অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

ঘুরে আসুন ছবির মতো সুন্দর এই হ্রদগুলো!

ক্রিস্টাল বা স্ফটিক এবং কাঁচ দিয়ে তৈরি যে কোন কিছু দেখতেই ভালো লাগে। কাঁচ বা স্ফটিকের বিপরীতে যা কিছু থাকে সবকিছুই সেগুলোর মধ্যে প্রতিফলিত হয়। নিজের প্রতিচ্ছবিও আমরা এগুলোর মধ্যেই দেখতে পাই। পরিষ্কার-উজ্জ্বল-দ্বীপ্তিময় কাঁচ বা ক্রিস্টালে আলো পড়লে, সে আলো পৃথিবীর সব রং নিয়ে প্রতিফলিত হয়। যা মানুষের মনকে বিমোহিত করে। পৃথিবীতে এই কাঁচ বা ক্রিস্টালের মত কিছু প্রাকৃতিক বিস্ময় রয়েছে, যার মধ্যে প্রকৃতির রঙ, রুপ প্রতিফলিত হয়ে এক কাল্পনিক মোহময় জগতের আবেশ তৈরি করে। এমন কিছু প্রাকৃতিক বিস্ময় সম্পর্কে আজ জানবো আপনাদের।  

৯। মিরর লেক বা আয়না হ্রদ (Mirror Lakes)

স্থির আর স্বচ্ছ পানির আধার, ঝলমলে লেক, মিরর লেক। মিরর বা আয়নায় যেমন সব কিছুর প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে, এই লেকের পানিতেও তেমনি আশেপাশের পাহাড়, গাছপালা, পাখ-পাখালি, আকাশ, মেঘ সবকিছুর প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। একারণেই এ লেকের নাম মিরর লেক।

স্বচ্ছ জলের লেক, পৃথিবী

কিন্তু কোথায় এই লেক? শুনে অবাক হবেন, এই নামের এবং রুপের লেক কিন্তু পৃথিবীতে একটা নয়, অনেকগুলোই রয়েছে। এবং সেই সবগুলো লেকেরই বৈশিষ্ট্য একই রকম, আয়নার মত স্বচ্ছ আর স্থির, যাতে সবকিছুর প্রতিবিম্ব ভেসে ওঠে। আমেরিকা ও নিউজিল্যান্ডেই তো এমন লেক রয়েছে বেশ কয়েকটি করে। আর্জেন্টিনাতেও রয়েছে একটা। সবগুলো মিরর লেকই এমন সব জায়গায় অবস্থিত যেখানের বায়ুপ্রবাহের গতি খুব ধীর এবং মানুষের আনাগোনা খুবই কম।

৮। ফাইভ ফ্লাওয়ার লেক বা পঞ্চ ফুলের হ্রদ (Five-Flower Lake, China)

স্বচ্ছ জলের লেক, পৃথিবী

চীনের সিচুয়ান প্রদেশে রয়েছে য়ুহুয়া বা ফাইভ ফ্লাওয়ার লেক নামের একটি লেক, যেটাকে সে এলাকার গর্ব বলা হয়। হ্রদটির পানিতে রয়েছে ক্যালসিয়াম কার্বনেট এবং হাইড্রোফাইসের উপস্থিতি, যার কারণে হ্রদের পানিতে বিভিন্নরকম রঙের সমাবেশ দেখা যায়। হ্রদের পানির নীচে গাছের পুরাতন সব ডালপালা ভেঙে পড়ে বিচিত্র সব রেখার সৃষ্টি করেছে। সেই ডালপালায় সবুজ রঙের নানা ধরণের শেড স্বচ্ছ পানির উপর থেকে অদ্ভূত সুন্দর দেখায়। পানির রঙের আকাশী নীল, কালচে সবুজ, হালকা হলুদ বিভিন্ন রঙ নিচের ডালপালার রঙের সাথে মিশে নৈসর্গিক এক সৌন্দর্যের জন্ম দেয়। হ্রদের চারপাশে ঘিরে রয়েছে নানা রঙের গাছপালা, লতাপাতা আর ফুল যেগুলো প্রতিফলিত হয় লেকের স্বচ্ছ পানির ভেতর। সবমিলিয়ে অপার্থিব এক সৌন্দর্য, যা অন্য কোন ভুবনের বলে ভ্রমের সৃষ্টি করে এর দর্শনার্থীদের মনে। 

৭। কেভ অব ক্রিস্ট্যাল বা স্ফটিকের গুহা (Cave of the Crystals, Mexico)

পৃথিবীতে এমন অনেক গুহার অস্তিত্ব আছে যেগুলোর নাম শুনলে বোঝা যায় সেগুলো স্ফটিক স্বচ্ছ। তবে, মেক্সিকোর নায়কাতে অবস্থিত ‘দ্য জায়ান্ট ক্রিসটাল কেভ’ বা স্ফটিকের গুহা সেসব গুহা থেকে কিছুটা আলাদা। এ গুহায় রয়েছে কাঁচ এবং স্ফটিক দ্বারা সৃষ্ট বিভিন্ন আকৃতির এবং প্রকৃতির বস্তুর সমাহার। স্ফটিক এবং কাঁচে পরিপূর্ণ এ গুহায় অন্যরকম এক সৌন্দর্য প্রতিফলিত হয়।

স্বচ্ছ জলের লেক, পৃথিবী

তবে, গুহার ভেতরের প্রচন্ড উত্তাপের কারণে কোন মানুষের পক্ষেই এর ভেতরে দশ মিনিটের চেয়ে বেশি সময় থাকা প্রায় অসম্ভব। একারণে এ গুহার বেশিরভাগ অংশতেই এখনো কারো পা পড়েনি। কাঁচ এবং স্ফটিকের সৃষ্ট বস্তুগুলো মেঝে থেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে উপরের দিকে উঠেছে। সময়ের সাথে এসব স্ফটিক বা ক্রিস্টাল ক্ষয়ে যাচ্ছে গুহার মধ্যে তাপ কমে যাওয়া এবং বায়ূ প্রবাহের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণে।

৬। লেক হিউরন বা হিউরন হ্রদ (Lake Huron, North America)

স্বচ্ছ জলের লেক, পৃথিবী

উত্তর আমেরিকার পাঁচটি গ্রেট লেকের মধ্যে লেক হিউরন একটি। কানাডা এবং উত্তর আমেরিকার সীমানায় এ লেকের অবস্থান। বরফযুগের শেষ দিকে যখন মহাদেশীয় হিমবাহ গলতে শুরু করে, তখন বরফগলা পানিতে এ লেকের সৃষ্টি হয়। সতের শতকের পর থেকে হাজার হাজার জাহাজ উত্তর আমেরিকার এই লেক হিউরনে ডুবে গেছে। লেক হিউরনের স্বচ্ছ পানির নীচে আজও অনেক জাহাজের ভাঙা অংশ চোখে পড়ে। এই লেকের পানিও কাঁচের মতই স্বচ্ছ বলে পানির নীচে সবকিছুই পরিষ্কার চোখে পড়ে। হিউরন লেকের সৌন্দর্যও যে ব্যাখ্যাতীত তা বলাই বাহুল্য।

৫। আইস কেভ বা বরফ গুহা (Ice Caves)

স্বচ্ছ জলের লেক, পৃথিবী

মিরর লেকের মত আইস কেভ বা বরফের গুহাও পৃথিবী জুড়ে অনেক রয়েছে। পৃথিবীর যে দেশগুলোতে বরফশীতল শীত পড়ে, সেসব দেশে রয়েছে এমন সব গুহা। আইসল্যান্ড, আলাস্কা, অস্ট্রিয়া এসব জায়গায় দেখতে পাওয়া যায় আইস কেভ। এসব গুহায় রয়েছে শতবর্ষজীবী সব বরফের টুকরো। বিভিন্ন আকৃতি এবং আবয়বের সেই টুকরোগুলো গুহার মধ্যে শূন্য ডিগ্রি তাপমাত্রায়, কম আলোতে এবং উপযুক্ত অবস্থানের কারণে সুরক্ষিত থাকে। গুহার ভেতরে স্বচ্ছ বরফের টুকরোগুলোতে আলো ফেলা হলে, সেই আলোর প্রতিফলনে নীলাভ একরঙা আলো গুহার আলো-আঁধারিতে যে সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে তা অপরুপ। পর্যটকরা সেই আলোর মধ্যে দিয়ে হাঁটতে গেলে, কাঁচের মধ্যে দিয়ে হাঁটছে, এমন অনুভূতি হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে জানার ব্যাপার হলো, এই গুহাগুলো একই সঙ্গে সুন্দর এবং বিপজ্জনক। মুহুর্তের অসতর্কতায় ডেকে আনতে পারে বিপর্যয়।

৪। ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক (Yellowstone National Park)

স্বচ্ছ জলের লেক, পৃথিবী

যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কে রয়েছে দশ হাজারেরও বেশি উষ্ণ প্রস্রবণ। এর মধ্যে কিছু প্রস্রবণ এত সুন্দর আর আকর্ষণীয় রঙের খেলা দেখায় যে জায়গাটিকে প্রায় অতিপ্রাকৃত বলে মনে হয়। এই রংগুলির সৃষ্টি হয় পানিতে থাকা জলজ উদ্ভিদের কারণে। সেখানকার পানি খুব স্বচ্ছ হবার পরেও সেখানে যে পানি আছে তা হঠাৎ চোখে দেখে বিশ্বাস হয় না। চোখে শুধু দেখা যায় অসাধারণ স্বপ্নীল সব রঙের খেলা। স্থির স্বচ্ছ পানির ওপর এইসব রঙের সমাবেশ ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ককেও অতিপ্রাকৃত সৌন্দর্য দান করেছে। এ পার্ক আমেরিকার সবচেয়ে আকর্ষনীয় এবং বিস্ময়কর স্থানগুলোর একটি।    

৩। গ্লাস বিজ বা কাঁচের সৈকত (Glass Beach -California/ Newfoundland and Labrador)

স্বচ্ছ জলের লেক, পৃথিবী

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় বিচিত্র চলচ্ছবির প্রচুর রঙিন সামুদ্রিক পাথরের টুকরো ছড়ানো এক সমুদ্র সৈকত রয়েছে। কাঁচের মত স্বচ্ছ, বিচিত্র রঙের সে পাথরগুলো তৈরি হয়েছে নগরবাসীর ফেলে দেওয়া কাঁচের টুকরো থেকে। ফোর্ড ব্রাগ শহরের দক্ষিণে সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় বহু বছর ধরে নগরবাসীরা গাড়ী, বোতল, কাঁচের বাসনপত্র প্রভৃতির ভাঙা কাঁচের টুকরো ফেলে দেয়। এসবই সমু্দ্রের পানির সংস্পর্শে ক্ষয়ে মসৃণ হয়ে সমুদ্র তীরে অসাধারণ সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে। এছাড়াও কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডে লাব্রাডরে এমন কাঁচে ভরা  সমুদ্র সৈকত রয়েছে। এসব রঙিন, গ্লাসি বা কাঁচের সৈকতে খালি পায়েও হেঁটে বেড়ানো যায়। কাঁচে পা কেটে যাবার ভয় নেই, সমুদ্রের পানিতে ভেসে আসা এ কাঁচের টুকরোগুলো যথেষ্ট মসৃণ। কানাডা আরও কিছু সমুদ্র সৈকতে এমন কাঁচের দেখা পাওয়া যায়, যেগুলো দেখতে মণিমুক্তার মত মনে হয়।

২। পামাকেলা (Pamukkale, Turkey)

স্বচ্ছ জলের লেক, পৃথিবী

যারা দেখতে যায় সবাই’ই পছন্দ করে তুরস্কের পামাকেলার ইনফিনিটি পুলগুলোর শান্ত, ঝকঝকে কাঁচের মত বিস্তৃত জলরাশি। সেখানে এরকম ১৭টি বিস্তৃত প্রাকৃতিক জলাধার রয়েছে। তুরস্কের পামাকেলা এলাকাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে চুনাপাথরের স্বচ্ছ দেয়াল। গরমকালে সেগুলোতে আলোকরশ্মি বেশি প্রতিফলিত হয়ে অদ্ভূত সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। কিন্তু এগুলোর কারণে নয়, এই এলাকাটির প্রতি দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কারণ এখানকার পরিষ্কার, নীলাভ সবুজ রঙের পানির জলাধারগুলো, আর সেগুলোর ঢেউয়ে নিরাপদে লুকিয়ে থাকা তুলার মত চুনাপাথরের ছোট ছোট টুকরো। দিনের আলোতে স্বচ্ছ পানিতে চুনাপাথরের টুকরো গুলোকে দেখলে মনে হবে মার্বেলের টুকরো বা বরফের টুকরো যেত পানিতে ভাসছে। দুঃখের ব্যাপার হলো, সে এলাকার  তাপমাত্রা ভয়ঙ্কর। কত জানেন? ৩৫ ডিগ্রি থেকে ১০০ ডিগ্রির মধ্যে উঠানামা করে।  

১। স্যালার ডে ইউনি (Salar de Uyuni, South America)

স্বচ্ছ জলের লেক, পৃথিবী

স্যালার ডে ইউনি হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সল্ট ফ্ল্যাট বা লবণের সমতল ভূমি। প্রাগৈতিহাসিক কালে দক্ষিণপূর্ব বলিভিয়ার লেগো মিনচিন সল্ট লেক শুকিয়ে এই সল্ট ফ্ল্যাটের সৃষ্টি হয়েছে। এখন এই এলাকাটিতে পুরু লবণের আস্তরণ সমতলভাবে পড়ে রয়েছে। বছরের কোন কোন সময় এ সমতলভূমির মাঝে কোথাও কোথাও অগভীর লোনা জলের জলাধারের সৃষ্টি হয়। শুকনো মৌসুমে এলাকাটি ধবধবে সাদা বিস্তৃত মরুভূমির মত দেখা যায়। কিন্তু বর্ষার সময় এই সমভূমি বিশালাকৃতির আয়নার রুপ ধারণ করে। পানি কোথায় গড়িয়ে পড়ার জায়গা নেই বলে সমতল ভূমির উপরই ছড়িয়ে থাকে। সেই সমভূমির উপর কয়েক ইঞ্চি ঘন লোনাজলে আকাশের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। আকাশ, মেঘ, আলো এবং অন্য যা কিছু এর উপরে ভেসে থাকে সবকিছুর প্রতিচ্ছবি এই লোনাজলে অদ্ভূত দৃশ্যকল্পের সৃষ্টি করে। পৃথিবী এ জায়গায় অসীম আয়নার রুপ ধারণ করে। একারণে, স্যালার ডে ইউনি কে অনেক সময় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক আয়না নামে অভিহিত করা হয়। এ্ আয়না মহাশূন্য থেকেও দেখা যায়।  

এখানে যেগুলো জায়গা নিয়ে আলোচনা করা হলো, তেমন অদ্ভূত সুন্দর প্রাকৃতিক বিস্ময় আরো অনেক রয়েছে পৃথিবী জুড়ে। সবগুলোর কথা জানা বা লেখা একদিনে সম্ভব নয়। যেগুলোর কথা আজ জানলাম এবং এখানে লিখলাম, সেগুলো সবার ভালো লাগবে আশা করছি। যদি ভালো লাগে, এমন কোন লেখা নিয়ে আবারও হাজির হবো কোন একদিন। সেই পর্যন্ত ভালো থাকুন, প্রত্যেকে।

আরও পড়ুন- 

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close