ইনসাইড বাংলাদেশরক্তাক্ত একাত্তর

রমজানের অষ্টম দিনে ধরা পড়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল!

একাত্তরে ধর্মের অপব্যবহার করা এদেশীয় রাজাকার, আলবদর ও পাকিস্তানি মিলিটারিরা নির্যাতন ও গণহত্যা করতে করতে এত বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিলো যে প্রতিদিন কাউকে না কাউকে ধরে নির্যাতন বা হত্যা করাকে তারা তাদের মৌলিক চাহিদা বানিয়ে ফেলেছিলো। এই নির্যাতন ও হত্যা করা যেমন তাদের নেশা ছিল তেমন তাদের পেশাও ছিল। একজন চাকুরীজীবী যেমন প্রতিদিন চাকুরী করার জন্য বের হয় তেমন একাত্তরে পাকিস্তানি মিলিটারি ও রাজাকারেরা প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই বাঙালি হত্যার নেশায়, পেশায় জড়িয়ে থাকতো।

প্রতিদিন-ই কোন না কোন গ্রামে মুসলমান শুদ্ধির নামে মুক্তিযোদ্ধা (পাকিস্তানিদের ভাষায় দুষ্কৃতিকারী!) ধরার অভিযান চালিয়ে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধর্ষণ, নির্যাতন ও সবশেষে নির্মম গণহত্যায় মেতে উঠত। রমজান মাসেও এর একটুও ব্যতিক্রম ছিল না।

মুসলমানদের কাছে পবিত্র রমজান মাসের এইদিনেও ধর্মের অপব্যবহার করে নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার লাউফা গ্রামে অভিযান চালিয়ে মুসলিম লীগ নেতা রাজাকার আতাউর রহমান ননী ও নেজামে ইসলামের রাজাকার ওবায়দুল হক তাহের লুটপাট, বাড়িঘরে আগুন, অপহরণ ও গণহত্যা চালিয়েছিলো। মশরফ আলী তালুকদার সহ ১০ জনকে অপহরণ করে ঠাকুরাকোনা ব্রিজে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেছিলো তারা।(১)

রমজান মাসের এদিন যশোর জেলার অভয়নগরে রাজাকার বাহিনীর একদল কুদ্দুস আলী শেখের বাড়িতে আক্রমণ চালিয়ে পরিবারের পাঁচ সদস্যকে গুলি করে হত্যা করে। সপরিবারে নিহত হওয়া ৫ জন শহীদের নাম ১। কুদ্দুস আলী শেখ, ২।মোঃ ইদ্রিস আলী শেখ, ৩। মোঃ ছাদেক আলী, ৪। মোসাম্মত সাজু বিব ও ৫। মোঃ ইসমাইল শেখ।(২)

২৯শে অক্টোবরের এদিন কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাঝামাঝি তন্তর চেক পোস্টে মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল (বর্তমানে জনপ্রিয় গীতিকার ও সুরকার) আরো ৩জন সঙ্গী মানিক, মাহবুব ও সারোয়ার সহ ধরা পড়েছিলেন পাকিস্তানি আর্মি ও রাজাকারের হাতে। সেখানে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর নির্মম নির্যাতন চলেছিল আড়াই ঘণ্টা, তারপর শুধু জাঙ্গিয়া রেখে উলঙ্গ করে রাখা হয়েছিলো। পাক সুবেদার হত্যার নির্দেশ দিলে মসজিদ থেকে ইমাম ডেকে এনে গোসল করিয়ে সুরাও পড়ানো হয়েছিলো, কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে মৃত্যুর সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে গেলে হঠাৎ ওয়্যারলেসে নির্দেশ এসেছিলো “মুক্তিকো হেড কোয়ার্টার মে লে আও”।(৩)

উলঙ্গ অবস্থায় ৫ ঘন্টা বাসের নীচে বসিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া রাজাকার হেড কোয়ার্টারে জিজ্ঞাসাবাদের নামে অকথ্য ভাষায় গালাগালি ও নির্যাতন করার পর পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে সেখানে দু’দিন আগে একই চেক পোষ্টে ধরা পড়া নজরুল, কামাল ও তাঁর বাবা সিরু মিয়া সহ আরো অনেকে ধরা পড়েছিলেন। প্রত্যক বন্দীকে দিনে দু’বার নির্যাতন করা হতো একবার পিস কমিটির (দারা মিয়ার বাড়িতে কুখ্যাত রাজাকার পেয়ারা মিয়ার নির্যাতন)(৪) অফিসে আর দ্বিতীয়বার আর্মি সেল অফিসে নির্যাতন করা হতো। এত বেশি নির্যাতন হতো যে রক্ত পর্যন্ত শুকাতো না।

এত নির্যাতনের মাঝেও বন্দীশালায় নামাজ পড়তেন সবাই, শহীদ নজরুল ইমামতি করতেন। মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল সহ বাকি ৩জন দারা মিয়ার টর্চার সেল থেকে রাতে পালাতে সক্ষম হলেও নজরুল, সিরু মিয়া দারোগা ও তাঁর ছেলে কামাল সহ বাকিদের ঈদের দিন হত্যা করা হয় পৈরতলা নামক স্থানে।

এদিন কুমিল্লা জেলার কসবা উপজেলার কোল্লাপাথর নামক স্থানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধে ধরা পড়েন কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর কলেজের ভিপি মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমান, তাঁর সাথে ধরা পড়েছিলেন কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব বাজার গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আশুরঞ্জন দেব। সিদ্দিকুর রহমান কে পাকিস্তানিরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে বন্দী করে রেখেছিলো ও অবশেষে বিজয়ের দুদিন আগে ১৪ই ডিসেম্বর তাঁকে স্থানীয় সিএন্ডবি রোডের পাশে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলো।(৫) মুক্তিযোদ্ধা আশুরঞ্জন দেবকে ২৯শে অক্টোবরে সেখানেই হত্যা করেছিলো। তাঁর নামে নামকরন করা হয়েছিলো ভৈরব বাজারের একটি সড়কের নাম।(৬)

কোল্লাপাথর ভারতীয় সীমান্তবর্তী হওয়ায় ও মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প থাকায় এখানে ২২৬টি অপারেশন হয়েছিলো, একাত্তরের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শহীদ হওয়া ৫০ জনের কবর ও স্মৃতিসৌধের নামফলকে আশুরঞ্জন দেবের নাম রয়েছে। কোল্লাপাথর ছাড়াও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আরো ১১৫৫ শহীদের কবর।(৭)


ছবিঃ কোল্লাপাথর সমাধিস্থল (দৈনিক যুগান্তর থেকে সংগৃহীত)

ছবিঃ কোল্লাপাথর শহীদের তালিকা (ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)

২৯শে অক্টোবর ভোলার বোরহানুদ্দিন থানায় পাকিস্তানি বাহিনীরা আক্রমণ করেছিলো যা বোরহানুদ্দিন যুদ্ধ নামে পরিচিত, সেদিন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি গ্রুপ বাজারে ঢুকে তাণ্ডব শুরু করেছিলো, বাজারের প্রতিটি দোকান, সাবরেজিস্ট্রি অফিস, বোরহানুদ্দিন হাই স্কুল, ডাকবাংলো, মন্দির, পার্শ্ববর্তী গ্রাম আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিলো। বোরহানুদ্দিন বাজার থেকে মাইল খানেক দূরে একটি খেজুর বাগানে অবস্থান নিচ্ছিলো মুক্তিবাহিনী, সেসময় বোরহানুদ্দিন বাজার জ্বলছিল। পাকিস্তানি সেনারা বোরহানুদ্দিন বাজার জ্বালিয়ে পূর্বদিকে আসলে জঙ্গলের ভেতরে মুক্তিযোদ্ধা তানসেন ও জলিল এম্বুশ নিয়ে গাড়ির টায়ার লক্ষ্য করে গুলি করলে টায়ার পাংচার হয়ে যায় কিন্তু ৫/৬ জন পাকিস্তানি সেনারা নেমেই ব্রাশফায়ার শুরু করে, সেখানেই শহীদ হন মুক্তিযোদ্ধা তানসেন ও জলিল।(৮)

তথ্যসূত্রঃ
১। দৈনিক জনকণ্ঠ, “নেত্রকোনার ননি ও তাহেরের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন”, ২রা মার্চ ২০১৫।
২। মুক্তিযুদ্ধ কোষ একাদশ খন্ড, মুনতাসির মামুন সম্পাদিত, সময় প্রকাশন পৃঃ ২৭২।
৩। দৈনিক জনকণ্ঠ, “যোদ্ধাপরাধীর বিচার, আহমেদ ইমতিয়াজের সাক্ষ্য”, ৫ই অক্টোবর ২০১২।
৪। প্রাগুক্ত ঐ
৫। মুক্তিযুদ্ধ কোষ একাদশ খন্ড, মুনতাসির মামুন সম্পাদিত, সময় প্রকাশন পৃঃ ৩৭২।
৬। মুক্তিযুদ্ধ কোষ নবম খন্ড, মুনতাসির মামুন সম্পাদিত, সময় প্রকাশন পৃঃ ৪৯৭।
৭। দৈনিক যুগান্তর, “কোল্লাপাথর শহীদ সমাধিস্থল”, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৬।
৮। মুক্তিযুদ্ধে বরিশালঃ নির্যাতন ও গণহত্যা, এম. ফরিদ উদ্দিন মঞ্জু, আপন প্রকাশ, পৃঃ ১৪৭-১৪৯।

গ্রন্থ কৃতজ্ঞতা- একাত্তরের রমজান- গণহত্যা ও নির্যাতন

বইটি পাওয়া যাচ্ছে ইত্যাদি শপ, বাংলা বই, রকমারি ও বইপোকায়

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close