আজকের দিনে প্রায় সবার হাতেই স্মার্টফোনের দেখা মেলে। এবং স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা নিজেদের প্রয়োজনেই হোক বা নিছকই বিনোদনের উদ্দেশ্যে, প্রতিদিন হরেক রকমের অ্যাপস ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, যেসব অ্যাপস ব্যবহার করছেন তার মধ্যে কোনগুলো বৈশ্বিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব ফেলছে? হোক তা ইতিবাচকভাবে কিংবা নেতিবাচকভাবে? আপনাদের হয়ত এ বিষয়ে ভেবে দেখার অবকাশ মেলেনি। তাই আপনাদের হয়ে আমরাই বলে দিচ্ছি, ২০১৭ সালের সবচেয়ে প্রভাবশালী ৬টি স্মার্টফোন অ্যাপস ছিল কোনগুলো।

কয়েন বেস

ক্রিপ্টোকারেন্সির কথা নিশ্চয়ই শুনেছেন। কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সাহায্যে আদান-প্রদান করা যায় এমন এক ধরণের ভার্চুয়াল মুদ্রাব্যবস্থা এটি, যা ক্রমশই কাগজের টাকা, চেক বা ক্রেডিট কার্ডের জায়গা দখল করে নিচ্ছে। এবং যতই দিন যাচ্ছে, ক্রিপ্টোকারেন্সির মানও হু হু করে বাড়ছে। যেমন এ বছরের শুরুতে বিট কয়েনের মান ছিল ১০০০ মার্কিন ডলারের কম। অথচ ডিসেম্বরের শুরুতে বিট কয়েনের মান দাঁড়িয়েছিল ১৯০০০ মার্কিন ডলারেরও বেশি! আবার সাম্প্রতিক সময়ে এই মান বেশ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। অর্থাৎ বুঝতেই পারছেন, ক্রিপ্টোকারেন্সিসমূহের মান কত দ্রুত বাড়ে কমে। আর এজন্যই বেস কয়েনের মত অ্যাপসের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ এই অ্যাপসের মাধ্যমেই বিভিন্ন ধরণের ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনা, বেচা বা স্থানান্তর করা হয়ে থাকে। তবে মাঝেমধ্যে এই অ্যাপস গ্রাহকদের জন্য সমস্যারও সৃষ্টি করে। যেমন ৭ ডিসেম্বর যখন হঠাৎ করে বিট কয়েনের মান বাড়তে থাকে, কিছু সময়ের জন্য সিস্টেমের দুর্বলতার কারণে বেস কয়েনের সার্ভিস বন্ধ ছিল। ফলে গ্রাহকরা তাদের একাউন্টে ঢুকে বিট কয়েন কেনা-বেচা করতে পারছিল না।

টুইটার

ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিবেচনায় ফেসবুকের ধারেকাছেও নেই টুইটার। সারা বিশ্বে প্রতি মাসে ফেসবুক ব্যবহার করে যেখানে ২ বিলিয়ন মানুষ, সেখানে টুইটার ব্যবহারকারীর সংখ্যা মাত্র ৩৩০ মিলিয়ন। তারপরও গুরুত্বের দিক থেকে টুইটারই এগিয়ে। কেননা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা প্রেরণে ফেসবুকের চেয়ে টুইটারই ব্যবহৃত হয় বেশি। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টুইটারকেই প্রধান ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাসমূহ সাধারণ মানুষকে জানানোর ক্ষেত্রে। যেমন ইউএস মিলিটারি থেকে লিঙ্গ পরিবর্তনকারীদের নিষিদ্ধ করা, মুসলিমবিরোধী ভিডিও শেয়ার করা, উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উনকে অপমান করা কিংবা তথাকথিত ভুয়া সংবাদের বিরুদ্ধে এক হাত নেয়ার কাজে তিনি টুইটারকেই কাজে লাগিয়েছেন।

অ্যামাজন কী

এতটাই অবিশ্বাস্য এই অ্যাপসের কার্যক্রম যে অক্টোবরে না পেয়ে বছরের শুরুর দিকে মুক্তি পেলে অনেকেই এটিকে ধরে নিত একটি এপ্রিল ফুলস জোক হিসেবে। এই অ্যাপসের কাজ হলো, আপনি যদি এটি ব্যবহার করেন তাহলে অ্যামাজনের ডেলিভারি ম্যান আপনার ঘরে ঢুকে আপনার অর্ডারকৃত পন্য সরবরাহ করে যাবে, এমনকি সেই সময়ে আপনি যদি বাড়িতে নাও থাকেন। এই অ্যাপস আপনাকে জানাবে যে ঠিক কোন সময়ে ডেলিভারি ম্যান আপনার পণ্য নিয়ে হাজির হবে। আর সেই সময়ে যদি আপনি বাড়িতে না থাকেন, তাহলে স্মার্ট লকের মাধ্যমে সে আপনার বাড়ির মধ্যে ঢুকে আপনার পণ্যটি নিরাপদ স্থানে রেখে যাবে। এই ধারণাটি একুশ শতকের সাথে বেশ মানানসই হলেও, অ্যামাজন কর্তৃপক্ষ হয়ত ভেবেও দেখেনি যে সাধারণ মানুষ তাদের অনুপস্থিতিতে বাড়িতে একজন অপরিচিত ব্যক্তির ঢোকার ব্যাপারে কতটা স্বস্তিবোধ করবে।

ম্যাসেঞ্জার কিডস

ফেসবুকের পক্ষ থেকে এটিকে একটি বেশ সাহসী পদক্ষেপই বলা যায়। এই অ্যাপসটি ব্যবহার করে শিশুরা (অনূর্ধ্ব ১৩) বিনামূল্যে তাদের অভিভাবক কর্তৃক অনুমোদিত ব্যক্তিদের সাথে মেসেজিং ও ভিডিও চ্যাট করতে পারবে। প্রাথমিকভাবে কেবল আইওএস অপারেটিং সিস্টেমের জন্য উন্মুক্ত করা হলেও, কয়েকদিনের মধ্যেই হয়ত এই অ্যাপসের অ্যান্ড্রয়েড সংস্করণও পাওয়া যাবে। আর তার ফলে ‘সোশ্যাল মিডিয়া এডুকেশন’ নামে যে টার্মটি এতদিন কেবল আমাদের কল্পনাতেই ছিল, সেটির হয়ত বাস্তব প্রয়োগও দেখা যাবে। এই অ্যাপস ব্যবহারের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্ম সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে বর্তমান প্রজন্মের চেয়ে অনেক বেশি সচেতনতা ও স্মার্টনেসের পরিচয় দেবে।

ফেস আইডি

সেপ্টেম্বরে অ্যাপল যখন ৯৯৯ মার্কিন ডলারের আইফোন এক্সের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিল, তখন আমরা আরও জানতে পারি তাদের নতুন ফেসিয়াল রিকগনিশন টেকনোলজির ব্যাপারে, যার নাম ফেস আইডি। অ্যাপল পণ্যসমূহের মধ্যে কেবলমাত্র আইফোনের সর্বশেষ সংস্করণেই উপলব্ধ এই টেকনোলজির কাজ হলো, এটি ফোনের সেন্সর, ক্যামেরা ও একটি ইটি-বিটি ডট প্রজেক্টরের সাহায্যে ব্যবহারকারীর মুখের একটি মানচিত্র গ্রহণ করে, এবং সেটি মিলিয়ে দেখে ফোনে ইতিমধ্যে স্টোর করে রাখা ছবির সাথে। যদি দুইটির মধ্যে পুরোপুরি সাদৃশ্য পাওয়া যায়, কেবলমাত্র তবেই সচল হয় ফোনটি। এর মাধ্যমে অ্যাপল তাদের গ্রাহকের নিরাপত্তাকে নিয়ে গেছে সম্পূর্ণ নতুন এক উচ্চতায়।

ফেসবুক

পৃথিবীর সাত বিলিয়ন মানুষের মধ্যে তিন বিলিয়ন মানুষই যে অ্যাপসটি ব্যবহার করে, সেটিকে বাদ দিলে এই তালিকা কখনোই সম্পূর্ণ হবে না। মানুষ যে শুধু তাদের পরিবার ও বন্ধুদের সাথে যুক্ত থাকতেই ফেসবুক ব্যবহার করে তা নয়। যেকোন ইস্যুতে জনমত গড়ে তোলা, মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা, মানসিকতাকে প্রভাবিত করা বা তাতে পরিবর্তন আনা থেকে শুরু করে সামাজিক বিপ্লবের সূচনা করতেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে এই ফেসবুকই। মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রার চিত্রই খোলনলচে পালটে দিয়েছে ফেসবুক। একবার চিন্তা করে দেখুন তো, যদি ফেসবুক না থাকত তাহলে আমাদের বর্তমান জীবনব্যবস্থা কতটা ভিন্ন হতো!

টেকনোলজিরিভিউ ডটকম অবলম্বনে

Comments
Spread the love