সিনেমা হলের গলি

বাংলাদেশের মেয়েতে মুগ্ধ কলকাতার সারেগামাপা

নাম তার অবন্তী। পুরো নাম অবন্তী দেব সিঁথি। জন্ম আর বেড়ে ওঠা ঢাকা থেকে অনেকটা দূরে, জামালপুরে। গান গাইবেন, শিল্পী হবেন, এমনটা একদম ছোটবেলায় ভাবনাতেই ছিল না। সেই অবন্তী গান গেয়ে জয় করেছেন মানুষের মন। শুধু তো কণ্ঠ দিয়ে নয়, গানের সঙ্গে ব্যতিক্রমী আয়োজন দিয়েও সবাইকে মুগ্ধ করেছেন তিনি। ক্লোজআপ-ওয়ান দিয়ে দেশের দর্শক মাতিয়েছিলেন অবন্তী, তারপর তার গান আর শিসের আওয়াজ, আর তার সঙ্গে নিজের উদ্ভাবিত ‘কাপ সং’ নিয়ে তিনি গিয়েছেন ভারতে, জি বাংলার ‘সারেগামাপা’ অনুষ্ঠানে অতিথি শিল্পী হিসেবে পারফর্ম করে তিনি মুগ্ধ করেছেন সেই প্রতিযোগিতার বিচারক-উপস্থাপক-দর্শক সবাইকে। অবন্তীর সেই পারফরম্যান্সের ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ভাইরাল। 

জি বাংলায় অনুষ্ঠানটি প্রচারের পর থেকেই প্রশংসায় ভাসছেন অবন্তী। ফেসবুকে তার পারফরম্যান্সের ভিডিও ক্লিপটি ভাইরাল হয়েছে ইতিমধ্যেই। লক্ষ লক্ষ মানুষ দেখেছে সেই ভিডিওটি। অনেকেই সেই ভিডিও দেখে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন, অবন্তীর মতো প্রতিভাকে কেন আমরা ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছি না, এটা ভেবে। 

অবন্তী দেব সিঁথি, জি বাংলা, সারেগামাপা, ক্লোজআপ ওয়ান তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ, কাপ সং, শিস

সারেগামাপা-র এই এপিসোডে কিশোর কুমারের ‘আকাশ কেন ডাকে’ গানটি পরিবেশন করেছিলেন অবন্তী। গানের সঙ্গে দু’টি কাপের তালে ও শিস বাজিয়ে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিলেন তিনি। অনুষ্ঠানে বিচারকের দায়িত্বে ছিলেন শ্রীকান্ত আচার্য, শান্তনু মৈত্র, কৌশিকী চক্রবর্তী, মোনালী ঠাকুর ও পণ্ডিত তন্ময় বোস। তারা সবাই অবন্তীর পারফরম্যান্সের পর দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়েছেন, শান্তনু মৈত্র্য তো আসন ছেড়ে স্টেজে উঠে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছেন অবন্তীকে।

এই অনুষ্ঠানে তাকে ‘শিস প্রিয়া’ উপাধি দেয়া হয়েছে, শিসের প্রতি ভালোলাগার শুরুর গল্পটাও অনুষ্ঠানে বলেছেন অবন্তী, স্কুলে পড়ার সময়ই শিসের আওয়াজ শুনতে ভালো লাগতো। অনেকবার নাকি ছেলেদের দিকে তাকিয়েও শিস বাজিয়েছেন তিনি! তবে মেয়েদের শিস বাজানোটা যে অন্যরকম বিষয়, সেটা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ক্লোজআপ ওয়ানের মঞ্চে এসে। 

অবন্তী দেব সিঁথি, জি বাংলা, সারেগামাপা, ক্লোজআপ ওয়ান তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ, কাপ সং, শিস

অবন্তীকে এই সময়ের শ্রোতারা বিশেষভাবে চেনেন তার ‘কাপ সং’- এর জন্যেই। কুমার বিশ্বজিতের ‘যেখানেই সীমান্ত তোমার’ গানটির কভার অবন্তী করেছিলেন নিজের মতো করে, বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন কাপ, ফয়েল পেপার আর পয়সা। সেই গানটা শ্রোতারা লুফে নিয়েছিল। ফেসবুকে আপলোড দেয়া সেই ভিডিওর নিচে কমেন্টে ভরে গিয়েছিল তখন। মূলত ইউটিউবের একটা গানের সঙ্গীতায়োজন দেখেই এই আইডিয়াটা মাথায় এসেছিল তার। 

গানের প্রতি জামালপুরের মেয়ে অবন্তী ভালোবাসা জন্মেছিল ছোটবেলাতেই। বড় বোন গান শিখতেন, ছোট্ট অবন্তী পাশে বসে থাকতেন তখন। পরে ওস্তাদের উৎসাহে নিজেও গানের তালিম নিতে শুরু করেন। তবে গানটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা হয়ে যাবে একদিন, তখনও সেটা ভাবেননি তিনি, পরিবারের কারো মাথাতেও সেটা ছিল না হয়তো। গানের জন্যে অসংখ্য পুরস্কারও পেয়েছেন। ২০০৬ সালে ক্লোজআপ ওয়ান তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ প্রতিযোগীতায় নাম লিখিয়েছিলেন, তবে বেশিদূর যেতে পারেননি। 

অবন্তী দেব সিঁথি, জি বাংলা, সারেগামাপা, ক্লোজআপ ওয়ান তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ, কাপ সং, শিস

২০১২ সালে আবারও একই মঞ্চে ফিরেছিলেন অবন্তী, ক্লোজআপ ওয়ানের সেই আসরে সেরা দশ প্রতিযোগীর একজন ছিলেন তিনি। সেই প্রতিযোগিতাতেই ‘হুইসেল কুইন’ খেতাব পেয়েছিলেন অবন্তী। মুখ দিয়ে নানা রকমের শব্দ করতে পারেন তিনি, সেটারই কিছু ঝলক সেই আসরে দেখিয়েছিলেন তিনি। আইয়ুব বাচ্চুর ‘সেই তুমি’ গানের সাথে নিজস্ব ধাঁচে তার দারুণ সঙ্গীতায়োজন মন কেড়ে নিয়েছিল বিচারকদের। পার্থ বড়ুয়া তো তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছিলেন। 

ক্লোজআপ ওয়ান দিয়ে খানিকটা পরচিতি পেয়েছিলেন। এরপরে দুটি সিনেমায় তিনি প্লেব্যাকও করেছেন। এরপরেই এলো এখন পর্যন্ত অবন্তীর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অর্জন- কাপ সং। সেই কাপ সং-এর শুরুর গল্পটা কি ছিল? চলুন, শোনা যাক অবন্তীর মুখেই। 

“আমি কখনো ভাবিনি কাপ সং আমাকে রাতারাতি জনপ্রিয় করে দেবে। দুই তিন-ঘণ্টার ব্যবধানে হাজার হাজার দর্শক মিলবে। খুলেই বলি, মাস কয়েক আগের ঘটনা। ইউটিউবে দুটি বিদেশি মেয়ের কাপ সং পারফর্ম দেখে ভালো লাগে আমার। এরপর ইউটিউব ঘেঁটে কাপ সংয়ের ওপর কিছু টিউটোরিয়াল দেখে নিই। পরে নিজে নিজেই চেষ্টা করি। কয়েকটি গান ট্রাই করার পর ভাবলাম যে এবার নিজের কিছু গান ভিডিও করে ইউটিউবে ছাড়লে কেমন হয়! নিজের ইউটিউব চ্যানেলে নিজের গান পোস্ট করার মজাই আলাদা।”

অবন্তী দেব সিঁথি, জি বাংলা, সারেগামাপা, ক্লোজআপ ওয়ান তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ, কাপ সং, শিস

“এরই মধ্যে একদিন বাসার সবাই চলে গেছে গ্রামের বাড়ি। একা বাড়িতে বসে ভিডিও করে ফেললাম ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ গানটি। তখন সন্ধ্যা। গানটি আপলোড করে ফেসবুকে শেয়ার দিয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। ঘণ্টা দুয়েক পরে ফেসবুকে ঢুকে দেখি প্রচুর নোটিফিকেশন। আমি তো দেখে অবাক। সাধারণত এত লাইক এত কমেন্ট কখনো আমি পাইনি। ফেসবুকে ঢুকে দেখি প্রায় ২০ হাজার ভিউয়ার্স। এরপর অন্য আরেকটি পেজে দেখলাম আমার এই গানটি। সেখানে প্রায় ৫ লাখ ভিউয়ার্স। আমি, তো তাজ্জব।” 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করা অবন্তী গত বছরের জানুয়ারীতেও অংশ নিয়েছিলেন সারেগামাপা’র একটা পর্বে। ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যাওয়া তার কাপ সং গুলো দেখেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন সারেগামাপা অনুষ্ঠানের প্রশিক্ষক রথিজিত ভট্টাচার্য। প্রথমে খানিকটা নার্ভাস থাকলেও, পরে ওই বাংলার এই প্রতিযোগীতায় অতিথি প্রতিযোগী হিসেবে অংশগ্রহণে রাজী হয়েছিলেন অবন্তী। তার পারফরম্যান্সে সেবারের বিচারক কুমার শানু খুব প্রশংসা করেছিলেন। 

অবন্তী দেব সিঁথি, জি বাংলা, সারেগামাপা, ক্লোজআপ ওয়ান তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ, কাপ সং, শিস

২০১২ সালে ক্লোজআপ ওয়ানের শীর্ষ দশ প্রতিযোগীর একজন হয়েছিলেন অবন্তী। এরপরে অর্ধযুগ কেটে গেছে, আমাদের রুগ্ন এই সঙ্গীত জগত অবন্তীর মতো প্রতিভাকে ব্যবহার করতেই পারেনি সেভাবে। দুইটা সিনেমাতে প্লেব্যাক করা ছাড়া আর কোথাও দেখা যায়নি তাকে, কোন অ্যালবামও রিলিজ পায়নি তার। অবন্তী নিজেই বলেছেন, গত ছয় বছরে তার অর্জন প্রায় শূন্য।

জি বাংলার সারেগামাপা অনুষ্ঠানে অবন্তীর অংশগ্রহণের এই ভিডিওটা ভাইরাল হওয়ার পরে অবন্তীর পরিচিতি আরও একটু বেড়েছে, সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, কেন আমরা নিজেদের প্রতিভাগুলোকে ঠিকঠাক ব্যবহার করতে পারছি না? যারা প্রশ্নটা তুলেছেন, তাদের অনেকেই হয়তো জানেন না, ক্লোজআপ ওয়ানের পর থেকে পথচলার এই সময়টায় যেটুকু দূরত্ব অবন্তী পেরিয়ে এসেছেন, সবটাই নিজের চেষ্টায়, একক কৃতিত্বে। সেজন্যেই পড়াশোনা শেষ করে একটা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতে করতে একটা ‘ভালো চাকুরী’ খোঁজার কথা ভাবতে হয় অবন্তীকে, কারণ আমাদের দেশে সঙ্গীতে পৃষ্ঠপোষকতার ভীষণ অভাব। এখানে গান-বাজনাকে শখ হিসেবে নেয়া যায়, পেশা হিসেবে নয়। নিলে না খেয়ে থাকা ছাড়া যে উপায় নেই! অবন্তী সেটা বুঝে গিয়েছেন গত ছয় বছরে। এভাবেই আমাদের দেশে প্রতিভারা অবহেলিত হয়, অবমূল্যায়ন করা হয় তাদের মেধা আর প্রচেষ্টাটাকে।

আরও পড়ুন-

Comments

Tags

Related Articles