অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

ইলুমিনাতি থেকে এলিয়েন- বিশ্বখ্যাত যত কন্সপিরেসি থিওরি

কন্সপিরেসি থিওরি বা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সাথে আমরা সকলেই কমবেশি পরিচিত। আপাতদৃষ্টিতে একদমই সাদামাটা কোনো একটি বিষয়ের আড়ালে গোপন কোন উদ্দেশ্য বা অভিসন্ধির অস্তিত্ব রয়েছে, এমন বিশ্বাসের নামই হলো কন্সপিরেসি থিওরি। খুব সহজ একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টিকে উপস্থাপন করা সম্ভব। এই তো মাত্র কিছুদিন আগেই রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল মাসব্যাপী বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮। সবাইকে চমকে দিয়ে এ প্রতিযোগিতার সেরা আটে পৌঁছে গিয়েছিল স্বাগতিক রাশিয়া। র‍্যাংকিং অনুযায়ী আসরের দুর্বলতম দলটির জন্য এমন অর্জন নিঃসন্দেহে অসাধারণ। কিন্তু অনেকেই এর মাঝে ষড়যন্ত্রের ছায়া খুঁজে পেয়েছিলেন। রাউন্ড অফ সিক্সটিনে রাশিয়া যখন সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে হারিয়ে দিল, অনেকের মুখেই শোনা গেছে যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নাকি নিজের প্রভাব খাটিয়ে তার দেশকে এতদূর অবধি নিয়ে এসেছেন! অর্থাৎ রাশিয়া নিজ যোগ্যতায় বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠেনি, সেখানে হাত ছিল পুতিনের- এমন ধারণাই হলো কন্সপিরেসি থিওরি।

রাশিয়া পুতিন, রাশিয়া বিশ্বকাপ পুতিন

কন্সপিরেসি থিওরি দ্বারা মূলত কোন ঘটনার এমন ব্যাখাকে বোঝায়, যা সুস্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোন গভীর ষড়যন্ত্রের দিকে ইঙ্গিত করে থাকে, যার পেছনে সরকার (রাষ্ট্র) বা ক্ষমতাশীল কোন সংগঠনকে দায়ী করা হয়, এই যুক্তিতে যে যে তারা এর মাধ্যমে অসৎ উপায়ে এবং ক্ষতিকর পন্থায় করে নিজেদের ফায়দা লাভ করতে চায়। এরকম তত্ত্বগুলির একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে এগুলি এমন প্রকল্প তৈরী করে যা ইতিহাস এবং ক্ষেত্রবিশেষে সাধারণ বোধের (সরল সত্য) সাথে সাংঘর্ষিক।

১৯০৯ সালে প্রথম কন্সপিরেসি থিওরি শব্দ-বন্ধের উৎপত্তি ঘটে, এবং সত্তরের দশকে এটির ব্যাপক প্রচলন ঘটে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বের যেকোন উল্লেখযোগ্য ঘটনার পেছনেই একদল লোক কন্সপিরেসি থিওরির অস্তিত্ব খুঁজে পায়, এবং সে-কারণে বর্তমান সময়ের কোন ঘটনাই শতভাগ বিশ্বাসযোগ্যতা লাভ করে না। কন্সপিরেসি থিওরির কোন কনক্রিট ভিত্তি না থাকলেও, এটি মানুষের মনে সন্দেহের বীজ বুনে দেয়। তাই একটু সন্দেহপ্রবণ মন যাদের, তারা সহজেই এতে প্রভাবিত হয়ে যায় ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। ফলে তাদের পক্ষে সরল মনে কোন সত্যকেই গ্রহণ করা সম্ভব হয় না।

তাহলে পাঠক, এখন চলুন জেনে আসি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় কিছু কন্সপিরেসি থিওরির সম্পর্কে।

কোন গোপন সংগঠন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বিশ্ব

এই কন্সপিরেসি থিওরিতে বিশ্বাস করা হয় যে ইলুমিনাতি নামের একটি গোপন সংগঠন রয়েছে যারা আড়ালে থেকে পুরো বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে, এবং তাদের লক্ষ্য হলো গোটা বিশ্বকে একটি একক সরকার ব্যবস্থার দ্বারা নিজেদের কব্জায় নিয়ে আসা। এবং এর মাধ্যমে একসময় তারা বিশ্বব্যাপী স্বৈরাচারী শাসমব্যবস্থা কায়েম করতে চায়। এই থিওরি অনুযায়ী বিশ্বাস করা হয় যে বর্তমান সময়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অধিকাংশ দেশেরই রাষ্ট্রপ্রধানেরা সরাসরি ইলুমিনাতি নামক গোপন সংগঠনটির মনোনীত সদস্য, এবং ওই রাষ্ট্রপ্রধানেরা মূলত ইলুমিনাতির স্বার্থরক্ষার কাজই করে আসছে।

৯/১১ এর হামলা ছিল মার্কিন সরকারের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত

একদল মানুষ বিশ্বাস করে যে ৯/১১ এর হামলা মূলত মার্কিন সরকার কর্তৃক পরিচালিত হয়েছিল, এবং এ হামলার সকল পরিকল্পনা ও দিক-নির্দেশনা এসেছিল সরাসরি হোয়াইট হাউজের ভিতর থেকে। তারা বিশ্বাস করে যে বুশ সরকার আগে থেকেই জানত যে এরকম একটি হামলা হতে পারে, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা এটি প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থা না নিয়ে চুপ করে বসে ছিল, কারণ তারা চেয়েছিল এই হামলাকে ইস্যু করে ইরাক আক্রমণ করতে। এবং শেষ পর্যন্ত তারা তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সফলও হয়েছিল।

এলিয়েনরা যোগাযোগ করছে মানুষের সাথে

গত অর্ধশতক ধরে যেকোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অস্বাভাবিকতাকেই এক শ্রেণীর লোক পৃথিবীতে এলিয়েন আগমণের প্রভাব বলে বিশ্বাস করে এসেছে। ১৯৪৭ সালে নিউ মেক্সিকোর রোজওয়েলে একটি ফ্লাইং সসার বিধ্বস্ত হওয়ার রহস্যকে কেন্দ্র করে প্রথম এ ধারণা ডালপালা মেলতে শুরু করে। এবং সে-ধারনা আরও জোরদার হয় মার্কিন মিলিটারি বেস এরিয়া ৫১-কে নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত গোপনীয়তার কারণে। কন্সপিরেসি থিওরিস্টরা বিশ্বাস করে, এই এরিয়া ৫১-এর ভিতরই মার্কিনিরা গোপনে এলিয়েনদের সাথে সাক্ষাৎ করছে, এবং এলিয়েনদের সহায়তায় নিজেদের ক্রমশ উন্নতি করে চলেছে এবং বাকি বিশ্বের উপর ছড়ি ঘুরিয়ে আসছে।

চন্দ্রবিজয় ছিল সাজানো ঘটনা

মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয় চাঁদের বুকে মানুষের পা দেয়াকে। কিন্তু অনেকেরই দৃঢ় বিশ্বাস, আসলে মানুষ কোনদিনই চাঁদে যায়নি। তারা মনে করে, পুরোটাই ছিল নাসা ও আমেরিকান সরকারের মিলিত উদ্যোগে ঘটানো একটি বানোয়াট ঘটনা, যাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে স্নায়ুযুদ্ধে তারা কিছুটা এগিয়ে যেতে পারে, এবং নিজেদের দেশের গৌরব বৃদ্ধি পায়। চন্দ্রবিজয়ের পর সেখানকার মাটিতে পোঁতা আমেরিকার যে পতাকার ছবি রয়েছে, সেটিকে উড়তে দেখেই অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, চাঁদে তো বাতাস নেই তাহলে পতাকাটি নড়ছে কীভাবে! অনেকে যদিও ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে কেবল পতাকাটি প্রসারিত করার সময়ই তা নড়েছিল, কিন্তু এমন ব্যাখ্যা সন্দেহবাতিকগ্রস্তদের সামনে ধোপে টেকেনি। অনেকে তো এমনকি এই তত্ত্বেও বিশ্বাসী যে বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা স্ট্যানলি কিউব্রিকের পরিচালনায় চন্দ্রাভিযানের ভুয়া ভিডিও ফুটেজ নির্মিত হয়েছিল।

আবিষ্কার হয়েছে ক্যান্সার প্রতিষেধক ওষুধ

এই কন্সপিরেসি থিওরি অনুযায়ী বিশ্বাস করা হয় যে, এফডিএ ও বিগ ফার্মা ক্যান্সার প্রতিষেধক ওষুধ আবিষ্কার করে ফেলেছে, কিন্তু তারা এটিকে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত বা বাজারজাত করছে না। কিন্তু এর পিছনে ঠিক কী কারণ থাকতে পারে তা অবশ্য পরিষ্কার নয়। সত্যিই যদি এমন কোন ওষুধ আবিষ্কৃত হয়ে থাকে, তা বাজারজাত করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারেন এর আবিষ্কারকেরা। কিন্তু তা না করে কেন এটি কুক্ষিগত করে রাখছেন তারা? হতে পারে আরও বেশি দামে এটি তারা এমন কারও কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন যারা হয়ত চায় যে একসময় পৃথিবী থেকে সাধারণ সব মানুষ বিলুপ্ত হয়ে যাক এবং শুধু তারাই টিকে থাকুক! কিংবা আবিষ্কারকেরা নিজেরাই হয়ত এ ধারণার বশবর্তী হয়ে সাধারণ মানুষের নাগাল থেকে দূরে রাখছেন ক্যান্সার প্রতিষেধক ওষুধগুলো।

হলোকাস্টের ঘটনা পুরোটাই বানোয়াট

হলোকাস্ট নিয়ে এত এত প্রামাণ্য দলিল রয়েছে, সরাসরি এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করা সাক্ষী রয়েছেন এবং এ বিষয়ের উপর এত বই রচিত হয়েছে, চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে যে বিশ্বাস করতে কোন কষ্টই হওয়ার কথা না যে গত শতাব্দীর প্রথমার্ধে জার্মান নাৎসী বাহিনীর হাতে ৬০ লক্ষ ইহুদী বেঘোরে প্রাণ হারিয়েছিল। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এমন অনেক মানুষই রয়েছে যারা মনে করে হলোকাস্ট বলতে আসলে কিছু ঘটেইনি। এক জরিপের ফলাফল বলছে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫৪ শতাংশ হলোকাস্টের কথা শুনেছে, এবং তাদের মধ্যে মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ মানুষ বিশ্বাস করে হলোকাস্টের যে ভয়াবহতার কথা তাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে, সেরকম আসলেই কিছু হয়েছিল।

যীশু বিয়ে করেছিলেন মেরি ম্যাগডালিনকে

কিছুদিন আগে ব্রিটিশ মিউজিয়মে উদ্ধার হয় যিশু খ্রিস্টের জীবনী নিয়ে রচিত একটি পুঁথি। হারিয়ে যাওয়া ওই গসপেলের বয়ান অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় দু’হাজার বছর আগে যিশু বিয়ে করেছিলেন তাঁরই প্রিয় শিষ্যা মেরি ম্যাগডালেনকে। আরামায়িক ভাষা এবং ওই হরফেই লেখা এই পুঁথিকেই হারিয়ে যাওয়া দ্য লস্ট গসপেল বলে মনে করছেন পুরাতাত্ত্বিকরা। এই পুঁথিতেই লেখা রয়েছে এমন এক বিস্ফোরক তথ্য, যা এতদিন ক্যাথলিক চার্চ সযত্নে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল বলে দাবি করে এসেছেন একদল ঐতিহাসিক। কিন্ত্ত, চতুর্থ শতাব্দীতে সম্রাট কনস্টানটাইন ও চার্চের মিলিত প্রচেষ্টায় সেই বিয়ের যাবতীয় প্রমাণ নাকি লোপাট করে দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে চার্চের উদ্যোগে যে বাইবেল লেখা হয়েছিল, সেই বাইবেলে মেরি ম্যাগডালেনকে দেহোপজীবিনী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এক শ্রেণির ঐতিহাসিকের দাবি, চার্চের এই প্রয়াসের পিছনে রয়েছে গভীর চক্রান্ত। মেরির সঙ্গে যিশুর বিবাহ ও তাঁদের সন্তান জন্মানোর খবর চেপে দেওয়ার জন্যই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে মেরি ম্যাগডালেনের চরিত্রহনন করা হয়। যিশুর বিবাহ ও সন্তান জন্ম সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য গোপন করতে পারলে চার্চের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ থাকবে, তাই বিশেষ সাবধানতার সঙ্গেই গত দু’হাজার বছর ধরে চার্চ এই সত্য উদঘাটিত হতে দেয়নি বলে সন্দেহ অনেকের। এই দলে পড়তেন মধ্যযুগের একাধিক দিকপাল ব্যক্তিত্বও। মনে করা হয়, এঁদের মধ্যে ছিলেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, সান্দ্রো বত্তিচেল্লি, রবার্ট বয়েল এবং আইজ্যাক নিউটনের মতো ব্যক্তিত্বও।

তথ্যসূত্র- দ্য উইক, বিগথিংক

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close