আবুল ফাতাহ, একজন লেখক, প্রচ্ছদশিল্পী। তার লেখায় পাঠক ঘোরগ্রস্ত হন, এমনই দাবি পাঠকদের। শুধু বইমেলাকেন্দ্রিকতা নয়, এর থেকে বেরিয়েই লেখেন এই লেখক। এবারের বইমেলায় থাকছে তার ৭টি বই। পূর্বের ৬টি বইয়ের সাথে এবারের বইমেলায় যোগ হয়েছে ‘দ্য এন্ড’। কথা হলো লেখকের সঙ্গে।

প্রত্যেকটি কাজেরই একটা শুরু থাকে। লেখালেখির শুরুটা কবে এবং কীভাবে হয়েছিলো?

আবুল ফাতাহ: লেখালেখির শুরুটা খুব একটা আগে নয়। অনেকের শৈশব থেকেই লেখার হাতেখড়ি হয়। অনেকে সেই স্কুল জীবনেই ছড়া, কবিতা কিংবা গল্প লিখতে শুরু করে। আমার ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি। দশ বছর আগে প্রথম কলম তুলে নেই হাতে। প্রথম লেখাটাই ছিল একটা থ্রিলার উপন্যাস। সেই থেকে চলছে।

এ পর্যন্ত আপনার কয়টি বই প্রকাশিত হয়েছে এবং বইগুলোর প্রেক্ষাপট কী ছিলো?

আবুল ফাতাহ: এ পর্যন্ত আমার সাতটি বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রহর শেষে, একজন অভ্র এবং জনৈক পিতা, আততায়ী, আলোয় রাঙা, এই নগরের পথে, অভ্রত্ব ও এই মেলায় প্রকাশিত- দ্য এন্ড। এর মধ্যে তিনটি বই-ই আমার সৃষ্ট চরিত্র ‘অভ্র’ সিরিজের। আর এবারের মেলায় প্রকাশিত ‘দ্য এন্ড’ হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার। ‘দ্য এন্ড’কে আমার ড্রিম প্রজেক্ট বলা যায়। তিন বছর ধরে লিখেছি উপন্যাসটা। প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলতে গেলে একটু পিছিয়ে যেতে হয়।
১৯৪৮ সালের ৩০ নভেম্বর সন্ধ্যায় অস্ট্রেলিয়ার সমরটন বিচে ঘটে যায় এক অদ্ভুত মৃত্যুর ঘটনা। সেই মৃত্যু আজও পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম এক রহস্য হয়ে আছে। এর সাথে জড়িয়ে আছে এক জগৎবিখ্যাত কবির অমর কাব্যগ্রন্থ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল- সব মিলিয়ে আজও অনেকেই এই রহস্যের তল পাবার জন্য রীতিমতো গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন (সঙ্গত কারণেই এর বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না)।

আজ থেকে চার বছর আগে আমি যখন প্রথম এ ঘটনার কথা জানতে পারি তখন খুবই চমৎকৃত হই। এ যেন ‘ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দেন ফিকশন’ এর জলজ্যান্ত উদাহরণ! তখন থেকেই এই চমকপ্রদ সত্য ঘটনা নিয়ে ফিকশন লেখার ইচ্ছা করি। তবে শুধুমাত্র সেই ঘটনা বলে গেলে তো ইতিহাস হয়ে গেল। আমি ইতিহাস না, গল্প বলতে চাই। তিন বছর ধরে সেই ঘটনাকে অবলম্বন করে চারপাশ ঘিরে বুনতে লাগলাম আমার গল্পের প্লট। একমুঠো ইতিহাসের সাথে এক চিমটি ফিকশন জুড়ে তৈরি হয় হিস্টোরিক্যাল ফিকশন। সেই ফিকশনকেও আবার হতে হয় সত্যের খুব কাছাকাছি। হাঁসের সাথে সজারু জুড়ে ‘হাঁসজারু’ বানানো আজকালকার পাঠক মেনে নেবে না। আমি আমার রেসিপিতে ফিকশনকে বাড়িয়ে দিয়েছি হিস্টোরিকে মজাদার করে পরিবেশন করতে। তবে সবই ছিল সত্যের খুব কাছাকাছি। গল্পের প্রয়োজনেই এতে এসেছে বাংলাদেশ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর ইতিহাসের দু’জন অমর মুসলিম ব্যক্তিত্ব। দান্তে, মুসোলিনি বা ভিঞ্চিকে নিয়ে থ্রিলার লেখা হলেও কোনো মুসলিম ব্যক্তিত্বকে নিয়ে আগে কোনো থ্রিলার লেখা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। আমি চেষ্টা করেছি আমার ক্ষুদ্র ক্ষমতা থেকে। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত পাঠকের প্রতিক্রিয়াতে মনে হচ্ছে, চেষ্টাতে খুব একটা ব্যর্থ হয়নি। ‘দ্য এন্ড’ বইটি প্রকাশ করেছে রোদেলা প্রকাশনী।

একেকটি আলাদা গল্প বা উপন্যাসের ক্ষেত্রে বইয়ের পেছনেও এক বা একাধিক গল্প থাকে। আপনার ‘দ্য এন্ড’ বইটির পেছনের গল্প জানতে পাঠক নিশ্চয়ই আগ্রহী হবে।

আবুল ফাতাহ: ‘দ্য এন্ড’ লেখার পেছনে আমার একটা স্বপ্ন আছে। আগেই যেমন বলেছি, বইটা হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার। ইতিহাস জিনিসটার প্রতি অনেকেরই একটা ভীতি কাজ করে। কিন্তু ফিকশনের মধ্যে দিয়ে ইতিহাসটা তুলে ধরলে অনেকেই হয়তো আগ্রহী হবে। আমি এটা নিয়েই কাজ করতে চাই। ইতিহাসের নানা বিষয় উপাদেয় করে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চাই। যেমন এই মুহূর্তে আমার নতুন ড্রিম প্রজেক্ট হলো বাংলাদেশের ‘লিভিং ঈগল’ সাইফুল আজমকে নিয়ে থ্রিলার লেখা। এরকম ‘ইচ্ছের’ গল্পই মূলত দ্য এন্ড বইটির পেছনে।

হিমু, মিশির আলী, মাসুদ রানা ইত্যাদি চরিত্রের মত প্রত্যেক লেখকই এক বা একাধিক চরিত্র সৃষ্টি করেন যার মাধ্যমে লেখককে আলাদা করে মনে রাখেন পাঠক। আপনার এই লেখেলেখির যাত্রায়, এমন কোনো চরিত্র কী সৃষ্টি করতে পেরেছেন?

আবুল ফাতাহ: লেখক হিসেবে আমি অতো জনপ্রিয় কেউ নই। আমার সৃষ্ট চরিত্রও অতো জনপ্রিয় হবে না- এটাই স্বাভাবিক। তবে এতটুকু বলতে পারি, আমার সৃষ্ট ‘অভ্র’ চরিত্র আমাকেও ছাড়িয়ে গেছে। সেদিন ইনবক্সে একজন বলছিল, তার একাধিক ক্লাসফ্রেন্ড নাকি নিজেদের ‘অভ্র’ বলে পরিচয় দেয়। এমনকি তাদের বই খাতাতেও নিজের নাম ‘অভ্র’ লেখে! আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টেও একাধিক ‘অভ্র’ আছে। আমার মতো একজন লেখকের জন্য এর চাইতে বেশি আর কী চাইবার থাকতে পারে? এছাড়াও ‘দ্য এন্ড’ এর নায়ক হলো বাঙালি মেজর সাইফ হাসান। এই চরিত্রটাকেও অনেকেই ভালবাসে।

কোন ধরণের লেখা পড়তে পছন্দ করেন আর নিজের লেখালেখির ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্যের ঘরানা কোনটি?

আবুল ফাতাহ: থ্রিলার। আসলে থ্রিলার বললে ভুল হবে। আমার রহস্যের আবহটা ভাল লাগে। সেটা যেকোন ধরনের লেখাই হতে পারে। মার মার কাট কাট ব্যাপার থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। লেখার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

পেশা এবং লেখালেখি, এই দুইয়ের মাঝে কেমন ঝামেলায় পড়তে হয়?

আবুল ফাতাহ: এমনিতে মানিয়ে নিতে পারি। তবে মেলার আগে একটু প্রেশার হয়ে যায়। তবে বই প্রকাশের পর পাঠকের প্রতিক্রিয়া দেখে পরের বছর এই পরিশ্রমটুকু সাদরে মাথা পেতে নেবার অনুপ্রেরণা পেয়ে যাই!

লেখালেখির পাশাপাশি প্রচ্ছদের কাজেও আপনাকে দেখা গিয়েছে। প্রচ্ছদ তৈরির প্রতি আগ্রহের শুরুটা কবে এবং কীভাবে?

আবুল ফাতাহ: হ্যাঁ প্রচ্ছদও করছি। এবার মেলাতে প্রায় অর্ধ শতাধিক প্রচ্ছদের কাজ করলাম। আসলে আগ্রহটা কবে কখন শুরু হয়েছে ওভাবে বলতে পারব না। তবে শুরু থেকেই নিজের বইয়ের প্রচ্ছদ নিজেই করতাম। সেখান থেকেই কীভাবে যেন প্রফেশনাল প্রচ্ছদশিল্পী হয়ে গেলাম!

প্রচ্ছদ শিল্পী এবং লেখক, কোন পরিচয়টা কেমন অনুভব করেন?

আবুল ফাতাহ: লেখক পরিচয়কেই প্রাধান্য দেই এবং দেবো। তবে কাজটাকে আমি লেখালেখির মতোই উপভোগ করি। একটা বইকে শুধুমাত্র প্রচ্ছদের মধ্যে দৃষ্টিনন্দন উপায়ে ধারণ করাটা সহজ কাজ না। তবে ভাল একটা প্রচ্ছদ করে দারুণ শান্তি পাওয়া যায়, যেভাবে ভাল একটা গল্প লিখে পাই।

পাঠক তৈরিতে লেখক ও লেখক তৈরিতে পাঠক, কার অবদান কেমন থাকে বলে আপনার মনে হয়?

আবুল ফাতাহ: পাঠক কখনও লেখক তৈরি করতে পারে না। হ্যাঁ, তাকে জনপ্রিয় করতে পারে। কিন্তু ‘লেখক’ হতে হয় লেখকের নিজেকেই। তবে একজন লেখক অনেক পাঠক তৈরি করতে পারেন। যার জলজ্যান্ত উদাহরণ ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ।

বর্তমানে তরুণ লেখকদের মধ্যে এমন কেউ আছে যাকে আপনার প্রিয় লেখকদের তালিকায় রাখতে পারেন? বা এমন কেউ যাকে দেখলে মনে হয় বাংলা সাহিত্যে এই মানুষটি টিকে থাকবে, তার টিকে থাকা উচিত?

আবুল ফাতাহ: তাঁকে তরুণ হয়তো বলা যাবে না, তবে তিনি এখনকারই লেখক। দুঃখের বিষয় আমি নাম বললেও হয়তো অনেকে চিনবে না। কিন্তু চেনা উচিত ছিল। মোহাম্মদ আলমগীর তৈমূর স্যার। সাস্টের ইংরেজি বিভাগের প্রধান তিনি। বয়সে তিনি সিনিয়র, তবে আমি যদ্দূর জানি তিনি বেশিদিন যাবত লেখালেখি করেন না। সেই হিসেবে তাঁকে এ সময়ের লেখক বলা যায়। অসাধারণ লেখেন।

এতো কথার পরে শেষমেশ এসে যদি জানতে চাই ‘কেনো লেখেন?’ আপনার উত্তরটা কেমন হবে?

আবুল ফাতাহ: এর উত্তরে বলতে হয়, আমি খুবই স্বার্থপর ধরণের মানুষ। লিখিও নিজের স্বার্থের জন্য। বাংলা সাহিত্যে অবদান রাখা বা সমাজ সংষ্কার জাতীয় ভারী ভারী দায় নিয়ে আমি লিখি না। মানুষের সময়টা একটু ভালো কাটুক, পড়ার পর বইটা হাতে নিয়ে খানিক ঘোরগ্রস্থ থাকুক, একটা তৃপ্তির আবেশ নিয়ে আমাকে ধন্যবাদ জানাক- এতটুকুতেই আমার স্বার্থ। এজন্যই লিখি আমি।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-