অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

ছিল ৫০০ ডলার পুঁজি, আজ ১ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা!

প্রথম সন্তানের জন্মের পূর্বে আমাদের দেশের গর্ভবতী নারীরা কাঁথা আর জামা সেলাই করে না, সময় কাটাবার জন্য? অনেকটা সেরকমই, প্রথম সন্তান পেটে নিয়ে গহনার ডিজাইন করতে শুরু করেন ২৮ বছর বয়সী কেন্দ্রা স্কট। তাতে তার সময়ও কাটে, একটা ব্যবসার পরিকল্পনাও বাসা বাঁধে মনের মধ্যে।

সালটা ছিল ২০০২। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের রাজধানী অস্টিনের অধিবাসী কেন্দ্রা স্কট, নিজের কাছে জমানো মাত্র ৫০০ ডলার নিয়ে শুরু করে তার গহনার ব্যবসার যাত্রা। আলাদা কোন প্রতিষ্ঠান বা দোকান নয়, নিজের বাড়িতে নিজেই ডিজাইন করে গহনা তৈরি করতেন কেন্দ্রা স্কট। সন্তান জন্মের পরে, তাকে বেবিসিটারের কাছে রেখে, নিজের বানানো গহনা নিয়ে বাড়ি বাড়ি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন কেন্দ্রা স্কট। সেসময় তার একমাত্র সহযোগী ছিল তার প্রথম স্বামী। এমন করেই শুরু..।

এখন কেন্দ্রা স্কটের বয়স ৪৪। এই বয়সেই ভদ্রমহিলার বিশাল ব্যবসা। তার কোম্পানীর মূল্যমান বর্তমানে এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। তার নিজেরই এখন ৫০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যমানের সম্পদ রয়েছে। ২০১৭ সালে, ফোর্বস ম্যাগাজিনে, নিজের চেষ্টায় ধনী হয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন নারীদের তালিকায় ৩৬ তম স্থানে উঠে এসেছিল কেন্দ্রা স্কটের নাম।

যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিনে জন্ম এবং বেড়ে ওঠা এই সফল নারী উদ্যেক্তার। টেক্সাস ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিলেন উচ্চ শিক্ষার জন্য। কিন্তু্, বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষেই ড্রপ আউটের তালিকায় যুক্ত হয় তার নাম। এরপর থেকে তিনি টেক্সাসের রাজধানী অস্টিনে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়েই কেন্দ্রা স্কট এক ভিন্নধর্মী ব্যবসা শুরু করেন। দু’বছর চলেছিল তার সে ব্যবসা। তিনি তখন ক্যান্সারে আক্রান্ত যেসব রোগীর কেমোথেরাপীর মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তাদের জন্য বিশেষ ধরণের হ্যাট তৈরি করতে শুরু করেন। এই তার প্রথম ব্যবসা। আর এই সময় থেকেই তিনি শুরু করেন জনহিতৈষী কাজ-কারবার। এই প্রথম ব্যবসা থেকে যা লাভ হতো, তার একটি অংশ তিনি দান করতেন স্থানীয় একটি হাসপাতালে।

গহনা তৈরির কথা মাথায় আসে এরপরই। মাঝারি আয়ের মানুষদের চাহিদা এবং সামর্থ্যের মধ্যে সমন্বয় হতে পারে এমন দামে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গহনা পাওয়া বেশ কঠিন। তাই, মধ্যবিত্তের সামর্থ্য অনুযায়ী চাহিদা আর যোগানের মাঝে যে বিশাল একটা ব্যবধান রয়েছে সেকথা ভেবেই, গহনার ব্যবসা শুরু করার কথা চিন্তা করেন কেন্দ্রা স্কট। তিনি এমন গহনা বানানোর চিন্তা করেন, যেগুলো খুব সস্তাও হবে না, আবার খুব বেশি দামীও হবে না।  রত্নপাথর দিয়ে তিনি এমন মানসম্মত গহনা বানানোর কথা ভাবেন, যেগুলো তার মত মধ্যবিত্ত আয়ের মহিলারা কিনতে এবং ব্যবহার করতে পারবে।

প্রথমদিকে কোন আউটলেট না খুলে কেন্দ্রা স্কট, দোকানে দোকানে পাইকারি দরে বিক্রি করত তার বানানো গহনা। এভাবেই ধীরে ধীরে তার ব্যবসা বড় হতে থাকে। নতুন নতুন মানুষ যুক্ত হতে থাকে তার এই ব্যবসায়।  মেধাবী, পরিশ্রমী আর উদ্দমী কর্মীদের নিয়ে ব্যবসার প্রসারে কেন্দ্রা স্কট গড়ে তোলে একটি টিম। এ টিমই তার ব্যবসাকে তুলে আনে সাফল্যের চূড়ায়।

২০১০ সালে কেন্দ্রা স্কটের ব্যবসা নতুন মোড় নেয়। তখন থেকেই তার পাইকারী ব্যবসা রুপ নেয় খুচরা ব্যবসায়। গহনার দোকানের প্রথম শাখাটি খোলা হয় টেক্সাসের অস্টিনে, কেন্দ্রার নিজের শহরেই। দোকান খোলার সময় কেন্দ্রা তার দোকানকে একটু ভিন্নভাবে সাজানোর পরিকল্পনা করেন। অন্য আর দশটা দোকানের চেয়ে তার গহনার দোকানটি যেন একটু ভিন্ন ধাঁচের হয় এবং ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে পারে সেদিকে বিশেষভাবে নজর দেন কেন্দ্রা স্কট।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে কেন্দ্রার গহনার দোকান, কেন্দ্রা স্কট জুয়েলারির আউটলেট ৮০ টি। তার কোম্পানীর একটি ওয়েবসাইট রয়েছে, যার মাধ্যমে, বিদেশেও গহনা ডেলিভারী দেওয়া হয়। ২০০০ জনেরও বেশি কর্মী কাজ করে কেন্দ্রার কোম্পানীতে, যাদের মধ্যে ৯৬ শতাংশ নারী। যদিও কেন্দ্রার কোম্পানীটিতে অন্য অনেকের বিনিয়োগ রয়েছে, তবু এই কোম্পানীর বেশিরভাগ শেয়ারের মালিক কেন্দ্রা স্কট নিজেই।

কেন্দ্রা স্কট সম্পর্কে বলতে গিয়ে তাই যুক্তরাষ্ট্রের এক্সেসরি কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ক্যারিন গিবারসন তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ, ”কেন্দ্রা এই ইন্ডাস্ট্রিতে একটি ইউনিকর্নের মত। কখন বাজারে কোন ট্রেন্ড আসবে তা সে-ই অনেকটা ঠিক করে। এ কারণেই সে এতটা সফল। যেখানে অন্যরা এ ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে, সেখানে কেন্দ্রার ব্রান্ড ফুঁলে ফেঁপে একাকার।”

কেন্দ্রা স্কটের সাফল্যের আরও বড় একটা কারণ হলো, তার কোম্পানী ক্রেতাদের সেই গহনা ই সরবরাহ করে, যা তারা চায়। সামর্থ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিতৃপ্তিতে ক্রেতারা যে চায়, সে গহনাই বানিয়ে দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে কেন্দ্রা স্কট জুয়েলারি। তাছাড়া, কেন্দ্রার কোম্পানী অনেক দাতব্য সংস্থার সাথে জড়িত থাকার কারণেও হয়তো অনেক ক্রেতারা এখানে গহনা কিনতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

গত বছর, কেন্দ্রা স্কটের কোম্পানী ৫ মিলিয়ন ডলার নগদ অর্থ এবং হাজার হাজার গহনা দান করেছে বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষভাবে নারী ও শিশুদের কল্যাণে। এছাড়াও কেন্দ্রা স্কটের রয়েছে, কেন্দ্রা কেয়ার প্রোগ্রাম নামের এক দাতব্য কর্মসূচি, যার আওতায়, শিশু হসপিটালের বাচ্চারা নিজেদের জন্য, বা বাবা-মা, বা অন্য কোন প্রিয় মানুষের জন্য কেন্দ্রা স্কট জুয়েলারী তৈরি করতে পারে বিনামূল্যে। কেন্দ্রা স্কটের কর্মচারীরা ২০০০ ঘন্টারও বেশি স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে থাকে নিজেদের কোম্পানীর বা বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার হয়ে অর্থ সংগ্রহের কাজে।

কেন্দ্রা স্কটের মতে, তার কোম্পানীর দাতব্য কাজের পরিধি ধীরে ধীরে আরো বাড়বে  এবং চলতে থাকবে। কেননা, তিনি তার ব্যবসা শুরুই করেছেন তিনটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে- ফ্যামিলি, ফ্যাশন এবং ফিল্যানথ্রপি।

প্রথম লক্ষ্য, ফ্যামিলি বা পরিবার, কেন্দ্রা স্কটের ব্যবসার  একটি মূল বৈশিষ্ট্য। তার কোম্পানীর সব ফুল-টাইম এবং পার্ট টাইম কর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত পিতৃত্বকালীন এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে। সন্তান জন্মদানের আগে ও পরে প্রয়োজনীয় অর্থ সহযোগীতা দেওয়া হয় কোম্পানীর পক্ষ থেকে। তাদের জন্য বিশেষ ফান্ডের ব্যবস্থা করা হয়, যাতে জরুরী অবস্থায় সে ফান্ডে জমানো অর্থ ব্যবহার করা যায়। বাবা-মা ছোট বাচ্চাদের সাথে নিয়েও কাজে আসতে পারে। সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনে এত সব সুবিধা প্রদানর মূল লক্ষ্য তো সুখী পরিবার গঠনই, নাকি?

কেন্দ্রা স্কটের জীবন এবং ক্যারিয়ারেও রয়েছে নানারকম উঠানামা। তিন সন্তানের জননী কেন্দ্রা স্কট সব সমস্যার মোকাবিলা করেই সফলতার সাথে এগিয়ে চলেছেন। পরিশ্রম, মেধা এবং স্বদ্বিচ্ছার জোরে হয়ে উঠেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে সফল উদ্যোক্তাদের একজন। হয়ে উঠেছেন, দুনিয়ার সকল সাধারণ নারী, যারা উদ্যেক্তা হতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য উৎকৃষ্ট উদাহরণ। শুধু উদ্যোক্তা হিসেবেই নয়, আদর্শ নারী হিসেবেও দৃষ্টান্ত হতে পারেন কেন্দ্রা স্কট। একজন সফল উদ্যোক্তা, আদর্শ মা, একজন মানবহিতৈষী নারী হিসেবে কেন্দ্রা স্কট নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনে হতে পারেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close