‘মুজিব কাকুকে স্বাধীনতার ঘোষণায় রাজি করাতে না পেরে রাত ৯টার দিকে আব্বু ঘরে ফিরলেন বিক্ষুব্ধ চিত্তে। আম্মাকে সব ঘটনা জানালেন।’… লিখেছেন শারমিন আহমদ (তাজউদ্দিন আহমদ: পিতা ও নেতা)

‘২৫ মার্চ মাঝরাতে ইয়াহিয়া খান তার রক্তলোলুপ সাজোয়া বাহিনীকে বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের উপর লেলিয়ে দিয়ে যে নব হত্যাযজ্ঞের শুরু করেন তা প্রতিরোধ করবার আহবান জানিয়ে আমাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন’… বলেছেন তাজউদ্দিন আহমদ, ১১ এপ্রিল ১৯৭১, স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার বক্তৃতায়।

স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে তাজউদ্দিন আহমদ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার সেই অনুলিপিটির উল্লেখ করেছেন যেখানে স্পষ্ট লেখা:

From Dacca
to
People’s of Bangladesh and all of the world
Pakistan arms forces suddenly attacked EPR of Peelkhana and Police forces at Rajarbag from 00 hours of 26th March killing laks of unarmed people [.] fierce battle going on with EPR and police forces in the street of Dacca and people are fighting gallantly for the freedom of Bangladesh. Every section of people of Bangladesh asked- attack enemy force at any cost of Bangladesh. May Allah bless you and help you in your struggle of Freedom

Joy Bangla
Sk. Mujib”

এখানে পিতাই নাকচ করে দিচ্ছেন তার মৃত্যুর ৩৯ বছর পর আচমকা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী কন্যার অবান্তর দাবিনামা। আম্মু বলেছেন বা আব্বু আম্মুকে বলেছেন জাতীয় বিবৃতি কখনও ইতিহাসের উপাত্ত বা দলিল বা রেফারেন্স হিসেবে স্বীকৃতি পায় না। পায়নি কোথাও।

তথ্য ও ইতিহাস বিকৃতির এই ডামাডোলে গা ভাসানো শারমিন আহমদ অজস্র পূর্বসূরী পেয়েছেন যারা তার আলটপকা বয়ানের পটভূমি তৈরি করে রেখেছেন অনেকদিন থেকেই। একটি প্রভাবশালী দৈনিকের পে-রোলে থাকা বুদ্ধিজীবি নামের এসব বুদ্ধিবেশ্যা তাদের প্রকাশনী থেকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এই ধারা সেই ধারা নিরপেক্ষ ধারা জাতীয় ডিসকোর্স জন্ম দিয়েছেন। সেখানেই আমরা দেখি কৌশলে দুটো মতবাদ গেলানো হচ্ছে যে বাঙালী স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত ছিল না এবং বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার বদলে স্বেচ্ছাবন্দীত্ব গ্রহণ করেছেন পাকিস্তানীদের হাতে ধরা দিয়ে। এরই উপজাত হিসেবে খালেদা জিয়া তনয় তারেক জিয়া অবলীলায় বঙ্গবন্ধু সরকারকেই অবৈধ বলে ঘোষণা দিয়ে ফেলেন। আর শারমিন লেখেন ২৫ মার্চ রাতে তাজউদ্দিন আহমদকে উল্টো বঙ্গবন্ধু বোঝাচ্ছেন ২৭ তারিখ হরতাল দিয়েছি সেটা পালন করো। ২৫ মার্চ আওয়ামী লীগের যে প্রেস কনফারেন্সে হরতালের ঘোষণা আসে সেটা তো তাজউদ্দিনেরই দেওয়া বঙ্গবন্ধুর তরফে।

এখানে কিছু পয়েন্ট ঠান্ডা মাথায় বুঝতে হবে। একাত্তরের রাজনৈতিক কর্মসূচীর ধারাবাহিকতা। সব ঘটনা মার্চেই ঘটেছে ধরে নিয়ে আমরা ভুলে যাই একাত্তরের অন্যতম একটি ল্যান্ডমার্ক দিনের কথা, যেখানে আসলে মুজিব নগর সরকার বা মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের রূপরেখার ভিত্তি দেওয়া হয়েছিলো। মার্চে জাতীয় পরিষদ বসা নিয়ে টালবাহানা পাকিস্তানীরা করবে সেই দূরদর্শিতায় কিনা নিশ্চিত নয়, তবে ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো শপথ দিবস। সেখানে জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে জয় লাভ করা আওয়ামী লীগের সকল সদস্য শপথ নেন ছয় দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র কায়েম করার। ছয় দফাই ছিলো বাঙালীর স্বাধীনতার মূল সনদ, আর তার লড়াই যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতৃত্বে হবে তা সেদিন ঘোষণা করে দেন শেখ মুজিবুর রহমান। এবং ৭ মার্চ যোগ করে দেন, ‘আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি’।

১০ এপ্রিল স্বাধীনতার সনদ এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন যে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়, তা হয়েছিলো আওয়ামী লীগের ওই নির্বাচিত সাংসদদের নেতৃত্বেই, যারা ৩ জানুয়ারি রেসকোর্সে শপথ নিয়েছিলেন বাঙালীর স্বাধীনতার লড়াইয়ে জীবন দেওয়ার। সেই সরকারই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছে তারেক জিয়ার বিখ্যাত ঘোষক বাবা এবং প্রথম রাষ্ট্রপতি বাবা সেখানে ৫০০ টাকা মাসিক বেতনে সেনা কর্মকর্তা হিসেবে চাকুরি করেছেন,এবং সেই সরকারের আনুগত্য স্বীকার করে।

স্বেচ্ছাবন্দীত্ব নিয়ে শারমিন যে গল্পটি পরিবেশন করেছেন, সেই প্রসঙ্গে তুলে দিচ্ছি আমার একটি পুরানো লেখার প্রাসঙ্গিক অংশটুকু: ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার নিয়েও নানা কুকথা। একদল বলে শেখ মুজিব যদি স্বাধীনতাই চাইবেন তাহলে কেনো পালিয়ে গেলেন না! কেনো নিজে দাড়িয়ে থেকে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিলেন না! কেনো গ্রেফতার বরণ করলেন! আরেক দল তো আরো রূঢ়। দেশকে রক্তগঙ্গায় ভাসিয়ে বঙ্গবন্ধু নাকি পাকিস্তানে অতিথি হয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার তদবীর চালাতে। হায় পাপাচার! এই মূঢ়েরা বোঝে না স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবনটা নিয়েই কতবড় একটা জুয়া খেলেছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি পালাবেন? পালিয়েছেন কোনো কালে? তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একবারও কি পালিয়েছেন? ’৭৫এর সেই কালো রাতে যখন ঘাতকরা স্টেন উচিয়ে এগিয়ে আসছে, পালিয়েছেন? নাকি মুখোমুখি হয়েছেন নির্ভয়ে?

আরে এই লোকটা বাঙালীর নেতা। বাঙালীর ইজ্জত তার হাতে। তার পালালে চলে? আর তার অভিধানে থাকতে হবে তো শব্দটা!

কোনোকালেই ছিলো না। তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন বলেই মুক্তিযুদ্ধ নায্য লড়াইর স্বীকৃতি পেয়েছে। সারা বিশ্ব জেনেছে জনতার রায়কে বুটে মাড়িয়ে, তাদের রক্তে হোলি খেলে, তাদের নেতাকে হাতকড়ি লাগিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে উপনিবেশবাদ কায়েম রাখতে ইয়াহিয়া কতখানি মরিয়া। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে বুলেটে নিকেশ করার সেই ষড়যন্ত্রের নায্য প্রতিবাদ হিসেবেই স্বীকৃতি পেয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। নায্য হয়েছে তাজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে প্রবাসী সরকারের লড়াই। তারা সব নির্বাচিত প্রতিনিধি, দেশের জনগনের ভোটে নির্বাচিত। কোনো বিদ্রোহী উপদল নয়, গৃহযুদ্ধের যুযুধান অংশ নয়। মুজিব গ্রেফতার না হলে অনেক সহজ হয়ে যেতো পাকিস্তানীদের কাজটা। তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নেতা হিসেবে চিহ্নিত করে গণহত্যা জায়েজ করা যেতো। যে কোনো সময় হত্যা করে সেটাকে বৈধতা দেওয়া যেত। আগামী একশ বছরেও পূর্ব পাকিস্তান থেকে আর স্বাধীনতা শব্দটা উচ্চারিত হতো না।…

শারমিন, এ ধরণের লেখায় আপনার ক্রেডিবিলিটি কমে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কিত করে বা তাকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয় না, আপনার বাবাও তখন অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েন, সুবাদে আপনিও। ওই এভিল এক্সিসটা এখনও সত্তর-আশির দশকে পড়ে আছে। তারা জানে না তরুণ প্রজন্ম আর ইতিহাস মূর্খ নয়। কথাটা মাথায় রাখলে সবার জন্য ভালো…

ছবি তিনটির একটি বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার টেলিগ্রাফ ফর্ম, ১৯৭১ সালের ৩ ও ৪ জানুয়ারির দৈনিক পাকিস্তান।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-