তো হিট। লাস্ট ঈদে কিছু করলেন না। শেষ কাজ সম্ভবত মিডল ক্লাস সেন্টিমেন্ট।

আদনান- টিভির অবস্থা আসলে বেশ খারাপ। যেই বাজেট দেয় তাতে ভাল কিছু করা যায় না। মিডল ক্লাস সেন্টিমেন্ট-এর কথাই বলি।একদম রেগুলার যে টিভি বাজেট দেয়া হয়, সেটাতেই আমি বানিয়েছিলাম। টিভি ফিকশন কেন করি আসলে? কারণ উই লাভ ফিকশন। কিন্তু সে জিনিস যদি শান্তিমত বানাতে না পারি, টাইমের দোষ, বাজেটের দোষ- সবকিছু মিলিয়ে যদি এত সমস্যা হয়…

সাকিব- মেইন সমস্যা কি বাজেটে?

আদনান- ওয়ান অফ দ্যা মেইন।

সাকিব- যে সমস্যাটা বিজ্ঞাপনে হয় না?

আদনান- বিজ্ঞাপনে হলেও অতটা হয় না, যেটা টিভি ফিকশনে হয়। ফিকশনে আবার নিজের মতো করে গল্প বলার আনন্দটা আছে।

সাকিব- আপনি কি তাহলে আপনার টিভি দর্শকদের বঞ্চিত করছেন না?

আদনান- সত্যি কথা বলতে গেলে আমি আসলে কারো জন্য কোন কিছু করিনা। আমরা সবাই আসলে সেলফিশ। নিজের খুশি থাকলেই আসলে খুশি। আসলে সবাই মনে হয় আলটিমেটলি নিজের জন্যই বানায়। দিন শেষে নিজের জন্যই কিছুই করতে হবে। বিজ্ঞাপন আমার কাছে এখনও বোরিং লাগা শুরু করে নাই, তাই আমি বানাচ্ছি। ফিকশন যে আমি বানাই না তা না, বানাতে ইচ্ছা করে অনেক, কিন্তু ঐ যে- এতসব সমস্যা! আগে তো অনেক বড় বড় ব্র্যান্ড ছিল, এখন তো এত বড় ব্র্যান্ডও নাই যারা সুন্দরমতো একটু কাজ করতে দিবে…

সাকিব-আর সুযোগ সুবিধা দেয়া হলে?

আদনান- ডেফিনিটলি, কেন বানাব না? ‘না’-এর কিছু নাই ফিকশনের ক্ষেত্রে। ইনফ্যাক্ট আসলে আমি নিজেই বানাতে চাই।

সাকিব- আর সিনেমা?

আদনান- না নাই আমার কোন কিছুতে। আই এম ওপেন টু এভ্রিথিং।

সাকিব- আমি একটি সূত্রে জানতে পেরেছি ২০১২ বা ২০১৩ এর দিকে আপনি একটি সিনেমার স্ক্রিপ্ট রেডি করে ফেলেছিলেন। সেটার জন্য গানও তৈরি করা হয়েছিল। রোম্যান্টিক থ্রিলার ধাঁচের সিনেমা।

আদনান- না না, এরকম কিছু তো ছিল না।

সাকিব- আসলেই না?

আদনান- না তো। বুটিক সিনেমা একটা হওয়ার কথা ছিল। সেটা আর হয় নাই। টাইটেল জানতাম নিজের সিনেমার। নাম ছিল জেনারেশন এক্স।

সাকিব- সেটা বানান নাই কেন তাহলে?

আদনান- গল্প পাই নাই! (বিস্তৃত হাসি) নাম জানতাম শুধু। আচ্ছা, না না ঠিক আছে। এটার আগে গল্প ছিল একটা লেখা, তুমি ঠিক বলেছ। একটা ছিল রোম্যান্টিক থ্রিলার। ভুলে গিয়েছিলাম আসলে বলতে। তবে সেটা নিয়ে আর কাজ করা হয় নাই।

সাকিব- আর কি বানাবেন না তাহলে এটা?

আদনান- অবশ্যই বানাব। আমার লাইফে আমি আসলে কিছু প্ল্যান করে করি না। যেটা হওয়ার এমনেই হবে। যা করেছি এমনেই হয়েছে, নো প্ল্যান।

সাকিব- মার্ফিস ল এর মত? Anything that can go wrong will go wrong?

আদনান- সেটাই তো নিয়ম আসলে। you can’t help it. জোর করে কিছু করতে পারবে না, এমনেই হবে। you just want it. চাইতে হবে আর লেগে থাকতে হবে, চেষ্টা করতে হবে। চেষ্টা করলেও অনেক সময় হবে না- না হোক, আবার লেগে থাকতে হবে। লাইফটা এমন না যে আসলে- আমাদের এটা এটা করতে হবে। you should just enjoy life. লাইফটা আসলে অনেক সিম্পল, আমরা অনেক বেশি প্রেশার নিয়ে ফেলি…

সাকিব- তার মানে আদনান আল রাজীব সিনেমা বানাবেন একদিন?

আদনান- হ্যাঁ, আমার আসলে দুটো স্ক্রিপ্ট রেডি আছে। যখন আমি দেখব আমার মার্কেট ঠিক আছে, প্রোডিউসার ঠিক আছে, প্ল্যানিং ঠিক আছে- আমি জাস্ট কাজে নেমে যাব।

সাকিব- দুটো সিনেমার জনরা বলা যাবে?

আদনান- একটা ফ্যামিলি ড্রামা, আর আরেকটা রোম্যান্টিক থ্রিলার। থ্রিলার বানাতে টাকা একটু বেশি লাগবে। ফ্যামিলিরটা একটু ইমোশনাল ড্রামা একটা।

সাকিব- আপনার দুটো সিনেমাই কি এরকম যেটা মাস পিপল আর ক্লাস পিপলের সবাই দেখতে পারবে?

আদনান- আমি আসলে জানি না আমার দর্শক কারা। আমি যেটা বিশ্বাস করি আমি যদি আমার গল্পটা ঠিকমতো বলতে পারি, তাহলে সবাই দেখবে। @১৮ নাটকটা একটা বড় পর্যায়ের মানুষ দেখেছে, অনেক মানুষ দেখেছে। তবে আমি নিশ্চয়ই আরেকটা @১৮ বানাব না, ডিফারেন্ট জিনিস বানাব, এটার গল্প বলার ধরণও আলাদা হবে। তো সেটা যদি মানুষ দেখে, তো দেখবে। আই ডোন্ট নোউ আসলে।

সাকিব- আয়নাবাজির সাফল্যের পর কি মনে হয়েছে, আমাকেও এখন সিনেমা বানাতে হবে?

আদনান- আমার মাথায় হিট করে নাই, তবে আমার আশেপাশের মানুষের মাথায় হিট করেছে। সবাই বলতেছে- এখন সিনেমা বানাচ্ছ না কেন? এখন মার্কেট ভাল। তো এখন যদি আমি শুরু করি, আমার বানাতে এক বছর লাগবে। আর এই এক বছরে মার্কেটের অবস্থা কি হবে সেটা কেউ জানে না। আর আমি তো এমন না যে আয়নাবাজির পরে আমার সিনেমা রিলিজ দিতে পারতেছি। আয়নাবাজির পরে যদি একটানা পাঁচটা এরকম সিনেমা রিলিজ দেয়া যেত- তাহলে সেটা একটা কাজ হইতো- একদম যাকে বলে ব্যাং! কিন্তু এরকম পরিবেশ তো নাই আসলে…

সাকিব- প্রচারের কারণে অজ্ঞাতনামার মত সিনেমা বেশ বড় একটা ধাক্কা খেয়েছে। আপনার সিনেমার সময় এই ব্যাপারটা আপনার মাথায় থাকবে তো?

আদনান- ডেফিনিটলি। সিনেমা তো একটা প্রোডাক্ট। ইউনিলিভার যদি একটা টুথপেস্ট বের করে তাহলে আগে সেটার আগে অ্যাড দিবে যে- ভাই, এটা ভাল, কিনে দেখেন। এরপরে মানুষ কিনবে, ব্যবহারের পরে যদি দেখে সেটা ভাল তাহলে আবার কিনবে। সিনেমাও তো এই ধরনেরই। এরকম যদি প্রপার প্ল্যান করা যায়- সিনেমা আসার আগেই যদি জানা যায় একটা সিনেমা আসতেছে, যদি এরকম ইন্টারেস্ট গ্রো করানো যায় আর এরপরে যদি সিনেমা ভাল হয়, তাহলে তো হলোই। প্রচারের সাথে দরকার হল- আমাদের তো হল নাই। হল অনেক ইম্পরট্যান্ট। হল না থাকলে দেখাব কোথায় সিনেমা?

সাকিব- জাজের মত প্রতিষ্ঠান তো নতুন করে বেশ কিছু হলে চালু করেছে…

আদনান- সেটা ঠিক আছে, তবে আমি এখনও জানি না আসলে। আমার মনে হয় ফিল্মের জায়গা থেকে এখনও বেশ টাইম দরকার।

সাকিব- আপনার টাইম দরকার, নাকি সবার…?

আদনান- উঁহু, সবার, মানে অভারওল। যারাই করছে, জাজ হোক বা যারা হোক, তারা চেষ্টা করে যাচ্ছে, তবে আরও অনেকের এগিয়ে আসা উচিত। তারা চাইলেই এই সেক্টরকে অনেক বেশি বড় করে তুলতে পারে। এখানে ঠিকমতো প্ল্যান করে খরচ করতে পারলে টাকা উঠে আসবে। বাইরের দেশে তো এমন হয় যে রিলিজের আগেই টাকা উঠে আসে। আমি ইন্ডিয়াতে কোন একটা সিনেমা জানি দেখছিলাম, তিন নাম্বার বা চার নাম্বার দিনে হলে গেলাম, দেখি সিট প্রায় খালি কিন্তু ঐ সিনেমার টাকা উঠে গেছে। কারণ ওদের প্রথম দিনেই এমন কামাই করে, সবাই মিলে হলে যায়। ওদের কালচারটাই এমনভাবে গ্রো করা মানে হলে গিয়ে সিনেমা দেখার জন্য একটা তাড়না।

সাকিব- এই কালচার তো আমাদেরও ছিল। সেটা নষ্ট হওয়ার কারণ কি তাহলে?

আদনান- নষ্ট হওয়ার কারণ আমাদের সিনেমা খারাপ হইছে মাঝে। ঐটা কারণ।

সাকিব- ভাল খারাপ সিনেমা তো সব জায়গায়ই কম বেশি হয়। আমাদের তাই বলে এত বাজে অবস্থা হলো কেন যে, হলেই আর যাওয়া যাবে না, যারা হলে গিয়ে সিনেমা দেখে- তাদের রুচি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হতো এক সময়।

আদনান- কম বেশি হয় সব জায়গায় সেটা ঠিক, তবে অন্য জায়গায় একটা কনসিসটেন্সি থাকে। ইন্ডিয়ার সিনেমার ইতিহাস নিয়ে যদি বলতে চাই, আমাদের থেকে তারা হয়ত ২৫ বছরের মতো এগিয়ে ছিল। ওরা ২৫ বছর আগে থেকেই এমন সিনেমা দেয়া শুরু করছে যে পরে খারাপ সিনেমা হলেও একটা ব্যাল্যান্স ছিল। আর ওদের হল কখন fall করে নাই। আমাদের এখানে তো এরকম হয় নাই। আমাদের এখানে কিছু অদ্ভুত সিনেমা হওয়া শুরু হল!

সাকিব- কিন্তু অমিতাভের মত মানুষও তো বুম নামের অদ্ভুত সিনেমা করেছেন একসময়। আর এখন এসে ‘পিঙ্ক’-এর মত সিনেমা করে সবাইকে স্তব্ধ করে দিচ্ছেন।

আদনান- অমিতাভ তখন করেছে, কারণ তখন তার হাতে কাজ ছিল না। বুম, লাল বাদশাহ যা পেরেছে করেছে টিকে থাকার জন্য। আর ইন্ডিয়ার সাথে তুলনা দিলে তো হবেনা। ওদের বাজার তো আমাদের চেয়ে বড়। ওদের প্ল্যানিং ডিফারেন্ট। সরকারের কাছ থেকে ওরা অনেক সাপোর্ট পায়। প্রতিযোগিতা বেশি।

সাকিব- ওদের অনেক সিনেমা ট্যাক্স ফিও করে দেয়।

আদনান- হ্যাঁ, আরও অনেক সুযোগ সুবিধা আছে। আবার ওদের সেন্সর বোর্ডও অনেক সময় ঝামেলা করে, যেমনটা উড়তা পাঞ্জাবের সময় হলো। আমাদের এখানেও সরকার যতটুকু পারে করার চেষ্টা করে। তবে অন্যান্যদেরও এগিয়ে আসতে হবে। শিল্পপতিরা এগিয়ে আসতে পারে, ইনভেস্ট করতে পারেন এখানে। আমাদের এখানে অনেক অর্থনীতিক সাপোর্ট দরকার। প্রত্যেকটা মার্কেটে একটা করে সিনেমা হল করা দরকার। এখন ধরো উত্তরার একজন সিনেমা দেখতে সিনেপ্লেক্সে যাবে। জ্যাম ঠেলে আসতেই তার লাগবে তিন ঘণ্টা। এরপরে সিনেমা দুই ঘণ্টা। সিনেমা দেখা শুরু করার আগে একটু ঘুরবে, হাঁটা চলা করবে বা খাবে- গেল আরও এক ঘণ্টা। এরপরে সিনেমা দেখে বাসায় ফেরত আসবে- আরও তিন ঘণ্টা। মোট নয় ঘণ্টা শেষ জাস্ট একটা সিনেমা দেখতে, পুরা নয় ঘণ্টার চক্কর। কিন্তু উত্তরাতে সিনেমার একটা হল থাকলে মানুষটার এত অমানুষিক কষ্ট হত না। যমুনা ব্লকবাস্টার আছে, কিন্তু সেটা তো প্রপার স্ক্রিনিং না, অনেক সময় অনেক সিনেমার স্ক্রিন সেটাতে ঘোলা দেখা যায় বলে অভিযোগ শুনেছি।

সাকিব- আবার টিকেটের দাম অনেক বেশি।

আদনান- এই দাম দিয়ে সিনেমা দেখার লোক আমার মনে হয় আছে। মধ্যবিত্তরা এখন বিনোদনের জন্য আমার মনে হয় সিনেমার পেছনে এতটুকু টাকা খরচ এমনেই করে। তারা ভাল সিনেমা হলে যায়। আয়নাবাজি তো দেখেছে। মনপুরা দেখেছে। টাকা আসলে তেমন ইস্যু হয় না, ইস্যু হয় কনটেন্ট। আমরা ভাল জিনিস দেই না, সেটা হল বেসিক কথা। আমরা বানাতে পারি না।

সাকিব- এভাবে স্বীকার করে নিলেন?

আদনান- অবশ্যই! আমরা পারলে কি হতো না? দর্শক দেখতো না? কিছু একটা তো হতো!   

চলবে…

পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (7 votes, average: 4.86 out of 5)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

Ad