১৯৯৭ – শাহীনের মাঠে বামবার কন্সার্ট। স্টেজ থেকে বেশ কিছু দূরে গুটিকয়েক বন্ধু দাঁড়িয়ে আছি। দেখলাম একটা মেয়ে সামনে দিয়ে হেটে যাচ্ছে, কিছুক্ষন পর ভীরের মাঝে মিলিয়ে গেলো। আরো কিছুক্ষন পর সেদিক থেকেই শুনলাম হট্টগোল। ভীড়ের জন্য কিছু দেখা যাচ্ছে না, আকাশের দিকে দেখলাম কি একটা ছুড়ে মারা হয়েছে, হাওয়ায় ভাস্যমান জিনিসটা কি ছিল বুঝতে কয়েক সেকেন্ড লাগলো – একটা ওড়না। একটু আগের দেখা মেয়েটা এই রঙের ওড়নাই পড়ে ছিল।

১৯৯৮ – আমার আগা খান স্কুলে কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছে। লাইনআপে আছে আর্ক, এলআরবি, নগরবাউল (তখন তো ফিলিংস নামে বাজাতো)। স্বাভাবিকভাবেই, কনসার্টটা শুধু আমাদের স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্যই হবার কথা ছিল। তবে শেষের দিকে আরো বেশী টিকেট বিক্রি করার জন্য কিভাবে জানি সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বাইরের মানুষের কাছেও টিকিট বিক্রি হবে।

ফলাফল: আর্কের সেট মোটামুটি ভালোভাবেই সম্পন্ন হলো। তবে নগরবাউলের সেট শুরু হতে হতে স্কুলের মাঠে বহিরাগত বখাটেদের আসা শুরু হয়ে গেলো। একা ভলান্টিয়ার আর শিক্ষকদের দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছিল এমনিতেই। এর মাঝে গুরু জেইমস একটা অসম্ভব দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ করলেন। তার সেটের শেষ গান ছিল ‘তারায় তারায়’। গাওয়ার আগে তিনি মাইকে বললেন ‘আমি একটা কথা বলতে চাই: তোমরা এই ছেলেমেয়েরা, তোমরা সুন্দর করে একসাথে হাতে হাত ধরে গান শুনতে পারো না?’

ব্যাস! আর পায় কে? গুরুর এমন বাণী যেন একেবারেই যা ইচ্ছা তাই করার লাইসেন্স। এমনিতেই বেয়ারা বহিরাগত বখাটেগুলো আরো মাথায় উঠলো। একেবারে কেওটিক অবস্থা। তখন ক্লাস টেনে পড়ি, আমি এবং আমার বন্ধু বান্ধবীরা রীতিমত ভয়ে কাঁপছি। নিজেদের স্কুলে কনসার্ট হচ্ছে, তাই সিনিওর জুনিওর অনেক মেয়েই ভেবেছিল নিরাপদ হবে, কেউ কেউ ওয়েস্টার্ন কাপড় পড়ে এসেছে, দুই একজন মিনিস্কার্ট পড়াও ছিল। তাদের অবস্থাটা কি দাঁড়িয়েছিল কল্পনা করা কঠিন কিছু না নিশ্চয়। একটা জুনিওর মেয়েকে দেখলাম দুইজন শিক্ষক হাত ধরে কোনমতে স্কুল বিল্ডিং এর দিকে নিয়ে যাচ্ছে, মেয়েটা থরথর করে কাঁপছে, চোখে পানি।

শেষপর্যন্ত যা হলো, আমরা আগা খানের ছাত্রছাত্রীদেরই স্কুল বিল্ডিং এর মধ্যে পালাতে হলো। এলআরবির সেটটা আমরা সবাই বিল্ডিং এর ভিতর থেকে এক প্রকার বন্দীর মত শুনলাম…আর বাইরে আমাদের মাঠে এক পাল বহিরাগত ছাগল আমাদের জন্য আয়োজিত কন্সার্ট উপভোগ করলো। কিছু করার ছিল না…এটা না করলে সেদিন আমাদের স্কুলের কতগুলো মেয়ে আস্ত বাড়ি ফিরতে পারতো কে জানে।

অতীত থেকে বর্তমান, যতদিন মেয়েদের সাথে নিয়ে কনসার্টে গিয়েছি, সেটা ফ্রেন্ড সার্কেলের সাথে হোক, বা বিয়ের পর আমার স্ত্রীকে নিয়ে হোক, কন্সার্ট উপভোগ যতটা করেছি, ততটা সময়ই কেটেছে মেয়েবন্ধুদের বা বউকে আগলে রাখতে। গ্রুপে গেলে মেয়েদের মাঝখানে রেখে আমরা ছেলেবন্ধুরা তাদের ঘিরে প্রায় মহাভারতের চক্রব্যূহ-সম বেষ্টনী বেঁধে রাখতে বাধ্য হয়েছি পুরো সময়। বউ আর আমি একা গেলে যেভাবে হোক বউকে নিজের ঠিক সামনে রেখে আগলে রাখতে হয়েছে।

শুধু কনসার্টের অভিজ্ঞতাগুলোর কথা বললাম। বাংলাদেশের যে কোন জায়গায়, যে কোন পরিস্থিতে, যে কোন সুযোগে মেয়েদের গায়ে হাত দেয়া, মেয়েদের উত্যক্ত করার সংস্কৃতি আমাদের রক্তের মধ্যে মিশে আছে। এখানে শুধু ছাত্রলীগ/ছাত্রদল/ছাত্রশিবির/আওয়ামী লীগ/বিএনপি/জামাত কোন বিশেষ রাজনৈতিক দল বা কাউকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। যেখানে কনসার্টের ১৫ বছরের বখাটে ছেলেটাও সামনের মেয়েটার ওড়না চামে চিকনে ধরে টান মারতে চায়, আর গাউসিয়ার ভীরে চল্লিশোর্ধ আপাতদৃষ্টিতে শিক্ষিত ভদ্রলোক আঙ্কেলও চান্সে সামনের মেয়েটার পিছনে হাত বুলিয়ে দেয়।

আমাদের রক্তের মধ্যে দোষ আছে। আজকে ৭ই মার্চের ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্য শুধু লীগের ছেলেপেলেগুলোকে দোষ দিয়ে, বা এই সুযোগে ‘জয় বাংলা’ – কে ট্রলিং করে এসবের উপসম নেই। আজকে ছাত্রলীগের ছেলেপেলেরা ‘জয় বাংলা’ বলে করছে, ২০০১ সালে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে বিএনপির ছেলেপেলেরা পূর্ণিমা রানী শীলের কাছে ‘একে একে’ গিয়েছে।

প্রতিবার ঘটনা ঘটার পর কে করেছে তার রাজনৈতিক পরিচয় খুঁজে বের করে সেটাকেই আলোচ্য বিষয় বানানো আসলে সময় নষ্ট করা এবং সমস্যার সমাধানে আন্তরিক না হওয়া। কারন কোন দলের কোন ধর্মের কে এসব করছে, সেসব শুধু আলামত, রোগটা আরো ভয়াবহ, এবং আরো গভীরে গেঁথে যাওয়া। পহেলা বৈশাখে হয়েছে, দোল পূর্ণিমায় হয়েছে, ৭ই মার্চে হলো। ক্ষমতাসীন দল পাল্টে গেলে ভবিষ্যতে ৭ই নভেম্বরেও হবে, ঈদেও হবে।

যতদিন এটা আমরা না বুঝবো, এবং সামাজিকভাবে পরিবর্তন না আসবে, ততদিন এমন যৌন হয়রানি/নিগ্রহ/নিপীড়ন চলতেই থাকবে।

লেখক- Yamen Hoque

Comments
Spread the love