ছবিটি বাংলাদেশের একটি দুর্গম এলাকার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওয়ার্ডের ছবি। আমার হাসপাতালের। চকচক করা ছবির পিছনে নানা রকমের গল্প আছে। গল্পগুলো হতাশার, কিছুটা কষ্টের।

সাড়ে তিন মাস আগে ৩৫ বিসিএস-এ আমার পদায়ন হয় এসিস্ট্যান্ট সার্জন হিসেবে। সাবসেন্টারে অবকাঠামো না থাকায়, দুর্গম এলাকা হওয়ায়, এবং হেলথ কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত ডাক্তার না থাকায় সিভিল সার্জন স্যারের মৌখিক অর্ডারে উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে কাজ শুরু করি। কাজ শুরু করতে যেয়ে দেখি এটা তো আসলে হাসপাতাল না, বলতে গেলে একটা হরিঘোষের গোয়াল।

উপজেলা সমন্বয় মিটিংয়ে গেলাম একদিন। টিএনও স্যার ও উপজেলা চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে উপস্থিত অন্যান্য দপ্তরের কর্মকর্তা, ও বিভিন্ন পর্যায়ের সুধীজন মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে হাসপাতালকে একদম ধুয়ে দিল। সবচেয়ে বড় অভিযোগ হাসপাতাল ময়লা, টয়লেট অপরিষ্কার, ঢোকা যায় না। নতুন জয়েন করায় এবং এই প্রজন্মের ডাক্তার হিসেবে ভিতরে প্রচন্ড লাগল। ফিরে এসে ঘোষনা দিলাম হাসপাতালের পরিষ্কার পরিছন্নতার ব্যাপারটা আমি নিজে দেখব।

হাসপাতাল প্রায় বিশ বছর ধরে ময়লা। পাচ জন ক্লিনার এবং দুই জন ওয়ার্ডবয় আছে হাসপাতালে। প্রায় সবাই পান খায়। বাইরের টং দোকান থেকে পান কিনে সবাই মিলে একসাথে খায়। কদম গাছের গোড়ায় বাধানো সুন্দর বসার জায়গা আছে। সবাই মিলে বসত আর রুগীর দালালী করত। একজন মাত্র ডাক্তার প্র‍্যাকটিস করেন। আমাদের Uhfpo স্যার। তারপরেও দালালির ব্যাপারটা ভাল করে বুঝতাম না। পরে অবশ্য আরো বহু কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছি সময়ের সাথে। সেগুলো থাক। মুল কথায় আসি।

বিগত বিশ বছরের ময়লা হাসপাতালের আনাচে কানাচে জমে পাহাড় হয়ে গেছে। প্রসুতি মহিলাদের মাসিকের প্যাড, ইউরিন ব্যাগ, আর ক্যাথেটারে সব কিছু সয়লাব। দোতলার জানালার কার্নিশ থেকে শুরু করে প্রতিটা যায়গায় একটা করে ঝুলছে। একজন সুস্থ মানুষের পক্ষে সেগুলো দেখা সম্ভব নয়।

ক্লিনারদেরকে বললাম পরিষ্কার করতে হবে। সরাসরি নাকচ করে দিল। বিশ বছর আগের ময়লা তারা পরিষ্কার করবে না। কোন উপায় না করতে পেরে একদিন বৃষ্টি মাথায় প্যান্ট গুটিয়ে নিজেই নেমে গেলাম পরিষ্কার করতে। নিতান্ত চক্ষুলজ্জায় সব ক্লিনার আর ওয়ার্ডবয় মিলে আমার সাথে বৃষ্টিতে ভিজে পরিষ্কার করল। বাকি ময়লা আমি নিজের পকেটের টাকায় শ্রমিক ধরে পরিষ্কার করলাম।

ওয়ার্ডে দুই বেলা swab, তিনবেলা ঝাড়ুর ব্যবস্থা করলাম। বেসরকারি হাসপাতালের মত জুতা বাইরে রাখার ব্যবস্থা করলাম। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম মানুষ কথা শুনে। যতবড় নেতা হোক জুতা খুলে ওয়ার্ডে ঢুকে। ওয়ার্ড পরিষ্কার চক চক করে। বাথরুমে আলাদা স্যান্ডেল দিলাম। বাথরুম ও ঝক ঝক করে। স্যান্ডেলগুলো আমার নিজের টাকায় কেনা। এগুলো করতে যেয়ে চতুর্থশ্রেনীর কর্মচারীরা আমার শত্রু হয়ে গেল। আগে কোন কাজ করা লাগত না। এখন তো করতে হয়। জাতীয় শোক দিবসের ভোজ সভার আগে তারা uhfpo স্যার কে বলল: উনি তো RMO না। উনার কথা শুনব না। উল্লেখ্য, আমাদের হাসপাতালে কোন RMO নাই দীর্ঘদিন ধরে। একজন চার্জে ছিলেন উনি মাসে চার দিন আসতেন। যিনি uhfpo, তিনিই RMO, তিনিই মেডিকেল অফিসার।

অন্যান্য মেডিকেল অফিসারেরা সপ্তাহে একদিন ডিউটি করে। কেউ কেউ মাসে একদিন। কেউ পাচ মাসে একদিন আসে। কোন ব্যাপার না। কেউ তো আর টাকা পয়সা এবং ব্যবসা নিয়ে প্রশ্ন তুলে না। শুধু শুধু আমি বোকার মত প্রশ্ন তুলেছিলাম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি ৩০ হাজার ডাক্তারও নিয়োগ দেন এবং সব উপজেলায় যদি uhfpo কাম rmo থাকেন, তাহলে এক পয়সার ও উপকার হবে না। কেননা কেউই উপজেলায় থাকবে না।

হাসপাতালের সরকারি ওষুধ, লুটের মালের মত যে সে নিয়ে যেত। ঐটা বন্ধ করে দিলাম। গরীব মানুষ যাতে ওষুধ পায় সে ব্যবস্থাও করলাম। বিনিময়ে আরো কয়েকজন অপছন্দ করা শুরু করল। পাত্তা দিলাম না। প্রতিটা নরম্যাল ডেলিভারি করে নার্সরা নেয় তিন হাজার টাকা। আমার গ্রামের এক ভ্যানওয়ালা আমার কাছে গিয়ে কেঁদে পড়ল। তার কাছে টাকা নেই। সরকারী হাসপাতাল, এক টাকাও নেয়ার নিয়ম নাই। প্রচন্ড রিএকশন দেখালাম এই ঘটনায়। পরে খোজ নিয়ে জানলাম উপর থেকে নিচ প্রায় সবাই এই টাকার ভাগ পায়। সবচেয়ে বড় ভাগটা পায় বড় জন যিনি তিনি। আরো অসংখ্য পুকুরচুরির সামনে বাধা হয়ে দাড়ালাম। তার ফলও পেয়ে গেছি।

আজ আমার বদলির অর্ডার এসেছে। আমার অজান্তে আমি দুর্নীতির প্রায় সকল সেক্টরে হাত দিয়ে ফেলেছি। আমার পোস্টিং হলে উপজেলায় প্রায় সবাই খুশি হয়েছিল। মিষ্টি আর ফুল দিয়ে আমজনতা আমাকে বরণ করে নিয়েছিল। প্যান্ট পরা কাল থেকে উপজেলার এই হাসপাতালকে আমি চিনি। দিনের চব্বিশটা ঘন্টা হাসপাতালে থাকতাম। uhfpo স্যার দীর্ঘদিন এই হাসপাতালে আছেন। আমি জয়েন করলে বানের জলের মত রুগী আসা শুরু করেছিল হাসপাতালে। সাড়ে তিন মাস না জেতেই বদলির অর্ডার আসলো।

স্রোতের সাথে মিশে গেলেই হতো, আমারো ভাগ থাকত একটা। কিন্তু পারিনি। ২০০৭ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর আমি যখন উপকুলের এই ক্ষুদ্র জেলে পল্লী থেকে ডাক্তারি পড়ার জন্য বেডিংপত্র নিয়ে ভ্যানে উঠব বলে বেরিয়েছিলাম, পিছনে তাকিয়ে দেখি কয়েকশ নারী পুরুষ আমাকে বিদায় দেয়ার জন্য দাড়িয়ে আছে। এদের কাছে আমার ঋন ছিল। পোস্টিং নিয়ে এখানে আসলে আমার চেয়েও খুশি হয়েছিল এই লোকগুলো। আমি পরাজিত। দেশপ্রেম, সততা, এগুলো নিয়ে অফিসার হতে নেই। আমি এতটাই বোকা যে সামান্য এই জিনিসটুকুও জানতাম না।  

আবদুর রবের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে   

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-