২৫শে অক্টোবর ১৯৭১ এ পাবনার নাজিরপুরের মানুষ ৪র্থ রমজানের সেহরি খেয়ে যেই ঘুমাতে গিয়েছেন কেবল, ঠিক তখনি ভোর রাতে পাকিস্তান টিকিয়ে রাখার শান্তি কমিটির রাজাকারেরা শ’খানেক সাচ্চা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্য নিয়ে পুরো গ্রাম ঘিরে ফেলে। তাদের কাছে তথ্য ছিল এই গ্রামে নাকি মুক্তিবাহিনী আশ্রয় নিয়েছে আর গ্রামবাসীরা তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করছে।

নাজিরপুরের ভুক্তভোগী আব্দুল হামিদ নিজের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া নিষ্ঠুর কার্যকলাপ বর্ণনা করেছিলেন এভাবে যে, রমজান মাস পালন না করা তথাকথিত শান্তি কমিটির সেই রাজাকারেরা ঘাতক হানাদার বাহিনীকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কোন ঘর গুলিতে আগুন দিয়ে জ্বালাতে হবে, কমপক্ষে ৮-৯টি বাড়ি প্রথমে তারা লুটপাট করে তারপর আগুনে পুড়িয়ে দেয়। অন্য জিনিষপত্র লুট করার সাথে গরু ছাগল মুরগীও ধরে নিয়ে যায়। এই সময়ে দু’জন লোক পালাতে গেলে তাদের গুলি করা হয়, তারা সাথে সাথেই মারা যান।(১)

বলতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে পাকিস্তানিদের এই অমানবিক কাজে একটা বড় অবদান ছিল শান্তি কমিটির রাজাকারদের। জামাতে ইসলামীর এই রাজাকারেরা ধর্মের দোহাই দিয়ে পাকিস্তান টিকিয়ে রাখার জন্য শান্তি কমিঠি, আল বদর, আল শামস গঠন করেছিল। আবার তারাই ধর্মীয় লেবাস পড়ে পবিত্র রমজান মাসেই অন্য ধর্মালম্বির মানুষের পাশাপাশি একই ধর্মের নিরীহ মুসলমানদের হত্যা, পাশবিক নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট করতে সাহায্য করেছিল।

এদিন মুক্তিবাহিনীর সদস্য ভেবে আব্দুল হামিদকে ধরে চড় থাপ্পড় কিল ঘুষি লাথি মেরে নিয়ে যাওয়া হয় পাকিস্তানিদের সার্কিট হাউজ ক্যাম্পে। শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ, মুক্তিবাহিনীর সদস্য কিনা, তার দলে কতজন আছেন? কতজন হত্যা করেছেন? অস্ত্রসস্ত্র কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন? প্রশ্নগুলির উত্তরে আব্দুল হামিদ যখনই বলেন তিনি মুক্তিবাহিনীর সদস্য না ঠিক তখনই শুরু হতো শারিরীক নির্যাতন। পেছনে দড়ি দিয়ে হাত বেঁধে রেখে এলোপাতাড়িভাবে বেতের বাড়ি দিয়ে প্রহার করা হতো তাকে আর সাথে কিল ঘুষি লাথি তো আছেই। কিছুক্ষন পরপর ৩/৪ ঘন্টা এরকম পাশবিক অত্যাচার চালানো হয়, এক পর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।(২)

আব্দুল হামিদের মত অনেক বাঙালিকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে এই রমজান মাসেও নির্মমভাবে অত্যাচার চালিয়েছিল পাকিস্তানিরা। যতক্ষণ পর্যন্ত কোন তথ্য না পেত ততক্ষণ পর্যন্ত এরকম অমানবিক নির্যাতন চলতে থাকতো। অনেককে ফ্যানের সাথে রশি দিয়ে ঝুলিয়ে উল্টো করে প্রহার করা হতো, নির্যাতনের এক পর্যায়ে অনেকেই মারা যেতো আবার তালিকা ধরে অনেককে গুলি করে, বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে কিংবা জবাই করে মেরে ফেলা হতো।

এর পেছনের মূল কারিগর ছিল রাজাকারেরা। তারাই পাকিস্তানিদের রাস্তা চিনিয়ে, বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে, মানুষ চিনিয়ে দিতো কাকে ধরে নিয়ে যেতে হবে, অনেক ক্ষেত্রে তারাই বলে দিতো কাকে মেরে ফেলতে হবে আর কাকে ছেড়ে দিতে হবে। আব্দুল হামিদ একটু ভাগ্যবান বলেই মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। টানা তিনদিন নির্যাতনের পর তাঁর আত্নীয় স্বজন নগদ অর্থ দিয়ে শান্তি কমিঠির রাজাকারের মাধ্যমে ছাড়া পেয়েছিলেন।

আরেক ভুক্তভোগী নোয়াখালী জেলার সোনাগাজী থানার পূর্ব চর চান্দিয়া গ্রামের বাসিন্দা নুরজাহান বেগমের কাছে এই দিনটি ছিল এক বিভীষিকাময়। তার স্বামী মোঃ আব্দুল কুদ্দুস একজন কৃষক ছিলেন, সারাদিন পরের বাড়িতে কাজ করতেন বিধায় মা বাবার সাথেই থাকতেন তিনি। ১৫ অক্টোবর মুক্তিবাহিনী সোনাগাজী থানা দখল করার পর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী পুনরায় মুক্তিবাহিনী হটিয়ে সোনাগাজী থানা দখল করে এবং মুক্তিবাহিনীর সদস্য ধরার জন্য অপারেশন চালায়, রাজাকারদের সাহায্যে কয়েকটি গ্রামেও অগ্নিসংযোগ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২৫শে অক্টোবর চর চান্দিয়া গ্রামে জোর তল্লাশী চালায়, প্রত্যেক বাড়ির আনাচে কানাচে খুঁজে বেড়ায়।

নুরজাহান বেগম তখন বাবা মায়ের সাথেই ছিলেন, তাদের ঘরে পাক হানাদারের তল্লাশী চালাতে আসতে দেখে তিনি লুকিয়ে পড়েন খাটের নিচে। বাবা মাকে উর্দুতে প্রশ্ন করা হলে তারা কোন উত্তর দিতে পারেননি আর এজন্য রাইফেলের বাট দিয়ে বেদম প্রহার করে। পুরো ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজে খাটের নিচ থেকে নুরজাহান বেগমকে টেনে হিচড়ে বের করে। তিনি চিৎকার করলে তার বাবা মা পাকস্তানি সেনাদের পা ধরে অনেক অনুরোধ করেন, তাদেরকে জোর করে ঘর থেকে বের করে দিয়ে দরজা আটকে ফেলে। নুরজাহান বেগমও পা ধরে নিজের জীবন ভিক্ষা চাইলে তাকে লাথি দিয়ে ফেলে নির্মমভাবে গণধর্ষণ করে ৩ জন পাকসেনা, এক পর্যায়ে নুরজাহান বেগম জ্ঞান হারান।(৩)

সংযমের মাসের ধারে কাছেও পাকিস্তানি মুসলমান সেনাবাহিনী ছিল না। তারা কোন বাঙালি নারীকে পেলে উল্লাসে ফেটে পড়তো, ধর্ষণলীলায় মেতে উঠতো। রমজান মাসেও নুরজাহান বেগমের মত এরকম নারীদের উপর অত্যাচার, নির্যাতন, ধর্ষন ছিল নিয়মিত ঘটনা আর এসব কাজে সহযোগীতা করতো দেশীয় রাজাকারেরা।

রমজান, ১৯৭১, গণহত্যা

টাঙ্গাইলের নাগরপুরের মানুষের জন্য একাত্তরের ২৫শে অক্টোবর ছিল বিভীষিকাময়। এই উপজেলার গয়হাটা ইউনিয়নের বনগ্রামে চলে পাকিস্তানিদের বর্বরোচিত হামলা। এই গ্রামটি ছিল চারদিকে ঘেরা জঙ্গলের ভেতরে, কৌশলগত কারনে বনগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বেছে নেওয়া হয়েছিল মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। কিন্তু রাজাকারদের গোপন তথ্য পেয়ে এদিন আকাস্মিক আক্রমন করে পাকিস্তানি বাহিনী।(৪) এইদিন ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা সহ ৯৭ জন গ্রামবাসী প্রাণ হারান পাকিস্তানীদের হাতে। হানাদার বাহিনীরা বনগ্রামের নিরীহ গ্রামবাসীদের বাড়িঘর আগুনে জ্বালিয়ে দেয়। বনগ্রামের মানুষ এই পৈশাচিক হামলার কথা আজো ভুলতে পারেন না তাই প্রতিবছর ২৫শে অক্টোবর আসলে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন শোকাবহ এই দিনটি। (৫)

শঙ্কর মাধবপুর গ্রামটি রাজিবপুর থানার কোদালকাটি ইউনিয়নের, দখল পাল্টাদখল নিয়ে দুবার প্রচণ্ড যুদ্ধও হয়েছে, এর পরে কয়েকবার হানা দিতে চাইলেও প্রতিবার মার খেয়ে চলে যেতে হয়েছিল তাদের। কিন্তু ২৫শে অক্টোবর তারা আবার নদীপথে বাহাদুরাবাদ ঘাট থেকে চিলমারী যেতে হানা দিলো শঙ্কর মাধবপুর গ্রামে, সেদিন পথে মুক্তিবাহিনীর দ্বারা কোন বাধাপ্রাপ্ত হয়নি, মুক্তিবাহিনী অন্যদিকে ব্যস্ত ছিল। আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানিরা গ্রামে ঢুকেই খুব দ্রুত শুরু করে অগ্নিসংযোগ, তাও এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। গ্রামবাসী ভয়ে পালালে পিছু পিছু গুলি ছুড়তে থাকে, গুলিবিদ্ধ হন গ্রামবাসীরা। মাঠে ঘাটে পরে থাকে মানুষ আর গৃহপালিত পশুর মৃতদেহ। সেদিন ৫০ জনেরও বেশি নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালিকে হত্যা করা হয় যার মধ্যে ৪৪ জনের নাম জানা যায় পরবর্তী সময়ে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন থেকে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধে কুড়িগ্রামে।(৬) তাঁরা হলেনঃ

১। আব্দুর রহমান, ২। মোকছেদ আলী, ৩। মোহাম্মদ আলী, ৪। খোরশেদ আলী মুন্সী, ৫। আব্দুল বারী, ৬। কুতুব আলী, ৭। মন্তাজ আলী দেওয়ান, ৮। বাদশা দেওয়ান, ৯। আব্দুল গণি, ১০। আয়নাল হক, ১১। ফজল হক, ১২। পাছালী শেখ, ১৩। মোকছেদ আলী (২), ১৪। মোহাম্মদ রুস্তুম, ১৫। জুরান শিকদার, ১৬। নুরুল ইসলাম, ১৭। আজিজুল হক, ১৮। আজিজুর রহমান, ১৯। ময়ান শেখ, ২০। হেলাল বেপারী, ২১। নতুব আলী, ২২। জব্বার আলী, ২৩। মেজান শেখ, ২৪। হজরত আলী, ২৫। লাল চান, ২৬। এন্তাজ আলী, ২৭। আবুল হোসেন, ২৮। আয়েন উদ্দিন, ২৯। কছিম উদ্দিন, ৩০। আছমত আলী, ৩১। আব্দুল আজিজ, ৩২। সোবহান বেপারী, ৩৩। বিষু শেখ, ৩৪। আয়োবী বেওয়া, ৩৫। মফিজ উদ্দিন, ৩৬। আব্দুল আজিজ (২), ৩৭। ইনুছ শেখ, ৩৮। সিদ্দিক আলী, ৩৯। মজিদ সরকার, ৪০। সায়েজ আলী, ৪১। তোরান মোল্লা, ৪২। আব্দুল গফুর, ৪৩। সোয়াগি বেওয়া, ৪৪। আরজ উল্লাহ প্রমুখ।(৭)

পাক হানাদার বাহিনী সেদিন অবলীলায় নারী ধর্ষণ করেছিল সেখানে, স্বামী চোখের সামনেই স্ত্রী হারিয়েছিলেন সম্ভ্রম। পিতার দেহের উপর টেনে হেঁচড়ে নিয়ে গিয়েছিলো কন্যাকে। এমন নির্মমতা এমন পাশবিকতা কেউ দেখেনি।(৮) সংযমের মাস পবিত্র রমজান মাসের এদিনও ইসলাম ধর্ম রক্ষার নামে অখণ্ড পাকিস্তান ধরে রাখার কথা বলে ধর্ষণ, নির্যাতন ও গণহত্যায় মেতে উঠেছিলো সাচ্চা পাকিস্তানি মুসলমান সেনা ও তাদের দোসর ঘৃণ্য রাজাকারেরা।

এইরকম এক ঘৃণ্য রাজাকার বিয়ানীবাজারের আমুড়া গ্রামের ইমান আলী ছদ্মবেশে আরেকটি গ্রাম সুন্দিশাইলে ঢুকে মুক্তিবাহিনীর খবর নিয়ে পৌছে দিয়েছিলো পাকিস্তানি মিলিটারির কাছে। গ্রামটি টিলাময় ও চারদিকে হাওরে বেষ্টিত থাকায় অবস্থানের জন্য মুক্তিযোদ্ধারা এই গ্রামটি বেছে নিয়েছিলেন। ২৫শে অক্টোবর রমজান মাসের ৪র্থ দিনে সকাল ১০টার দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর ৪টি দলের শত শত পাকসেনা ও রাজাকারেরা সুন্দিশাইল গ্রামটি ঘেরাও করে। ১টি বাহিনী আসে বিয়ানীবাজার থেকে, আরেকটি চারখাই থেকে আর তৃতীয় ও চতুর্থ বাহিনী আসে সিলেট ও গোলাপগঞ্জ থেকে আমুড়া গ্রামের ভেতর দিয়ে হামলা চালায়।(৯)

প্রতিটি বাড়ি ঘুরে ঘুরে ১৭জন নিরীহ নিরপরাধ বাঙালিদেরকে ধরে নিয়ে মোকামটিলা নামক স্থানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হত্যা করার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলো তারা, ঠিক তখনই এই দৃশ্য দেখে নীরব না থেকে মুক্তিবাহিনী গুলি চালিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনীর উপর, ফলে বেঁচে গিয়েছিলেন সেই ১৭ জন নিরীহ নিরপরাধ মানুষ।(১০) অদূরে একটি জঙ্গলাকীর্ণ টিলা থেকে মুক্তিবাহিনীর সাথে প্রচণ্ড গোলাগুলি চলে পাকিস্তানি বাহিনীর। মুক্তিযোদ্ধারা সংখ্যায় অল্প হলেও সুবিধাজনক স্থানে থাকায় পাকিস্তানিরা টিকতে পারলো না, এলাকাবাসীর মতে ৭০-৮০টি মৃতদেহ পাকিস্তানি কনভয়গুলো নিয়ে গিয়েছিলো।(১১) পাকিস্তানি জল্লাদেরা কৌশল পাল্টে একাধিক গ্রুপে ভাগ হয়ে বাড়িতে বাড়িতে যাকে যেখানে পেয়েছে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়েছিলো। কেউ কেউ হাওরে ঝাঁপ দিয়ে, জঙ্গলের ভেতর ঢুকে কোনরকমে আত্মগোপন করেছিলেন। এলোপাতাড়ি গুলির কারনে অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে এখনো বেঁচে আছেন আমীর হোসেন, আজাদ হোসেন, মইনউদ্দিন, চেরাগ আলী, উছমান আলী, মখলিছ আলী প্রমুখ।(১২)

সেদিনের গণহত্যায় শহীদ হয়েছিলেন ২৩ জন, তাঁরা হলেনঃ ১। খুরশেদ আলী লস্কর, ২। আমদ আলী, ৩। আব্দুল মুমিত চৌধুরী (তোতা মিয়া), ৪। চান্দ মিয়া, ৫। মুবেশ্বর আলী, ৬। কুটু চান্দ মিয়া, ৭। ওয়াহিদ আলী, ৮। মস্তন মিয়া, ৯। ওহাব আলী, ১০। সুনু মিয়া, ১১। সমুজ আলী, ১২। মাতাই মিয়া, ১৩। আনু মিয়া, ১৪। কুটুল মিয়া, ১৫। মুতালিব আলী, ১৬। চুনু মিয়া, ১৭। মানিক মিয়া, ১৮। আব্দুল খালিক, ১৯। নাহিদ উল্লা, ২০। কাচু মিয়া, ২১। রফিক উদ্দিন, ২২। ইল্লু মিয়া ও ২৩। মনোরঞ্জনের মা।(১৩) পরেরদিন আবার পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধাকে অন্য কোথাও থেকে ধরে নিয়ে সুন্দিশাইল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো, তাঁদের নাম জানা যায়নি।

এই হত্যাকাণ্ডের সক্রিয় সমর্থন যুগিয়েছিল রাজাকার কমান্ডার মাখন মিয়া ও রাজাকার আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী। স্বাধীনতার পর রাজাকার মাখন মিয়া যুক্তরাজ্যে ও আব্দুল কুদ্দুস এলাকা ছেড়ে দেশের মধ্যেই অন্যত্র পালিয়ে গিয়েছিলো। সেদিনের সেই ২৩ জন শহীদের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য উপজেলার এরাল বিল ও বিয়মাইল বিলের মধ্যবতী ঘটনাস্থলে নির্মাণ করা হয়েছে ২৩টি শহীদ স্মৃতিসৌধ।

রমজান, ১৯৭১, গণহত্যা

এদিন গাজীপুরের শোলা প্রতিমা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রকীব মিয়া শহীদ হন, তিনি পাকিস্তান নৌবাহিনীতে প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করে ফ্রান্স থেকে খরিদ করা পাকিস্তানি সাবমেরিনে ছিলেন। যুদ্ধ শুরু হবার পর ১৩ জন বাঙালির মধ্যে ৯ জন বাঙালি দেশের হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত হবার জন্য ফ্রান্স ত্যাগ করে ৮ জন (১ জন লন্ডনে চলে যান) স্পেনের মাদ্রিদ হয়ে ভারতে এসেছিলেন।(১৪) ২৫শে অক্টোবর পাকিস্তানি সৈন্যদের জন্য রসদ বহন করা জাহাজে মাইন লাগিয়ে ধ্বংস করার জন্য বুকে লিমপেড মাইন লাগিয়ে নেমে পড়েছিলেন যমুনা নদীর প্রচণ্ড স্রোতের মাঝে। ফুলছড়ি ঘাটে জাহাজের সন্নিকটে আসার পর দুর্ভাগ্যবশত জাহাজ ছেড়ে দিলে আর প্রচণ্ড ঘূর্ণায়মান স্রোতের কারনে ও জাহাজের প্রপেলারের আঘাতে কয়েকজন কমান্ডোর শরীর খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে ভেসে গিয়েছিলো। শহীদদের মৃতদেহ ভেসে যাওয়ার কারনে বাংলাদেশের কোথাও তাঁদের সমাধিস্থ করা সম্ভব হয়নি। বীরত্বপূর্ণ ভুমিকা প্রদর্শনের জন্য তাঁকে বীরবিক্রম উপাধি দেওয়া হয়েছিলো।(১৫) এদিন আরো শহীদ হয়েছিলেন মঠবাড়িয়ার সদর থানার মুক্তিযোদ্ধা আবু মিয়া(১৬) ও রাজশাহীর কুদিবাড়ির মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হক(১৭), গোপালগঞ্জের খালিসাখালির মুক্তিযোদ্ধা সুভাষ বিশ্বাস।(১৮)

৪র্থ রমজানের এইদিনে ময়মসিংহের মুক্তাগাছা শহরের ঈশ্বরগ্রাম-মাঝিপাড়ায় ব্যপক তাণ্ডবলীলা চালায় পাকদস্যুরা, আগের দিনের ভিটেবাড়ি গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হেরে প্রতিশোধ নিতে চালানো হয়েছিলো এই হত্যাযজ্ঞ আর অগ্নিসংযোগ। তেরীপাড়ার বিনোদ বকশীকে, গন্ধবপুড়ের আঃ সাত্তার ও পাইকা শিমুলের মনসুর আলীকে ময়লাখানা বধ্যভূমিতে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিলো। মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিয়ে সাহায্য করার অভিযোগে হরিপুর দেউলী ডিসপেন্সারির কম্পাউন্ডার আঃ আজিজকে হত্যা করেছিলো তাঁর বাসার সামনে। ক্ষুদ্র সবজি ব্যবসায়ী পাড়াটঙ্গীর তোরাব আলী, নাড়ু ও মোয়া বিক্রেতা গোবিন্দ সাহাকে গুলি করে হত্যা করেছিলো বাজারে। হাট বাজারে আগত ক্রেতা বিক্রেতাকে এদিন গণহারে হত্যা করেছিলো তারা। অগ্নিসংযোগ আর লুটপাটে শহরের দরিচারিআনি বাজার, আটানিবাজার, হরিজনপল্লী, বড়হিস্যা বাজার ও জমিদার বকুল মিয়ার বাড়ি পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। দখল হয়ে যায় হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক বাড়িঘর আর প্রাণের ভয় দেখিয়ে বাধ্য করা হয় ধর্মান্তরিত করতে।(১৯)

তথ্যসূত্র:

১। গণহত্যা’৭১, তপন কুমার দে, নওরোজ সাহিত্য সংসদ, পৃঃ ৪৯।
২। দৈনিক যায় যায় দিন, “মনিরামপুরের ৫ সূর্যসন্তানের শাহাদাতবার্ষিকী আজ”, ২৩শে অক্টোবর ২০১৬।
৩। দৈনিক জনকণ্ঠ, “মনিরামপুরের ৫ মুক্তিযোদ্ধার শাহাদাত বার্ষিকী আজ”, ২৩শে অক্টোবর ২০১৬।
৪। বাংলা ট্রিবিউনে সিরাজুল ইসলামের সাক্ষাৎকার, “পাঁচ শহীদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা চান সিরাজুল”, ২৭শে মার্চ ২০১৬।
৫। মুক্তিযুদ্ধ কোষ নবম খন্ড, মুনতাসির মামুন সম্পাদিত, সময় প্রকাশন পৃঃ ৩২৬।
৬। মুক্তিযুদ্ধ কোষ দশম খন্ড, মুনতাসির মামুন সম্পাদিত, সময় প্রকাশন পৃঃ ৪৪০।
৭। মুক্তিযুদ্ধ কোষ একাদশ খন্ড, মুনতাসির মামুন সম্পাদিত, সময় প্রকাশন পৃঃ ২০।
৮। প্রাগুক্ত ঐ পৃঃ ২৪৯।
৯। একাত্তরের গনহত্যাঃ যমুনার পূর্ব পশ্চিম, শফিউদ্দিন তালুকদার, কথাপ্রকাশ, পৃঃ ৬৮।
১০। প্রাগুক্ত ঐ।
১১। গণহত্যা’৭১, তপন কুমার দে, নওরোজ সাহিত্য সংসদ, পৃঃ ৬০।
১২। পাকিস্তানি জেনারেলদের মনঃ বাঙালি বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ, মুনতাসির মামুন, সময় প্রকাশন, পৃঃ ২৭।

গ্রন্থ কৃতজ্ঞতা- একাত্তরের রমজান- গণহত্যা ও নির্যাতন

বইটি পাওয়া যাচ্ছে ইত্যাদি শপ,বাংলা বই ,রকমারি ও বইপোকায়

Comments
Spread the love