অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছইনসাইড বাংলাদেশডিসকভারিং বাংলাদেশ

ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরেই ঠেকাই মাথা…

শুভংকর শুভ, ফরিদপুরে মাটিতে এই তরুণের জন্ম। কিন্তু, দেশটা তো বাংলাদেশ, একটাই দেশ, আমরা সবাই এই মাটিরই সন্তান। তাহলে কেনো আমাদের মধ্যে এতো বিবেধ, কেন আমরা নিজের জেলার বাইরের কাউকে কখনো কখনো হেয় করি? বিষয়গুলো খুব ভাবায় শুভংকরকে। বাংলাদেশের ৬৪ জেলা, ঘুরাঘুরি একটু নেশা আছে শুভংকরের। মানচিত্র দেখে আর ভাবে এই ৬৪টি জেলার মাটিগুলো সব একদিন ছুঁয়ে দেখবে সে। এর মধ্যেই তার ভাবনায় আসলো, আচ্ছা যারা কখনো ৬৪টি জেলা ঘুরবে না, যাদের হাতে সেরকম সময়ও নেই, কেমন হয় যদি তাদের সামনে এই সবগুলো জেলাকে দেখানো যায়? কেমন অনুভূতি হবে তাদের ৬৪টি জেলার মাটিকে একসাথে ছুঁয়ে দেখার পর? শুভংকর ভাবলো, সে একটা মানচিত্র করবে। আমাদের বাংলাদেশের মানচিত্র। মানচিত্রে যেমন প্রত্যেকটা জেলা থাকে, জেলার নাম থাকে, এই মানচিত্র তেমন সাধারণ হবে না, এই মানচিত্র তৈরি হবে ৬৪ জেলার মাটি দিয়ে। চাঁদপুরের মাটি থাকবে চাঁদপুর জেলার জায়গায়, বরিশালের মাটি থাকবে বরিশাল জেলার স্থানে, ফরিদপুরের মাটি, রংপুরের মাটি এভাবে সারা বাংলাদেশ, টেকনাফ থেকে পঞ্চগড় সব জেলা মিলেমিশে, সব জেলার মাটি মিলেমিশে তৈরি হবে একটা মানচিত্র, একটা বাংলাদেশ!

ভাবনাটা বেশ ভাল। কিন্তু শুনেই অনেকে ব্যাপারটাকে আমলেই নেয়নি। এমনকি পরিবার থেকেও সেভাবে সহযোগিতা আসেনি শুরুর দিকে। কারণ, ব্যাপারটার গুরুত্ব অনেকেই তখন ধরতেই পারেনি। ভেবেছে অল্প বয়সী তরুণের পাগলামি। কিন্তু, ইতিহাস বলে এই বাংলাদেশটার জন্মই হয়েছে তরুণদের হাত ধরে, এই ভাষা এই মাটি, এই মানচিত্র, এই পতাকা সবকিছুতেই তো তরুণদের রক্ত, শক্তি, ঘাম মিলে মিশে একাকার।

64 district soil map, ৬৪ জেলার মাটির ম্যাপ, শুভংকর শুভ
৬৪ জেলার মাটির মানচিত্র বানাতে শুভংকর শুভর সময় লেগেছে তিন বছর!

শুভংকর সহযোগিতা চাইলেন। অনলাইনে, ব্লগে, ভিডিওর মাধ্যমে তিনি অনুরোধ জানালেন বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার মাটি কুরিয়ার করে পাঠানোর জন্যে। অনেকেই মাটির আইডিয়াতে চমৎকৃত হয়। কেউ কেউ পাঠায়। কেউ কেউ কথা দিয়ে কথা রাখতে পারে না। এই উদ্যোগটি শুভংকর শুরু করেছিলেন ২০১৬ সালে। কিন্তু, সারা বাংলাদেশের মাটি এক করতে, সবগুলোর জেলার মাটি সংগ্রহ করতে তার প্রায় তিনবছর সময় লেগে যায়। কারণ, অনেকেই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছে, অনেকেই সাহায্য করতে চায়নি, অনেকেই বলেছে মাটি পাঠাবে, কিন্তু পরে কি মনে করে আর পাঠায়নি। হয়ত কাজটার গুরুত্ব তারা অনুধাবন করতে পারেনি।

কিন্তু, ঠিকই কাজটা শেষ করেছেন শুভংকর। অপরিসীম ধর্য ধরে তিনি পাক্কা তিন বছর অপেক্ষা করেছেন, ৬৪ জেলার মাটিকে এক করার জন্যে। এ যেন গোটা বাংলাদেশকে এক করার প্রচেষ্টা, এক বাংলাদেশ, মাটির বন্ধন একসাথে গেঁথে গেঁথে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবার শিকড়কে একসাথে যুক্ত করার প্রচেষ্টা এটি।

64 district soil map, ৬৪ জেলার মাটির ম্যাপ, শুভংকর শুভ
তৈরি হচ্ছে ৬৪ জেলার মাটির মানচিত্র!

আগেই বলেছি শুভংকর জন্মেছিলেন ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায়। পিতা নিহার রঞ্জন পাল একজন চিকিৎসক, মাতা অমিতা পাল গৃহিণী। পিতার মতো হয়ত ছেলেও একদিন চিকিৎসক হোক এটাই সবাই আশা করেছিল। কিন্তু, শুভ আগ্রহী হন সৃষ্টিশীল কাজে। তিনি সিনেমা বানাবেন স্বপ্ন দেখেন, যে সিনেমায় বাংলাদেশ উঠে আসবে সিনেমার ফ্রেমে। ৬৪ জেলা ঘুরার ভীষণ ইচ্ছা থাকলেও পরিবারের সম্মতি না থাকা সহ বিভিন্ন কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। তিনি ভার্চুয়াল জগতে সব জেলা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতেন, ভার্চুয়ালি ঘুরতেন বাংলাদেশটা। তার মনে হলো, এই সবগুলো জেলা মিলেই আমরা একটি পরিবার। যদি আমি এই জেলাগুলোর মাটি একসঙ্গে ছুঁয়ে দেখতে পারি নিজে, ছুঁয়ে দেখাতে পারি সবাইকে, যদি একসাথে যুক্ত করা যায় সবগুলো জেলার মাটিকে তাহলে কেমন হবে? মানুষকে একটা মেসেজ দেয়া যাবে, এটাই আমার বাংলাদেশ, আমি তুমি আলাদা না, আমরা একই দেশের মাটিতে বেড়ে উঠা মানুষ।

64 district soil map, ৬৪ জেলার মাটির ম্যাপ, শুভংকর শুভ
৬৪ জেলার মাটির মানচিত্র তৈরিতে বিভিন্ন জেলা থেকে যারা মাটি সংগ্রহ করেছিলেন।

ভাল কাজ চাপা পড়ে থাকার একটা ট্রেন্ড আছে বাংলাদেশে। অদ্ভুত অদ্ভুত বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও ভাল কাজগুলো চাপা পড়ে যায়। কিন্তু, শুভর কাজটি মানুষ গ্রহণ করেছে দেখে আনন্দিত শুভও। তিনিও কৃতজ্ঞ এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, অনুপ্রাণিতও বটে, সামনে বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করে এমন আরো ভাল কাজ করতে চান শুভ। শুভ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন,

“এদেশে সেফুদার মুখের ভাষা ভাইরাল হয়। সেফুদার ডাইলগ নিয়ে টিশার্ট এর ডিজাউন করা হয়। মোবাইল এপস তৈরি হয়। চায়ের কাপে ঝড় ওঠে। সেখানে আমার বাংলাদেশ নাম নিয়ে ঝড় উঠছে বাংলাদেশের মাটিকে কেন্দ্র করে ঝড় উঠছে। আমি মনে করি এটাই আমার স্বার্থকতা। সব চেয়ে বড় সফলতা।

আমার কিছু বন্ধু আছে যারা সবার হাত তালি দেখে হাততালি দিচ্ছে। ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই, গতকাল আমার একজন বন্ধু বলছে, “দোস্ত মাটি লাগলে এখনি বল, কুরিয়ার করে পাঠিয়ে দিচ্ছি।” আমি বললাম, লাগবে না, সংগ্রহ হয়ে গেছে। আমার এই বন্ধুটিকে আমার প্রজেক্ট সম্পর্কে অনেক বুঝিয়েছিলাম। কিন্তু সে এমনভাবে আমার কাজটাকে ছোট করেছিল যে তার সাথে আমি আর কখনো কথা বলি নি।”

64 district soil map, ৬৪ জেলার মাটির ম্যাপ, শুভংকর শুভ, Shuvongkar Shuvo
৬৪ জেলার মাটির মানচিত্র বানানো শুভংকর শুভ।

কাজটা করবার পর সত্যি সবাই বিস্মিত হয়ে যায়। এখন সকলে বুঝতে পারে এই কাজটির গুরুত্ব। শুভ সব জেলার মাটি দিয়ে যে মানচিত্র তৈরি করেছে সেটার প্রশংসায় সকলেই পঞ্চমুখ। বিভিন্ন মানুষ দেখতে আসে এই মানচিত্র, ছুঁয়ে দেখতে চায় বাংলাদেশকে। বন্ধুরাও বেশ গর্বিত শুভকে নিয়ে। শুভর বর্তমান শিক্ষা প্রতিষ্টান স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পেজ থেকেও শেয়ার করা হয়েছে এই কাজ। বিভিন্ন মত, দল, বর্ণের মানুষরাও মুগ্ধ। শুভর প্রচেষ্টা, ভাবনাটাই যেনো স্বার্থকতা পেতে যাচ্ছে মানুষের এই গ্রহণযোগ্যতায়। আমরাও নতুন করে বাংলাদেশের মাটির প্রেমে পড়ি, আর গুণগুণ করে গাই, ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা…

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close