সজিব ঘোষ:

কয়েক দিনের শীতের প্রকোপ কিছুটা কমে এসেছে। কমে এসেছে কুয়াশার অন্ধকার। মিলছে সুর্যি মামার তাপের দেখা। শীতে গাছগুলো নড়ছে না। গোটা কয়েক শুকনো পাতা নিচে পরে আছে। দূরে পরে আছে প্রিয়তমার মন। এমন এক বিকেলে দেখা মিলল ৫২ বছর বয়সী এক নবীন নির্মাতার। চায়ের ছলে আড্ডা দিতে বসে গেলাম তার সঙ্গে।

দেশ যখন স্বাধীনতার স্বাদ নিতে উত্তাল। চারদিকে চলছে নানান সমীকরণ। হিসেব মেলাতে ব্যস্ত সবাই। এমন সময় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম হয় তার। বাবা নাম রাখেন আবু আকতারুল ইমান। তার কাছে জীবন বড়ই সহজ। জীবনের দর্শন আরও সহজ। ভালো কাজ তো সবাই করতে চান, তিনিও তাই চান। তবে সে কাজ যেন বেঁচে থাকে বহুকাল, এটাই বাসনা তার। তিনি কখনো নিজেকে প্রাধান্য দেননি, আলোচনার আসতে চাননি। চেয়েছেন আলোচনা যেন হয় তার কাজ নিয়ে। তিনি মরে গেলেও যেন কাজটা বেঁচে থাকে।

প্রথমে ভেবে ছিলাম তার সঙ্গে আড্ডা জমবে না। ৫২ বছর বয়সী মানুষ জ্ঞান ছাড়া আর কী দিবে? কিন্তু আমার সেই ভুল ভেঙ্গে গেল প্রথম মুহুর্তেই। আড্ডার শুরুতেই পকেটের পেকেট থেকে একটা সিগারেটে (ধূমপাম মৃত্যুর কারণ) আগুন দিলেন, আমার হাতেও ধরিয়ে দিলেন একখানা। আগুন জ্বলছে কথা চলছে। আগ্রহ চাপা দিয়ে রাখতে পারলাম না বেশিক্ষণ। প্রথম জিজ্ঞাসা, ৫২ বছর বয়সে এসে নবীন নির্মাতা, কেমনে কী? মুচকি হেসে কইলেন, শিখলাম। শিখতে শিখতেই ২৭টা বছর গেলো। শুরুটা নব্বইয়ের গোঁড়ার দিকে। প্রথম এফডিসি’র দরজায় পারা দেওয়া। তারপর তো তারপরই, চলছে।

মাঝে অবশ্য কিছুটা বিরতি নিয়েছিলেন। একে লম্বা বিরতিও বলা যেতে পারে। অনেকটা পেটের টানে, কিছুটা যৌবনের ছাক্কা-নাক্কা ভরা সিনেমার চাহিদার কারণে। তার ভাষ্যে, তখন সিনেমায় কাজ করি এটা মানুষকে বললে কিভাবে যেন তাকাতো। মনে হওয়া শুরু করলো, পাপ করছি। তাছাড়া শুরুর দিকে আমি কখনোই চাইনি এগুলো করতে। বাবা যেহেতু প্রযোজক ছিলেন; তার মাস্টার ফাদে পা দিয়ে ছিলাম। বিসিএস পরিক্ষায় তিনবার ভাইভা থেকে বাদ যাওয়ার পর ওই মুখে আর যাইনি। এদিকে আবার ‘প্রথম প্রেম’ করার পর কিছুটা স্বাদ লাগতে শুরু করলো। তারপর অনেক দিন কাজ করলাম না। সর্বশেষ সিনেমা হিসাবে মাটির ময়না’তে প্রধান সহকারী পরিচালক ছিলাম। এর আগে হঠাৎ বৃষ্টি, চুপিচুপি, রঙ্গির সুজন সখী, স্বামী কেন আসামী, আমার প্রতিজ্ঞা, অনন্ত ভালোবাসা সহ আরও বেশকিছু সিনেমা’তে সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছি। 

শুধু তাই নয়, জাতিসংঘ, সেভ দ্যা চিল্ডেন, ইউনিসেফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার জন্য তৈরি করেছেন ১০০ এরও বেশি ডকুমেন্ট্রি।

কথায় কথায় জানতে পারলাম। নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরের তুলশী রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৫ সালে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন। পরের বছর ভর্তি হন কে এল জুবিলি হাই স্কুলে। সেখান থেকে ১৯৮১ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৮৩ সালে নটরডেম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করেন। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ থেকে স্নাতক সম্মান করেন ১৯৮৬ সালে। একই বিভাগ থেকে পরের বছর মাস্ট্রার্স ডিগ্রী অর্জন করেন।

ইমান সাহেবের কর্ম জীবনের সব থেকে বড় অপ্রাপ্তির জায়গা, কখনো সিনেমা বানাতে পারলেন না তিনি। একটা সময় অনেকেই ২৫/৩০ লাখ টাকা দিয়ে তাকে বলতেন সিনেমা বানাতে। কিন্তু তা দিয়ে যে সিনেমা হবে সেটা তিনি বানাতে চাননি। তারপর সরে এসেছেন। কখনো তিনি যাননি, আবার কখনো তাকে ডাকেননি। মোট কথা দুয়ে দুয়ে চার হয়ে উঠেনি। এবার সে আক্ষেপ ঘুচতে যাচ্ছে। অবসান মিলছে অপেক্ষার। ৫২ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে তৈরি করছেন নিজের জীবনের প্রথম সিনেমা, ‘মিস্টার বাংলাদেশ’

নিজের জীবনের প্রথম সিনেমার প্রত্যাশা নিয়ে তার ভাবনা আরও পরিস্কার। শুরু যখন হয়েছে। বেঁচে থাকতে থাকতে আরও কিছু সিনেমা বানাতে চান। প্রথম সিনেমার মায়ার যে ছাপ, তা তার চোখে মুখে জ্বল জ্বল করছিল। শেষ কথায় তিনি বললেল, ‘সিনেমাতে দর্শক হচ্ছে গড। আশা করি তারা সিনেমাটা আপন করে নিবে। এত দিন পর যেহেতু একটা বানাচ্ছি, গল্পটা দেখেই বানাচ্ছি। সিনেমা যে মানুষের কত আপন, কতটা তাদের কথা বলে, কতটা জীবনের কথা বলে। তা এখানে ফুটে উঠবে মধ্য দুপুরের সূর্যের মতো।’

এত কথা বলে ফেললাম, ৫২ বছর বয়সী শিশুটার নাম বলা হলো না। তার নাম আবু আকতার উল ইমান। অনেক অনেক শুভকামনা আপনার জন্য।

ছবি- Ashad Abedin Joy

Comments
Spread the love