দিদিয়ের দেশম যখন ফিফা সভাপতির হাত থেকে বিশ্বকাপের ট্রফিটা তুলে উঁচিয়ে ধরেছেন, প্যারিসের স্টাডে ডি ফ্রান্স স্টেডিয়ামে তখন চিৎকারে কান পাতা দায়। জিদান-ভিয়েরা-থুরাম-পিরেজ হয়ে ট্রফিটা ঘুরছিলে এক খেলোয়াড় থেকে অন্য খেলোয়াড়ের হাতে, পরম আরাধ্য এই সোনালী ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখতে কে না চায়! ভিআইপি গ্যালারীতে তখন হাস্যোজ্জ্বল ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের পাশে দাঁড়িয়ে মিশেল প্লাতিনি- আরেক ফরাসী ফুটবল কিংবদন্তী! তার মুখটা একটু যেন মলিন। যে কীর্তি তিনি বা তার দল গড়তে পারেনি, সেটাই গড়ে ফেলেছেন জিদান-দেশমেরা! এতেই কি খানিকটা মন খারাপ হলো তার? নাকি এই মলিন মুখের পেছনে রয়েছে অন্য কোন রহস্য?

ফরাসীরা হয়তো ভাবতেও পারেনি, অনেকগুলো বছর পরে এই মিশেল প্লাতিনির মুখ থেকেই অপ্রিয় কিছু সত্যি কথা বেরিয়ে আসবে। সাংবাদিকদের সামনে উয়েফা সভাপতি প্লাতিনি স্বীকার করবেন, ফ্রান্সের ১৯৯৮ বিশ্বকাপ আয়োজনের পুরো প্রক্রিয়াটাই ছিল ত্রুটিপূর্ণ, ফাইনালে ওঠার রাস্তা সুগম করতে কপট এক জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছিল তারা! শিরোপা নিয়ে উল্লাস করতে থাকা ফ্রান্সের জাতীয় দলের অনেক খেলোয়াড়ও জানতেন না, তাদের এই অবিস্মরণীয় অর্জনের পেছনে লুকিয়ে আছে অসততার একটা গল্প!

১৯৯৮ বিশ্বকাপ ফুটবল, মিশেল প্লাতিনি, ফ্রান্স, ব্রাজিল, রোনালদো

সেই বিশ্বকাপে ব্রাজিল এসেছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। দুঙ্গা, রোমারিও, রিভালদো, রবার্তো কার্লোসদের দলটার মধ্যমণি হয়ে ছিলেন একুশ বছর বয়সী এক তরুণ, ওই বয়সেই যিনি দুইবার জিতে নিয়েছিলেন ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার, নাম তার রোনালদো লুইজ নাজারিও ডি লিমা। ব্রাজিলের সেই দলটা ছিল মোটামুটি অজেয়। আর এই দলটাকে এড়িয়ে যেতেই কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল ফ্রান্স।

বত্রিশ দলের বিশ্বকাপ, আটটা গ্রুপের প্রতিটায় চারটা করে দল। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের জায়গা হয়েছিল এ-গ্রুপে, আর স্বাগতিক ফ্রান্সের অবস্থান ছিল সি-গ্রুপে। বিশ্বকাপের ফিকশ্চারটা এমনভাবে সেট করা হয়েছিল, যাতে ফাইনালের আগে ফ্রান্সকে ব্রাজিলের মুখোমুখি না হতে হয় কোনভাবেই। মুখোমুখি লড়াইতে ব্রাজিলকে হারানোর আত্মবিশ্বাস হয়তো ফ্রান্সের ফুটবল সংশ্লিষ্টদের ছিল না, এ কারণেই এধরণের জোচ্চুরির আশ্রয় নেয়া। অথচ ব্রাজিল দলটা কিন্ত একদমই অজেয় ছিল না। গ্রুপপর্বে নরওয়ে ওদের হারিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল সেটা।

১৯৯৮ বিশ্বকাপ ফুটবল, মিশেল প্লাতিনি, ফ্রান্স, ব্রাজিল, রোনালদো

গ্রুপ-দ্বিতীয় রাউন্ড-কোয়ার্টার-সেমিফাইনাল পেরিয়ে ফাইনালে মুখোমুখি ব্রাজিল আর ফ্রান্স! স্বাগতিক বনাম সবশেষ আসরের চ্যাম্পিয়ন। ১২ই জুলাই ১৯৯৮, ধ্রুপদী এক লড়াইয়ের জন্যে প্রস্তত প্যারিস। বেশীরভাগ ফুটবলবোদ্ধা ব্রাজিলের পঞ্চম শিরোপা জয় দেখতে পাচ্ছিলেন তখনই। অথচ ম্যাচের আগেই কিনা শুরু হলো নাটক!

ব্রাজিলের ম্যানেজার তখন মারিও জাগালো। পেলের সতীর্থ এই ভদ্রলোক ফাইনালের দিন সকালে টিমশিট ঘোষণা করলেন, সেখানে নেই রোনালদোর নাম! খবরটা দাবানলের মতো ছড়ালো! দলের সবচেয়ে বড় তারকা ফাইনালে নেই! এটা কিভাবে সম্ভব! টুর্নামেন্টে তখন পর্যন্ত চার গোলের মালিক রোনালদো, হল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালেও গোল করেছেন, আবার পেনাল্টি শুটআউটেও লক্ষ্যভেদ করেছেন! সেই খেলোয়াড় বাদ পড়লেন কেন?

১৯৯৮ বিশ্বকাপ ফুটবল, মিশেল প্লাতিনি, ফ্রান্স, ব্রাজিল, রোনালদো

প্রথমে জানানো হলো হাঁটুর চোটে আক্রান্ত রোনালদো। কিন্ত দলের ভেতর থেকেই বলা হলো, রোনালদো নিজেই নাকি খেলতে চাইছেন, তিনি পুরো ফিট। এবার বলা হলো রোনালদোর পেটে সংক্রমণ হয়েছে! ক্রীড়া সাংবাদিকদের মিলনমেলা তখন প্যারিসের স্টাডে ডি ফ্রান্স। সবাই জানতে চায়, কি হলো রোনালদোর?

টিম লিস্ট বদলানো হলো, একজনকে বাদ দিয়ে ঢোকানো হলো রোনালদোর নাম! এমন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে এহেন নাটক ফুটবলবিশ্ব এর আগে দেখেছে কিনা জানা নেই কারোই। ফাইনালটা হলো একপেশে, ব্রাজিলকে ০-৩ গোলে উড়িয়ে দিলো ফ্রান্স। জিদান করলেন জোড়া গোল, ৯৩ মিনিটে ব্রাজিলের কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকে দিলেন পেটিট। রোনালদো মাঠেই ছিলেন, কিন্ত প্রায় অদৃশ্য হয়ে। বলের ধারেকাছে দেখা যায়নি তাকে, ক্ষুধার্ত সেই রূপটা ছিল অনুপস্থিত। উল্টো ফরাসী গোলরক্ষক ফ্যাবিয়ান বার্থেজের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে!

১৯৯৮ বিশ্বকাপ ফুটবল, মিশেল প্লাতিনি, ফ্রান্স, ব্রাজিল, রোনালদো

সেই বিশ্বকাপ ফাইনালের বেশ কয়েক বছর বাদে মিশেল প্লাতিনি বসেছিলেন ইউরোপিয়ান ফুটবলের দণ্ডমুণ্ডের কর্তার আসনে, হয়েছিলেন উয়েফার সভাপতি। সেই চেয়ারে বসেই প্লাতিনি স্বীকার করেছিলেন, ১৯৯৮ বিশ্বকাপ আয়োজনে স্বাগতিক হিসেবে ব্রাজিলকে এড়াতে বাড়তি সুবিধা নিয়েছিল ফ্রান্স। প্লাতিনি তো সেই বিশ্বকাপের আয়োজক কমিটির অন্যতম সদস্যও ছিলেন! এটুকুতে থামলেও ঠিক ছিল, প্লাতিনি এমনটাও বলেছেন যে, সেই বিশ্বকাপটা ফ্রান্সকে ছেড়ে দিতে নাকি ফিফার পক্ষ থেকেই অনুরোধ করা হয়েছিল ব্রাজিলকে! পরের বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে জেতানোর ব্যাপারে সহযোগিতা করা হবে- এমন আশ্বাস পেয়েই নাকি ফাইনালে হালকা মেজাজে খেলেছিল ব্রাজিল! ফাইনালের একাদশ থেকে প্রথমে রোনালদোকে বাদ দেয়ার কারণও নাকি এটাই ছিল!

প্লাতিনির বক্তব্যের কতখানি বিশ্বাসযোগ্য, আর কতখানি ভুয়া সেটা নিয়ে তর্ক করাই যায়। তবে সত্যিটা হচ্ছে, জাপান-কোরিয়ায় আয়োজিত পরের বিশ্বকাপটা (২০০২) কিন্ত ঘরে তুলেছিল ব্রাজিল! আর সেবার ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের বিদায়ঘন্টা বেজেছিল প্রথম রাউন্ড থেকেই!

তথ্যসূত্র কৃতজ্ঞতা- দ্য গার্ডিয়ান, গোল ডটকম।

*

এখন ঘরে বসেই অনলাইনে কিনুন ক্যাসপারস্কি ল্যাবের সব পণ্য, খুব সহজে। অনলাইনে পেমেন্ট, অনলাইনেই ডেলিভারি!

Comments
Spread the love