সিনেমা হলের গলি

মোটা আর কুৎসিত নারীরাই নাকি হয়রানির অভিযোগ তোলে!

বলিউডে চলছে মি-টু ঝড়। নিজেদের সাথে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানীর বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন একাধিক অভিনেত্রী-পরিচালক-মিডিয়া কর্মী বা সাধারণ নারী। এমন সব মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, অনেকেই হতভম্ভ হয়ে পড়েছেন শুনে। এত বছর ধরে যাদের অভিনয় দেখে এসেছি, যাদের ভীষণ ভক্ত ছিলাম আমরা, তাদেরই ভিন্নরকমের একটা চেহারা দেখতে পেয়ে চমকে গেছি ভীষণ। নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে তনুশ্রী দত্তের অভিযোগ দিয়ে শুরু, তারপর একে একে এই তালিকায় যোগ হয়েছে বিকাশ ভেল কিংবা অলোক নাথের মতো মানুষের নামও! এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যৌন হয়রানীর, অলোক নাথের বিরুদ্ধে তো ধর্ষণের অভিযোগও আছে!

এবার বলিউডি গায়ক অভিজিৎ ভট্টাচার্য্যের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠলো যৌন হয়রানীর। ঘটনাটা ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগে, কলকাতায় একটা পার্টিতে। যিনি এই অভিযোগ এনেছেন, তিনি এয়ার হোস্টেস হিসেবে তখন চাকুরি করতেন একটা বিমান পরিবহন সংস্থায়। অভিজিৎ সেই নারীর এক রুমমেটের বন্ধু ছিলেন। পার্টিতে তার গায়ে অশালীনভাবে হাত দিয়েছিলেন অভিজিৎ, তাকে বাজে প্রস্তাবও দিয়েছিলেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টের মাধ্যমে জানিয়েছেন তিনি। এই অভিযোগের জবাবে অভিজিৎ যেটা বলেছেন, সেটা মোটামুটি বিস্ফোরকই বটে! তার ভাষ্যমতে, মোটা আর কুৎসিত দেখতে নারীরাই নাকি শুধু যৌন হয়রানির অভিযোগ আনে। আর আলোচনায় আসার জন্যেই নাকি এসব অভিযোগ তোলা হয়! 

যদিও আলোচনায় থাকার শখটা অভিজিতের নিজেরই খুব বেশি, তার অতীত কর্মকাণ্ডের দিকে তাকালেই সেটা বোঝা যায়। পাকিস্তানী শিল্পীরা বলিউডে কাজ করলে তার সমস্যা হয়, কারণ তাতে তার ভাত মারা যায়, পেট চালাতে সমস্যা হয়। তাই তিনি ‘জাতীয়তাবোধে’ উজ্জীবিত হয়ে বিশাল বুলি কপচান। শাহরুখ খান ভারতীয়দের অসহিষ্ণুতা নিয়ে কথা বললেও তার সমস্যা হয়, আলোচনায় আসার জন্যে শাহরুখকে নিয়ে দু-চারটে আলপটকা মন্তব্য ছুঁড়ে দেন তিনি। সেই অভিজিৎই এবার আলোচনায় আসার অভিযোগ তুলছেন অন্যদের দিকে! অবশ্য, গা বাঁচাতে চাইলে এটা ছাড়া আর কীইবা করার আছে!

অভিযোগকারী সেই নারীর নাম বোধিস্বত্ব ইয়ামায়োহো। তিনি জানিয়েছেন, ১৯৯৮ সালে কলকাতার একটা পাবে অভিজিৎ তার সঙ্গে জোরপূর্বক ঘনিষ্ঠ হবার এবং চুমু খাওয়ার চেষ্টা করেন। তার সঙ্গে জোর করে নাচতে চেয়েছিলেন অভিজিৎ। তিনি রাজী না হওয়ায় তার গায়ে বাজেভাবে স্পর্শ করেন এই শিল্পী, এবং তাকে উচিত শিক্ষা দেবেন বলেও শাসিয়ে যান।

এই অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে অভিজিৎ বলেছেন, তিনি নাকি জীবনে কোন ক্লাবহাউজ বা পাবে যাননি। রাতবিরেতে কোন পার্টিতেও তাকে দেখা যায় না দাবী করে অভিজিৎ বলেন, অযথা তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যে সময়ের অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেই সময় তার জন্মও হয়নি বলে রসিকতা করেছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে এর আগেও নারীদের যৌন হয়রানী করার অভিযোগ উঠেছে- এটা মনে করিয়ে দেয়ার পরে অভিজিৎ বলেছেন- “কেউ যদি আমার নাম ভাঙিয়ে দু-চার পয়সা কামাতে চায়, একটু খ্যাতি পেতে চায়, আমি কি করতে পারি?” 

এই অভিযোগ যদি মিথ্যা হয়, তাহলে এটার বিরুদ্ধে কোন আইনী পদক্ষেপ নেবেন কিনা, এই প্রশ্নের জবাবে অভিজিৎ যেটা বলেছেন, সেটাই হয়তো তার মুখোশটা খুলে দিয়েছে, আসল চেহারাটা বেরিয়ে পড়েছে তার। অভিজিৎ বলছিলেন-

“আমি জানি না কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। আপনারা (মিডিয়া) কেন এই একটা জিনিস নিয়েই পড়ে আছেন? আমি তো এটাকে গুরুত্ব দিচ্ছি না, আপনারা দিচ্ছেন। আর গুরুত্ব দেয়ারই বা কি আছে? এ পর্যন্ত যারা যৌন হয়রানীর অভিযোগ এনেছে, প্রত্যেকটা মেয়ে দেখতে কুৎসিত। কেউ কালো, কেউ মোটা। আমি বুঝি না, এদের দিকে তো কারো ফিরে তাকানোরও কথা না। তাহলে এদের হয়রানী করে টা কে? রাজ্যের যতো কুৎসিত আর মোটা মেয়েগুলো একটু অ্যাটেনশন পাবার ধান্ধায় এখন হয়রানীর অভিযোগ তুলছে…”

অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য গান ভালোই গাইতেন। বলিউডে তার গাওয়া বেশকিছু গান একসময় দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল। ইয়েস বস, জোশ, বাদশাহ বা চালতে চালতে’র মতো সিনেমায় গান গেয়েছেন তিনি। প্রতিভা তার মধ্যে নিশ্চয়ই আছে। তবে মানুষটা যদি ভালো না হন, প্রতিভা দিয়ে আর কি হবে! হৃদয়টা যার পঁচে নষ্ট হয়ে গেছে, তাকে আবর্জনার ভাগাড়ে ছুঁড়ে ফেলা ছাড়া আর কোন উপায় তো নেই। 

অভিজিৎ বেমালুম অস্বীকার করছেন সবকিছু, যারা যৌন হয়রানীর অভিযোগ তুলছেন, তাদের নিয়ে কটুক্তিও করেছেন। কিন্ত শাক দিয়ে তো আর মাছ ঢেকে রাখা যাবে না। আর অভিজিতের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগও তো এই প্রথম নয়, এর আগেও কয়েকবার উঠেছে এমন অভিযোগ। যাহা রটে, তার কিছু হলেও নাকি ঘটে। এখন মি-টু আন্দোলন তুঙ্গে বলেই হয়তো অভিযোগগুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, এর আগে যখন এসব অভিযোগ এসেছে তখন কেউ পাত্তাই দেয়নি এসবে।

অভিজিৎ ভট্টাচার্য্যের মতো মানুষগুলো নারীদের ভোগ্যপন্যের বেশি কিছু ভাবতে চান না। ভাবেনও না। তারা মেধাবী, তারা স্টার, এসবের গরিমায় অন্ধ হয়ে অভিজিৎরা ভাবেন, চাইলেই বুঝি তারা সব পেয়ে যাবেন! চাইলেই তারা যে কোন নারীকে ইচ্ছামতো স্পর্শ করতে পারবেন, তারা চাইলেই যে কোন মেয়ে তাদের সঙ্গে শুতে রাজী যাবে! যারা সাহস করে যৌন হয়রানি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেন, তাদের মোটা বা কুৎসিত বলে অপমান করার চেষ্টা করে অভিজিতের মতো কাপুরুষেরা। অথচ তারা জানে না, জগতের সবচেয়ে কুৎসিত বস্তুটা লুকিয়ে আছে তাদের শরীরে, যেটাকে আমরা হৃদয় বলে ডাকি… 

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close