তাকে ধরা হয় বলিউডের গেমচেঞ্জার হিসেবে। ভারতের বক্স অফিসের হর্তাকর্তারা তার ওপর খানিকটা বিরক্ত হলেও হতে পারেন। তার সিনেমা এলেই তো রেকর্ডের ছড়াছড়ি শুরু হয়ে যায়। আগের সব রেকর্ড ধুয়েমুছে ফেলে নতুন রেকর্ডের জন্ম দেন তিনি, নিজের কীর্তি নিজেই ভাঙেন, সাফল্যের কিলিমানজারো ডিঙিয়ে এভারেস্টে রাখেন নিজের পায়ের ছাপ। তিনি যেখানে দাঁড়িয়ে থাকেন, সেখানে যাওয়াটা বাকীদের জন্যে হয়তো স্বপ্নের মতো। তিনি মিস্টার পারফেকশনিস্ট- আমির খান।

বাবা-চাচারা প্রযোজক ছিলেন, সিনেমার সঙ্গে পারিবারিকভাবেই একটা যোগাযোগ ছিল। কিন্ত বাবার ইচ্ছে ছিল না ছেলে সিনেমায় আসুক। ছেলে পড়ালেখা করে বিদেশ যাবে, সেখানেই হয়তো স্থায়ী হয়ে যাবে, এমন কিছুই ইচ্ছে ছিল বাবার। কিন্ত ছেলের রক্তে তো সিনেমা জিনিসটা মিশে আছে, শিরায় শিরায় ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছে ফিল্মের নেশা, সেটা বাবা বুঝতে পারেননি। চাচা নাসির হুসেনের ‘ইয়াদো কি বারাত’ সিনেমায় চাইল্ড আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করেছিলেন, যখন তার বয়স মাত্র আট বছর। সেই সিনেমার নায়ক ছিলেন ধর্মেন্দ্র, নায়িকা জিনাত আমান। সিনেমায় হাতেখড়িটা তখনই, সেই ১৯৭৩ সালে। একই বছরে বাবার প্রোডাকশন থেকে মাদহোশ নামে একটা সিনেমাতেও অভিনয় করেছিলেন ছোট্ট আমির।

যৌবনে পা দেয়ার ঠিক আগে কেতন মেহতার একটা এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্মে অভিনয় করেছিলেন, তারও আগে এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে নিজেই বানিয়ে ফেলেছিলেন একটা সাইলেন্ট এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম, মান ছিল ‘প্যারানয়া’। থিয়েটার করছিলেন, টানা দুই বছর থিয়েটারের ব্যাকস্টেজে কাজ করার অভিজ্ঞতা তখন তার সঙ্গী। বাবা-মা রাজী ছিলেন না ছেলেকে অভিনয়ের জগতটায় আসতে দিতে। কিন্ত আমিরের মাথায় তখন ফিল্মের পোকা ঢুকে গেছে, সেই পোকা নামানোর ওঝা তো নেই।

এর দুই বছর বাদে মনসুর খান নামের একজন পরিচালক এলেন তার কাছে। সেই এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম ‘হোলি’তে আমিরকে দেখে খুব পছন্দ হয়েছে তার, এরকম একটা কিউট লুকের ছেলেকেই তার দরকার। মনসুরের সেটা অভিষেক সিনেমা, এর আগে ছবি পরিচালনা করেননি তিনি। নায়িকা হিসেবে নেয়া হলো জুহি চাওলাকে, বলিউডে এর আগে মেজর কোন রোলে অভিনয় করেননি তিনিও। তিন তরুণ-তরুণীর যাত্রা শুরু হলো একসঙ্গে। সিনেমার নাম ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’, শেক্সপিয়রের রোমিও জুলিয়েট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বিয়োগাত্নক প্রেমের গল্পে লেখা হলো স্ক্রিপ্ট।

আমির খান, বলিউড, মিস্টার পারফেকশনিস্ট

বাকীটুকু ইতিহাস। নতুন নায়ক, আনকোরা নায়িকা, পরিচালকের প্রথম সিনেমা- সেটাই মন জয় করে নিলো ভারতের তরুণ তরুণীদের। ব্লকবাস্টার দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করলেন আমির খান। রাতারাতি পরিণত হলেন ভারতের তরুণীদের প্রিয় নায়কে। সিলভার স্ক্রীনে আমির-জুহির রোমান্সটা লুফে নিয়েছিল দর্শক। সেবছরের ফিল্মফেয়ারের আসরেও কেয়ামত সে কেয়ামত তকের জয় জয়কার, নবীন অভিনেতা-অভিনেত্রী, সেরা পরিচালক, সেরা সিনেমাসহ আটতা পুরস্কার ঘরে তুললো সিনেমাটা। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারেও সেবছর স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড পেলেন আমির, অভিষেক সিনেমা দিয়েই এতটা অর্জন এর আগে আর কারো ছিল না।

বত্রিশ বছরের ক্যারিয়ার তার, অথচ লিড রোলে অভিনীত সিনেমার সংখ্যা মেরেকেটে চল্লিশটার বেশী নয়। একটা সিনেমায় অভিনয়ের ব্যাপারটা চূড়ান্ত করার আগে আমির যতোটা ভাবেন, বলিউডের আর কেউ মনে হয় না এতখানি চিন্তাভাবনা করেন। গল্প-চরিত্র-সহ অভিনেতা-অভিনেত্রী সবকিছু পছন্দ হলেও দীর্ঘসময় তিনি শুধু পরিচালকে স্টাডি করেন, বোঝার চেষ্টা করেন, যে গল্পটা তাকে শোনানো হয়েছে, সেটা এই লোক ঠিকঠাক করতে পারবেন কিনা। শুধু শুধু তো তাকে ‘মিস্টার পারফেকশনিস্ট’ টাকা হয় না!

ক্যারিয়ারে যেসব সিনেমা করেছেন সেগুলোর বেশীরভাগই ব্যবসাসফল। কিন্ত ‘গজনী’ থেকে যা শুরু করেছেন, সেটা ‘অমানুষিক’ বললেই বোধহয় বেশী মানানসই হয়। বলিউডের প্রথম একশো কোটি রূপি(শুধু ভারতের বক্স অফিস থেকে) আয় করা সিনেমা ছিল গজিনী। ২০০৯ এ থ্রি ইডিয়টস নিয়ে এলেন, আগের রেকর্ড ভেঙ্গেচুরে দুইশো কোটির ক্লাবে গেল সেটা। মাঝে তালাশ সেভাবে ব্যবসাসফল হতে পারেনি, এরপর ধুম থ্রি ভারত থেকে আয় করলো প্রায় তিনশো কোটি রুপী। এরপর রাজকুমার হীরানীর সঙ্গে আবার এলেন ‘পিকে’ সিনেমায়। অদের দুজনের জুটি হবে, আর আগের রেকর্ড মাটিতে লুটোপুটি খাবে না, তা কি করে হয়? ভারতে তিনশো কোটি রূপি আয় করা সিনেমা হলো পিকে। আর সবশেষ দাঙ্গাল দিয়ে তো পুরোপুরি মাতিয়ে দিলেন ভারতকে। দাঙ্গালের ডমেস্টিক কালেকশনই পাঁচশো কোটি রূপির বেশী! বিশ্বজুড়ে এই সিনেমাটার আয় ছাড়িয়ে গেছে দুই হাজার কোটির অবিশ্বাস্য অঙ্কটাকেও! বক্স অফিসের অবিসংবাদিত রাজা তো আমির খানই!

ভারতের বাইরে শাহরুখ খান ছাড়া বলিউড সুপারস্টারদের খুব বেশী জনপ্রিয়তা নেই। সেই ধারাটাও ভেঙেছেন আমির। চিনের সিনেমাভক্তরা আমির খান বলতে অজ্ঞান। ভারতের প্রতিবেশী সেই দেশটাতে তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা তার। দাঙ্গাল আর পিকে সিনেমা দুটো সেখানে দারুণ ব্যবসা করেছে, এমনকি চীনের বাজারে হলিউডের সিনেমাগুলোকেও আয়ের অঙ্কে পেছনে ফেলেছে দাঙ্গাল!

আমির খান, বলিউড, মিস্টার পারফেকশনিস্ট

নিজেকে কখনও নির্দিষ্ট ঘরানায় বেঁধে রাখতে চাননি আমির। অভিষেকের পরে টানা কয়েকটা সিনেমা ব্যবসাসফল না হওয়ার পরেই সিনেমা বাছাইয়ের বেলায় ভীষণ সতর্ক হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এজন্যেই রোমান্টিক-অ্যাকশন বা অন্যকিছুতে নিয়মিত হননি কখনও। সব ধরণের চরিত্রে অভিনয়ের চ্যালেঞ্জটা নিয়েছেন সবসময়, সেটা লগানের ভূবন হোক, দিল চাহতা হ্যায় এর আকাশ হোক, কিংবা রাজা হিন্দুস্তানীর রাজা- প্রতিটা চরিত্রে আলাদা কিছু করার চেষ্টা করেছেন। থ্রি ইডিয়টসে বাইশ-তেইশ বছর বয়সী কলেজ ছাত্রের চরিত্রে তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই, মানুষটার বয়সের ঘড়ি তখন মধ্যচল্লিশে! কিংবা দাঙ্গালে তাকে দেখে কেউ বলতে পারবে, গীতা-ববিতাদের বয়সী মেয়েদের বাবা তিনি নন? দাঙ্গালে অভিনয়ের জন্যে নিজের শরীরটা ইচ্ছেমতো গড়াপেটা করেছিলেন ইউটিউবে সেই ভিডিওগুলো দেখেও বিশ্বাস হতে চায় না কেন যেন!

অনুরোধে ঢেঁকি গেলার কাজটা তাকে দিয়ে করানো যায় না। ফিল্মের প্রমোশনের জন্যে ‘সস্তা’ হতে তার ভীষণ আপত্তি। নিজেকে সবসময় খানিকটা আড়ালেই রাখতে পছন্দ করেন। পরিচালকদের কাজে হস্তক্ষেপ করেন তিনি- এমন একটা অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে, কিন্ত লগানের পরিচালক আশুতোষ গোয়াড়িকর সেই কথাটা উড়িয়ে দিয়েছেন। তার ভাষায়- আমির সাজেশান দেয়, কোনকিছু চাপিয়ে দেয় না। আমিরের ভাষায়- “পরিচালককে পছন্দ হলে আমি তার কাছে আত্মসমর্পণ করি, তিনি যদি অভিনয়ের খাতিরে আমাকে উঁচু বিল্ডিং থেকে লাফ দিতে বলেন, আর আমার মনে হয় যে লাফ দেয়াটা আসলেই দরকার; সেটা করতে আমি দ্বিধা করবো না।”

প্রযোজনা করেছেন, পরিচালনা করেছেন, লিখেছেন সিনেমার স্ক্রীপ্টও। সার্থক অলরাউন্ডার তিনি। নিজের অভিনেতা পরিচয়টা তাকে যতোটা তৃপ্ত করে, তারচেয়ে বেশী তৃপ্তি পান ‘অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টর’ পরিচয়টা শুনলে, কারণ সেটা দিয়েই শুরুটা হয়েছিল তার। স্বভাবে তিনি দারুণ বিনয়ী, কিন্ত জায়গামতো উচিত কথাটা বলতে একটুও দ্বিধা করেন না তিনি। এবছর অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে নিয়ে আসছেন ‘থাগস অফ হিন্দুস্তান’ বক্স অফিসে আরও একবার ঝড় উঠবে সেটা নিশ্চিত। মহাভারতকে ন্রূপালী পর্দায় নিয়ে আসবেন বলেও গুজব শোনা যাচ্ছে জোরেশোরে।

১৯৬৫ সালের আজকের দিনে মুম্বাইতে জন্ম নিয়েছিলেন আমির হুসেন খান। মেঘে মেঘে বেলা তো কম হলো না, ৫৩ বছর হয়ে গেল বয়স। যদিও বয়স শব্দটা আমিরের কাছে পাত্তা পায়নি কখনোই। পাবেও না হয়তো। সেরা অভিনেতা হিসেবে তিনটে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার তার নামের পাশে, অথচ কোন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে কখনোই হাজিরা দেননা তিনি। হয়তো বাকী জীবনেও আর কখনও যাবেন না। সেটার দরকারও নেই। সিলভার স্ক্রীনে তার পারফরম্যান্সই যথেষ্ট আমাদের জন্যে, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে নৃত্যরত আমির খানকে তো আমরা চাই না।

Comments
Spread the love