শীতের সকাল। আমি কোচিংয়ে গিয়ে বসে আছি। এতো ভোরে কেউ আসে না। আমি আসি। ক্লাসের পিছনে যে জানালাটা আছে সেখানে বসে কুয়াশা দেখি। জানালার উপরের অর্ধেক সাদা কুয়াশা আর নিচের অর্ধেক শ্যাওলা পড়া দেওয়াল। কি অদ্ভুত। মনে হয় কেউ ক্যানভাসে আনমনে রং করে রেখেছে। আমার সাথে নীলার সম্পর্কটাও ওই সাদা কুয়াশা আর শ্যাওলা পড়া দেওয়ালের মত। ভুল করে সাদা কুয়াশা কিছুক্ষণের জন্য নিচে নেমে এসেছে, এসেই আরেকটা ভুল করে ওই শ্যাওলা পড়া দেওয়ালের সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলেছে। কিন্তু সাদা কুয়াশা বুঝতে পারেনি, শ্যাওলা পড়া দেওয়াল তার প্রেমে পড়ে গেছে। প্রেমে পড়ে বন্ধী হয়ে গেছে কোনো আলাভোলা শিল্পীর ক্যানভাসে।

নীলা কখন যে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি। টের পাইনি কথাটা বলা ভুল হলো। টের পেয়েছি। প্রতিদিন ভোরে গোসলের পরে মেয়েটার শরীর থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ বের হয়। সেই গন্ধ কিছুক্ষণের জন্য থাকে। আমার কপালটা খুব ভালো। আমি সেই গন্ধ প্রতিদিন পাই। এখনো পাচ্ছি। ক্যানভাসের দিকে তাকিয়ে সেই মিষ্টি গন্ধে মাতাল হয়ে আছি। জানি নীলা নিজে থেকেই ডাক দিবে। ডাকুক। তখন তাকানো যাবে। আচ্ছা নীলাও কি আমার মত ক্যানভাসের দিকে তাকিয়ে আছে? নাকি আমার দিকে তাকিয়ে আছে?

নীলা তার অদ্ভুত মিষ্টি গলায় বলল, “কি ভাবতেছো আবীর?” আমি তখনো ক্যানভাসের দিকে তাকিয়ে আছি। আর বলছি, “ভাবছি, সাদা কুয়াশার ভুলের মাশুল শ্যাওলা পড়া দেওয়ালের দিতে হবে।” নীলা একটু হেসে বলল, “কেন? কুয়াশা আবার কি ভুল করলো?” আমি নীলার দিকে ঘুরে বসলাম। সাথে সাথেই হতভম্ব হয়ে গেলাম। ভেজা চুলে কি পৃথিবীর সমস্ত রমনীকে এতো ভালো লাগে? আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সমস্ত রমণীর আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে এই ভেজা চুলে।

আমি বললাম, “তোমাকে কতদিন বলেছি যে এই ভোর বেলায় গোসল করবে না। তারপরেও করো। কথা শোনো না। অন্তত শীত কালে তো বাদ দিতে পারো?” নীলা হেসে বলল, “আমার ভোর বেলা গোসল করতে না পারলে ভাল লাগে না। শরীরের মধ্যে কুটকুট করে।” বলেই হাসিহাসি মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

তোমার ভাগ্য ভাল, তোমার অন্যায়ের জন্য কোনো শাস্তি বরাদ্দ নেই।

– আমি আবার কি অন্যায় করলাম?

এই যে প্রতিদিন ভোরে আমাকে একবার করে খুন করো।

– হিহিহি। তুমি পাগল হয়ে গেছো।

এরকম সাধারণ কথা আর কত বলবা? ধারালো কিছু বলো। বুকে বাঁধুক।

– দেখি তোমার হাতটা দাও।

এই কথা শোনার পরে সত্যি সত্যি বুকের মধ্যে কি যেন একটা বাঁধল। আমি খুশি খুশি হাত বাড়িয়ে দিলাম। বুক ধড়ফড় করছে। আমি ওর সামনে হাত মেলে ধরলে, আমার হাতের নিচে ও ওর হাত রাখলো। রেখেই হেসে দিলো। বলল, “তোমার হাত আমার থেকে কত্ত ছোট। বিশেষ করে আঙ্গুলগুলো পিচ্চিপিচ্চি টাইপ।” বলেই আবার হাসতে লাগলো, কিন্তু হাত সরালো না। আমি তাকিয়ে আছি ওর হাতের দিকে। ওর হাতটা বেশ বড়। আঙ্গুলগুলোও বেশ বড়। অদ্ভুত রকম সুন্দরমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়। বিহারীরা এমন হয়। ওদের হাত পা একটু বড়বড় হয়। কিন্তু ভালো লাগে। ওর হাতের উপর আমার হাত বড্ড বেমানান লাগলো। আমিই হাত সরিয়ে নিলাম। বললাম,”তোমাকে, ধারালো কথা বলতে বলেছি বলে, এতোটা ধারালো তো বলতে বলিনি।”

নীলা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এই তাকানোর অনেক অর্থ আছে। হতে পারে, সে আমাকে তার কাছে ডাকছে। হতে পারে, সে আমাকে তার থেকে অনেক দূরে থাকতে বলছে। আবার এটাও হতে পারে, “আমি তোমাকে মাত্রই বুঝিয়ে দিয়েছি, আমি কি বলতে চাই।” নীলা অদ্ভুতভাবে তার চুলগুলো ঠিক করতে করতে বলল, “আবীর, আমি আজকে একটা কথা বলার জন্য এখানে এসেছি। আমি জানি, তুমি আমাকে ভালোবাসো। আমারও তোমাকে অনেক ভালো লাগে। কিন্তু, এটা সম্ভব না। আমার তোমার সাথে সময় কাটাতে ভালো লাগে। কিন্তু, এটাই সব না। এর পিছনেও অনেক কথা আছে।” আমি বললাম, “আমার হাতের মত, আমিও অনেক ছোট। আমাকে তোমার কিছু বোঝাতে হবে নাআমি বুঝবো না। বুঝতে চাইও না।”

নীলা মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকিয়ে একটা হাঁসি দেয়। ভয়ংকর ভালো লাগে। ভয়ংকর সুন্দর লাগে নীলাকে তখন। এই হাসির নাম জানা নেই। তবে এই হাঁসি শুধু বিশেষ একজনের দিকেই তাকিয়ে দেওয়া যায়। নীলা অন্য কারো দিকে তাকিয়ে এই হাঁসি দেয় বলে আমার মনে হয় না। আমার কথা বলা শেষ হতে না হতেই নীলা আচমকা সেই হাঁসিটা দিলো। আমি তাকিয়ে রইলাম। নীলার হাঁসি হাঁসি মুখ হঠাৎ মলিন হয়ে গেলো। সে বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাড়াতে দাড়াতে বেশ শক্ত গলায় বলল, “আমি তোমাকে কখনই ভালোবাসিনি, ভালোবাসি না, ভালবাসবোও না।” কথাটা শেষ করেই সে ক্লাস রুম থেকে বের হয়ে গেলো। মনের মধ্যে কোথাও ছোট একটা ধাক্কা লাগলো। নীলার চলে যাওয়া দেখতে দেখতে ভাবলাম, “ইস, ভয়ংকর হাসিটা বোধহয় আর দেখা হবে না।

বহু বছর হয়ে গেছে। সেই কোচিং সেন্টার এখন আর নেই। নেই সেই শ্যাওলা পড়া দেওয়াল। কিন্তু সেই ক্লাসরুম আছে। সেই বেঞ্চগুলো আছে। নীলা যে বেঞ্চে বসতো, সেখানে প্রথমদিন কলম দিয়ে লিখে রেখেছিল “আমি কে” আমি অজস্র কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম লেখাটার দিকে। ও দাড়ি কমা দিতে বড্ড ভুল করে। সেদিন বুঝিনি। পরে বুঝেছিলাম। আমি তখন কলম দিয়ে “আমি কে” লেখার পাশে প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে রেখেছিলাম। শুধু উত্তর করতে পারিনি। এখনো পারছি না। খুঁজে বেড়াচ্ছি। আচ্ছা, ও যাকে বিয়ে করেছে তার হাত কি আমার হাতের থেকে বড়? ওর মত? কিংবা সে কি কবিতা লেখে? শত শত?

খুব জানতে ইচ্ছে করে, এখনো ভোরে গোসল করে বের হলে তার শরীর থেকে মিষ্টি গন্ধ বের হয় কিনা। জানতে ইচ্ছে করে, ভেজা চুলে এখনো তাকে পৃথিবীর সব থেকে রূপবতী রমণী লাগে কিনা। কিংবা খুব জানতে ইচ্ছে করে, সেদিন যে সে মিথ্যা কথাটা বলেছিল, তার জন্য এখনো সে অনুশোচনা করে কিনা।

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো