একটি অদ্ভুত সময়ের মধ্যে আমাদের বসবাস। যেখানে কিছু মানুষের হেঁয়ালিতে চলছে সময়ের চাকা। কেউ কথা বলে না এখন প্রাণ খুলে, কেউ হাসে না মনভোলানো হাসি। চারদিক যেন থমকে আছে।

সাহিত্য যদি সমাজ দর্পন হয়, তবে সমকালীন সাহিত্যে আমাদের সমাজের সত্যিকারের চালচিত্র সেভাবে ফুটে উঠছে না। এটি আমাদের জন্য আশংকার বটে। লেখকরা যদি সমাজের অসংগতিগুলোকে গল্পের ছলে তুলে না আনতে পারেন, সেটা সাহিত্যের জন্য যতটা না ক্ষতির, তার চেয়ে বেশি ক্ষতির সমাজের।

এই অসময়ে যখন আবুল মনসুর আহমদের সাহিত্য পড়ি, তখন সত্যি অবাক হয়ে থমকে যেতে হয়। সময়কে যিনি ধারণ করেছিলেন সাহিত্যে। আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, এই সময়ে এসে তাঁর সাহিত্য যেন আরো সমসাময়িক হয়ে উঠেছে। দৈনন্দিন সামাজিক টানাপোড়েনে প্রতিনিয়তই প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে আবুল মনসুর আহমদকে।

দুঃখের জায়গা এই যে, আবুল মনসুরকে নিয়ে সেভাবে কথা বলতে দেখা যায় না। এখন যেহেতু সোশ্যাল মিডিয়ার সময়, এই যুগে এসে অনলাইনকে কেন্দ্র করে অনেক সাহিত্য বিষয়ক ওয়েব ম্যাগাজিন গড়ে উঠেছে, বইয়ের গ্রুপ জমে উঠেছে বেশ কয়েকটি, যেখানে লক্ষাধিক সদস্যরা বই নিয়ে পর্যালোচনা করেন। তবে সেখানে আবুল মনসুর আহমদের সাহিত্য সম্পর্কে পর্যালোচনামূলক লেখা দেখা যায় কদাচিৎই। আবুল মনসুর আহমদের সাহিত্য আসলে কিছুটা আড়ালেই থেকে গেছে, এর কারণটি কি ঠিক বোধগম্য নয়, তবে অবস্থার প্রেক্ষিতে মনে হয়, আবুল মনসুর আহমদের সাহিত্য সম্পর্কে বিদগ্ধ সমালোচকরা বিশ্লেষণ করার সাহস পাননি, কিংবা কাজটিকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছেন।

কারণ, আবুল মনসুর আহমদ আঘাত করেছিলেন সিস্টেমের উপর, তিনি তার সাহিত্য দিয়ে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিলেন, আঙ্গুল তুলে তিনি দেখিয়েছেন সমাজের অধঃপতিত ক্ষতগুলো। হাস্যরসের মাধ্যমে এত সহজেই তিনি আঘাত করেছেন সমস্যার কেন্দ্রে যে আপনি হয়ত পড়তে পড়তে হাসবেন, তবে আপনার অন্তরে একটা সূক্ষ্ম বেদনাবোধ তৈরি হবে, দেশের প্রতি একটা মায়া জন্মে যাবে। আবুল মনসুর আহমদের ব্যাপকতা বুঝতে হলে আপনাকে খেয়াল করে দেখতে হবে তিনি কোন সময়ে তার সাহিত্যগুলো রচনা করে গিয়েছেন। আপনি অবাক হবেন এই ভেবে যে, পরাধীন দেশে আবুল মনসুর যে সাহসিকতা দেখিয়েছেন তার সাহিত্যধারায়, আমাদের এই স্বাধীন দেশটি সত্য অকপটে বলার সেই সাহস এখন কেন কেউ দেখাতে পারছেন না!

আবুল মনসুর আহমদের চিন্তা প্রক্রিয়াই ছিলো স্বাভাবিকতার চাইতে একটু বেশি গভীর। চিন্তার গভীরতা তাকে দিয়েছে স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য, যা আপনি তার সাহিত্যের মধ্যে খুঁজে পাবেন, আবিষ্কার করবেন এক ধরণের সহজতা, যে সহজিয়া স্বরে ভাষা পায় সমাজের অতি পরিচিত কিন্তু কঠিন কিছু সমস্যা।

তাঁর চিন্তার গভীরতা লক্ষ্য করা যাবে ‘আয়না‘ নামক গল্পগ্রন্থে। আপনি বারবার ধাক্কা খাবেন, আবুল মনসুরের গল্প বলার মুন্সিয়ানা দেখে। তিনি তার আয়নায় দেখিয়েছেন, সমাজের কুৎসিত এক আয়নার চিত্র৷ যে আয়নায় ধর্মের নামে মানুষকে ভুল বুঝিয়ে ধান্ধা করার রাস্তা তৈরি হয়। ২০১৬ সালে হলি আর্টিজানে যে জঙ্গি হামলা হলো, তারপর থেকে অনেকেই অনেক পন্থা খুজে বেরিয়েছেন, কি করে জঙ্গিবাদ থেকে দূরে রাখা যাবে তরুন সমাজকে সে নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে পক্ষে বিপক্ষে৷

আমার মনে হয়েছে, এই জায়গাতে আবুল মনসুরের আয়না আজ খুবই প্রাসঙ্গিক। আয়না ভাবতে শেখাবে, তরুণদের জঙ্গিবাদের দিকে যাওয়া ঠেকাবে। কারণ, এই আয়নায় উন্মোচিত করেছেন ধর্মে উগ্রতাকে কাজে লাগিয়ে কিছু লোক কি করে সবাইকে বোকা বানিয়ে রাখতে চান।

‘আয়না’ একটি কালজয়ী গ্রন্থ। ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত এই অবিস্মরণীয় ব্যাঙ্গ গল্প-গ্রন্থের ভূমিকায় কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন,

‘এমনি আয়নায় শুধু মানুষের বাইরের প্রতিচ্ছবিই দেখা যায় কিন্তু আমার বন্ধু শিল্প আবুল মনসুর যে আয়না তৈরি করেছেন, তাতে মানুষের অন্তরের রূপ ধরা পড়েছে। যে-সমস্ত মানুষ হরেক রকমের মুখোশ পরে আমাদের সমাজে অবাধে বিচরণ করছে, আবুল মনসুরের আয়নার ভেতরে তাদের স্বরূপ-মূর্তি বন্য ভীষণতা নিয়ে ফুটে উঠেছে।’

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আয়না সম্পর্কে লিখেছেন,

“…আবুল মনসুর আহমদের দুঃসাহস সেদিন সমাজ সহ্য করেছিলো। আজ কোনো সম্পাদক এমন গল্প ছাপতে সাহস করবে কিনা এবং সমাজ তা সহ্য করবে কিনা সে সম্পর্কে আমার সন্দেহ আছে। আবুল মনসুরের আক্রমণের লক্ষ্য কোনো ব্যাক্তি, ধর্ম বা সম্প্রদায় নয়।তাঁর বিদ্রোহ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। ‘আয়না’ প্রকাশের এতোকাল পরেও মনে হয়, এরকম গল্পের প্রয়োজন আজও সমাজে রয়ে গেছে।“

আবুল মনসুর আহমদের ব্যাঙ্গাত্মক রচনার সময়কাল মূলত ১৯২২ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল। এই সময়ে তিনি ২৮টি গল্পসহ আরো বেশ কিছু রচনা প্রকাশ করেন। খেয়াল করলে দেখা যাবে এই সময়তে ইতিহাস অনেক বাঁক বদল দেখেছে। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন, দেশভাগ, হিন্দু মুসলিম বিবাধ, ধর্মের নামে ভাওতাবাজি, রাজনীতির নামে নিজনীতি, জমিদারি প্রথার শোষণ, দূর্ভিক্ষ, মানুষে মানুষে বৈষম্য— এই সব ঘটনাবলি খুব কাছ থেকে দেখেছেন আবুল মনসুর আহমদ, রাজনীতি করবার সুবাদে, সাংবাদিকতা করার সুবাদে। ফলে তিনি মানুষের অন্তরের আয়না দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি শোষিতের অন্তরের আয়নায় দেখেছিলেন ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো, শোষণকারীর অন্তরের আয়নায় দেখেছিলেন কুৎসিত হাসি।

তাই সমাজের এসব ঘটনাবলি আবুল মনসুর আহমদ নিজের আয়নায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তার আয়নায় ধরা পড়েছে সমাজের গভীর ক্ষত, নিপীড়িত মানুষের হাহাকার, শোষকদের অট্টহাসি। একটি পরাধীন দেশে বসেও, রাজনীতি করেও আবুল মনসুর আহমদ নষ্ট রাজনীতির বিপক্ষে লিখতে কুন্ঠাবোধ করেননি, ধর্মের নামে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে ছাড়েননি, দূর্ভিক্ষ সময় নেতাদের উদাসীনতায় জনগণের মৃত্যুর চিত্র তুলে ধরতে ভয় পাননি।

আবুল মনসুর আহমদের সাহিত্যের একটি স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য এই যে, তিনি কোনো ব্যাক্তি আক্রমণ করেননি, তিনি আঘাত করেছেন সমস্যাকে, তিনি ব্যাঙ্গ করেছেন সমস্যার ধরণকে। তিনি ব্যাঙ্গ করেছেন রাজনৈতিক প্রহসনকে, অর্থনীতির দূর্নীতিকে, ব্যাঙ্গ করেছেন ধর্মের নামে কর্ম ভুলে যাওয়া বকধার্মিকদের।

খাদ্যের এতো সংকট অথচ রিলিফ এর খাবার চলে যেতো প্রভাবশালীদের কাছে, তারা বস্তায় বস্তায় রিলিফ নিয়ে যেতো, আর কোনো গরীব পরিবার সদস্য বেশি হওয়ার কারণে বাড়তি নিয়ে ফেললেই তাকে ধরে শাস্তি দেওয়া হতো নির্দয়ভাবে। ‘রিলিফ ওয়ার্ক’ নামক গল্পে এমনই একটি প্লটে খাদ্য দূর্নীতি , রিলিফের খাবার নিয়ে স্বজনপ্রীতির কথা তুলে ধরেছিলেন আবুল মনসুর আহমদ। ‘লঙ্গরখানা’ গল্পে লঙ্গরখানার নামে খাদ্য পাচারের ব্যবসায় খুলে বসার গল্প লিখেছেন তিনি। আর ‘সায়েন্টিফিক বিজিনেস’ গল্পে ব্যবসার নামে ধান্দাবাজি, ভেজাল কারবারি, ঘুষ খাওয়া ও কৃত্তিম সংকট তৈরি করার ব্যাপারটি কি অপূর্ব ভঙ্গিমায় লিখেছেন লেখক।

‘ফুড কনফারেন্স’ গল্পে রুপকের আশ্রয়ে লেখক দেখিয়েছেন খাদ্য সংকটকে এড়িয়ে কিভাবে দেশের প্রশাসন নিজেদের মধ্যে বিভাজন করছে, কিভাবে তারা নিজেরাই আবার নিজেদের বিবাদ মেটাতে খাদ্য উৎসব করছে, কিভাবে তারা ভাবছে যে দেশে আসলে খাদ্য সমস্যাই নেই, খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়া মানেই দূর্বিক্ষ নয়, ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে বলেই খাদ্যের দাম বেড়েছে, জনগণের উন্নতি হচ্ছে। এই গল্পে খাদ্য সমস্যা দূর করার জন্য খাদ্যগ্রহণকারী ব্যাক্তিদের কমিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত দেখানো হয়, এই সিদ্ধান্ত কাজে দেয়, মানুষ মারা যায়, খাদ্যের চাহিদা কমে যায়। নেতারা ভাবতে থাকে তারা সফল, তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়েছে! কী অদ্ভুত না!

না, একদমই অদ্ভুত না। এইরকম অবস্থা এখনো বিদ্যমান আমাদের সমাজব্যবস্থায়। উন্নয়নের ফতোয়া দিয়ে অনেক মৌলিক অধিকার থেকেই আমাদের বঞ্চিত রাখা হচ্ছে। মূল সংকটকে এড়িয়ে আজকালকার নেতারা বিভিন্ন ধরণের ভাওতাবাজি করে বেড়াচ্ছেন। খাদ্যে ভেজালের কারণে মানুষ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে, দেখার কেউ নেই। ঘুষ খাওয়াকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে শিল্পের পর্যায়ে। রিলিফের নামে জনগণের আমানত খেয়ে ফেলছে নেতা এবং তার স্বজনরা। ‘নিমকহারাম’ গল্পে আবুল মনসুর আহমদ দেখিয়েছেন, যে নেতারা নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে বাঁকা পথে যায়, সহজ সমাধানের পথে না গিয়ে সংকটকে পাশ কাটিয়ে যেতে বিভিন্ন অপকৌশলের আশ্রয় নেন। খুব পরিচিত দৃশ্য এগুলো, এখনো ঘটে যাচ্ছে আমাদের সমাজে। তবে পার্থক্য এই যে এখন আমাদের একজন আবুল মনসুর নেই, যিনি সোচ্চার হয়ে কথা বলবেন এসবের বিরুদ্ধে, হাসির গল্পে প্রান্তিক জনপদের অনন্ত বেদনার সব গল্প তুলে আনবেন।

এই যুগে এসে জনগণকে আশার চলনে ভুলিয়ে জনসেবার নিজের আঁখের গুছাতে ব্যস্ত জনপ্রতিনিধিরা। নির্বাচনের আগে কি সুন্দর এসে কাকুতি মিনতি করেন তারা, ভোট দিলেই পাল্টে দেবেন সব, ভোটের পর পাল্টান শুধু তারাই। জনগণ যেমন আছে, তেমনই থেকে যায়। আবুল মনসুর আহমদ যে সময়ে বেঁচে ছিলেন তখনো এই সমস্যাগুলো ছিল। তিনি রাজনীতির এই নোংরা দিকটি তুলে ধরেছেন তার ব্যাঙ্গগল্পের মাধ্যমে। ‘জনসেবা ইউনিভার্সিটি’ গল্পে তিনি দেখিয়েছেন, ইয়াকুব যে নিজের জীবনে কিছুই করতে পারেনি, সে সিদ্ধান্ত নেয় জনসেবা করবে। সে জনসেবা করবে এই আশা দিয়ে মানুষকে তার পাশে থাকতে বলতো। এভাবে মানুষকে সেবার আশা দিয়ে সে তাদের ব্যবহার করে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যখন যায় তখন সে নিজেই বদলে যায়, নিজের নামে হাইস্কুল, বাবার নামে দাওয়াখানা দেওয়াকে উন্নয়ন বলে প্রচার করেন, শেরওয়ানি পাজামা ছেঁড়ে কোট পড়া ধরেন। জনসেবার নামে আত্মসেবার ব্যাপারটিকে ব্যাঙ্গ করেছেন এ গল্পে।

‘জমিদারি উচ্ছেদ’ নামে আরেকটি গল্পে লেখক নির্বাচনি ওয়াদা ভঙ্গকারীদের ব্যাঙ্গ করেন। এই গল্পে জমিদার প্রথা উচ্ছেদ করার স্বপ্ন দেখিয়ে মানুষের কাছে ভোট চেয়ে পরে গল্পের চরিত্রটি নিজেই জমিদার বনে যায় এবং জনগণকে বোঝায়, এখন সে জমিদার হওয়াতে জনগণের উপকার করতে পারবে! তবে সত্য এই যে, অত্যাচারীর চেহারাটা শুধু বদল হয়, অত্যাচারের দৃশ্যগুলো একরকমই রয়ে যায়। তাই, জমিদার বদলালেও কৃষকদের ভাগ্য বদল হয় না। ‘বন্ধু বান্ধবের অনুরোধে’ নামক গল্পে লেখক ফুটিয়ে তোলেন নমিনেশন ব্যবসার চিত্র। টাকার বিনিময়ে যে নমিনেশন দেওয়া-নেওয়ার চিত্র এটি তো আজও পাল্টায়নি। এত বছর পরেও তাই এই গল্পটিকেও জীবন্ত মনে হয়।

এখন লিখতে গিয়ে অনেকেই অনেক পক্ষকে তুষ্ট করে লিখতে যান। আবুল মনসুর আহমদ এইদিক থেকে ব্যাতিক্রম, তিনি লিখে যখন যা বলতে চেয়েছেন, সেটায় কখনোই দ্বিধা ছিলো না। যেমন ১৯৪৭ সালের কথা বলা যেতে পারে। রাষ্ট্রভাষার দাবিতে তমুদ্দিন মজলিশ ঘটিত হয়েছিলো। ৪৭’এর ১৫ই সেপ্টেম্বর একটি বুলেটিন বের করে তারা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’ এই বিষয়ক। এই বুলেটিনে তিনটি লেখা ছাপা যায়, যার একটি আবুল মনসুর আহমদের। তিনি তার লেখার শিরোনাম দিয়েছিলেন, “বাংলা ভাষাই হইবে আমাদের রাষ্ট্রভাষা”। কি স্পষ্ট চিন্তা ছিলো তার দেশকে নিয়ে, দেশের ভাষা কি হবে সে ব্যাপারে কি স্পষ্ট তার অবস্থান তিনি ব্যাক্ত করেছিলেন!

আজকের যুগে নেতাদের মধ্যে এই দূরদর্শিতা দেখা যায় না, লেখকদের মধ্যে এই স্পষ্টবাদীতা দেখা যায় না। আবুল মনসুর আহমদ তার সেই লেখায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার সমর্থনে সাতটি যুক্তি দেন তিনি। তিনি লিখেছিলেন,

জনগণের ভাষা ও রাষ্ট্রের ভাষা এক না হলে প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়িয়া উঠতে পারে না। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ফারসীর জায়গায় ইংরেজিকে রাষ্ট্রভাষা করিয়া বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ মুসলিম শিক্ষিত সমাজকে রাতারাতি ‘অশিক্ষিত’ সরকারি কাজের অযোগ্য করিয়াছিলো; উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করিলেও বাংলাকেও শিক্ষার মিডিয়াম রাখা হইবে বলিয়া যে প্রচার করা হইতেসে উহা কার্যত ভাওতা ও রাজনৈতিক প্রবঞ্চনায় পরিণত হইবে কারণ, জীবনের সকল ক্ষেত্রের যোগ্যতার মাপকাঠি হইবে রাষ্ট্রভাষায় জ্ঞ্যানের বিস্তৃতি ও গভীরতা।

মানুষ যদি নিজের ভাষায় নিজের ভাব না ব্যক্ত করতে না পারে সেই রাষ্ট্রে গণতন্ত্র হবে কি করে! বাংলাকে শিক্ষার মিডিয়াম রাখলেও উর্দুই যে যোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে যেতে পারে সেটিও বিচক্ষণতার সাথে তুলে ধরেছিলেন। এই গভীর পর্যবেক্ষণটি কি সহজেই করেছিলেন আবুল মনসুর আহমদ! ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর এই লেখা বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, স্পষ্টবাদীতা ও দূরদর্শী অন্তদৃস্টির কারণে।

আমাদের বর্তমান জাতীয় জীবন, রাজনৈতিক জীবন, অর্থনৈতিক জীবন, ধর্মীয় জীবন- যা কিছু নিয়ে আমাদের সমাজ, যা কিছু হারিয়ে আমাদের অধঃপতন সেই জায়গাগুলোতেই আবুল মনসুর তাঁর দাগ রেখে গেছেন, তাঁর চিন্তাগুলো গল্পের ছলে বলে গিয়েছিলেন, যা আজ যেন এই সময়ে বেশি জ্যান্ত হয়ে উঠেছে। এই সংকটের সময়ে আবুল মনসুর আহমদকে পাঠ করলে নিশ্চয়ই আমরা তার লেখার মধ্যে আমাদের ভুলগুলোর উত্তর খুঁজে বেড়াতে পারবো, আমরা জানবো কি করে আমরা বোকা হয়ে থাকাকেই বেছে নিতে চাই, আমরা জানবো আমাদের জীবনকে আমরা নিজেরাই কতটা নিচে নামিয়ে রেখেছি।

গত ৩ সেপ্টেম্বর ছিল আবুল মনসুর আহমদের ১২০তম জন্মবার্ষিকী। এই মহান সাহিত্যিক ও প্রখ্যাত রাজনীতিবিদের প্রতি রইলো আমাদের অকৃত্তিম শ্রদ্ধা। আবুল মনসুরের সাহিত্যের আয়নায় একবার ডুব দেয়ার নিমন্ত্রণ, যে আয়নায় নিশ্চয়ই ধরা পড়বে আমাদের অবচেতন, অসচেতন সমকালীন জীবনের ইতিকথা…

Comments
Spread the love