খেলা ও ধুলারাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮

বিশ্বকাপে ‘ম্যাচ ফিক্সিং’ হয়েছিল যে ম্যাচে!

দুয়ারে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপ। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। তারপরই পর্দা উঠবে দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থের। ইতিমধ্যেই নিশ্চয়ই এবারের বিশ্বকাপের ফিক্সচার অন্তত একবার হলেও নেড়েচেড়ে দেখেছেন সকল পাঠক। এবং সেখানে একটি বিশেষ জিনিস নিশ্চিতভাবেই দৃষ্টি আকর্ষণ করার কথা আপনাদের। সেটি হলো, গ্রুপ পর্বের প্রথম চারটি ম্যাচ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হলেও, শেষ দুইটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে অভিন্ন সময়ে। অর্থাৎ একই সময়ে দুইটি পৃথক ভেন্যুতে একইসাথে খেলতে থাকবে প্রতি গ্রুপের চারটি দল।

কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, কেন এমনটি করা হয়ে থাকে? ১৯৮২ এর বিশ্বকাপ পর্যন্ত কিন্তু এমন কোন নিয়ম ছিল না। ১৯৮৬ সালেই ফিফা প্রথম সিদ্ধান্ত নেয় প্রতি গ্রুপের শেষ দুইটি ম্যাচ একই সাথে আয়োজন করার। ফিফা কর্তৃক গৃহীত এমন সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা ছিল ১৯৮২ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের একটি ম্যাচের, যেটিকে মনে করা হয় গোটা বিশ্বকাপ ইতিহাসেরই সবচেয়ে বিতর্কিত ম্যাচ। আজ আপনাদেরকে বলব সেই বিতর্কিত ম্যাচটিরই গল্প।

বিতর্কিত সেই ম্যাচের দুই অংশগ্রহণকারী দল ছিল পশ্চিম জার্মানী ও অস্ট্রিয়া। তবে সরাসরি সেই ম্যাচে অংশ না নিয়েও, অন্তরালে থেকে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছিল যে দলটি, সেটি হলো আলজেরিয়া। প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ খেলতে এসে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই যারা স্তব্ধ করে দিয়েছিল পশ্চিম জার্মানীকে। এবং সেটিকেও বলা চলে বিশ্বকাপ ইতিহাসেরই অন্যতম বড় একটি দুর্ঘটনা।

কেননা একদিকে যেখানে আলজেরিয়া নামের নিতান্তই অজানা, অপরিচিত একটি দল, তার বিপরীতে ছিল তৎকালীন সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে ভয় ধরানো দল পশ্চিম জার্মানী, যারা মাত্র বছর দুই আগেই ১৯৮০ ইউরোতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে গিয়েছিল বিশ্বজয়ের স্বপ্ন নিয়ে। এবং সেই মিশনে প্রথম ম্যাচে তাদের সামনে দাঁড়ানো আলজেরিয়াকে তারা বলা চলে একদমই আমলে নেয়নি। ভেবেছে একদম বুঝিয়ে হেসেখেলেই উড়িয়ে দেয়া যাবে আফ্রিকান দলটিকে। এমনকি ম্যাচ শুরুর আগেও পশ্চিম জার্মানীর এক খেলোয়াড় আলজেরিয়ানদের সামনে গিয়ে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেছিলেন, তাঁরা নাকি মাঠে নেমে সিগার ফুঁকতে ফুঁকতে খেলবেন, কিন্তু তবু জিতে যাবেন! আরেক খেলোয়াড় বলেছিলেন, তাঁরা সপ্তম গোলটি উৎসর্গ করবেন তাঁদের স্ত্রীদেরকে, এবং অষ্টম গোলটিকে তাঁদের কুকুরদেরকে।

অর্থাৎ বুঝতেই পারছেন ঠিক কতটা আত্মবিশ্বাসী ছিল পশ্চিম জার্মানী শিবির এই ম্যাচের প্রাক্কালে। এবং তাদের আত্মবিশ্বাসের পারদ এতটাই চড়ে গিয়েছিল যে, তারা আলজেরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নেমে গিয়েছিল কোন রকম হোমওয়ার্ক ছাড়াই। কারণ তাদের কাছে মনে হয়েছিল, আলজেরিয়ার মত পুঁচকে দলের বিপক্ষে ম্যাচের আগে তাদের খেলার ভিডিও টেপ চালিয়ে দেখাটা সময়ের অপচয় বৈ কিছুই না। কিন্তু মাঠের খেলায় বদলে যায় সব হিসাব-নিকাশ। আলজেরিয়া শুরু থেকে আধিপত্য বিস্তার করে খেলে, আর ম্যাচটিও জিতে নেয় ২-১ গোলের ব্যবধানে। এর মাধ্যমে রচিত হয় নতুন ইতিহাস। চার বছর আগ পর্যন্ত কোন আফ্রিকান দলই বিশ্বকাপে এসে কোন ম্যাচ জিততে পারেনি। ১৯৭৮ বিশ্বকাপে তিউনিসিয়া প্রথম ৩-১ গোলে হারিয়েছিল মেক্সিকোকে। আর তার চার বছর পরই কিনা আলজেরিয়ার মত একটি দল হারিয়ে দেয় বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দলটিকে!

গ্রুপ পর্বের পরের দুইটিকে ম্যাচে আবার ভিন্ন রকম ফলাফলের দেখা মেলে। জার্মানরা আলজেরিয়াকে যেমন হেলাফেলা করেছিল, অস্ট্রিয়া তা করেনি মোটেই। ম্যাচের আগে বেশ ভালো রকম হোমওয়ার্কই তারা করে এসেছিল আফ্রিকান দলটির ব্যাপারে। আর তার ফলও তারা পেয়েছিল হাতেনাতে। পেয়ে যায় ২-০ ব্যবধানের এক অনায়াস জয়। অন্যদিকে জার্মানী ঘুরে দাঁড়ায় তাদের প্রথম ম্যাচের ব্যর্থতা থেকে, এবং ৪-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দেয় চিলিকে।

গ্রুপ পর্বের শেষ দুই ম্যাচের একটিতে আলজেরিয়ার খেলার কথা চিলির বিপক্ষে। আর অন্যটিতে পশ্চিম জার্মানির প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়া। প্রথমে হয় আলজেরিয়া-চিলি ম্যাচটি, ২৪ জুন। সে ম্যাচে ৩-২ ব্যবধানে জয় পায় আলজেরিয়া। তাতে করে তিন ম্যাচের দুইটিতে জয়ের সুবাদে চার পয়েন্ট নিয়ে (তখন প্রতি জয়ে দুই পয়েন্ট করে পাওয়া যেত) সাময়িকভাবে গ্রুপের শীর্ষস্থানটির দখল নিয়ে নেয় তারা। কিন্তু তখনও নিশ্চিত হয়নি তাদের পরের রাউন্ডের টিকিট। সেজন্য তাদের অপেক্ষা করতে হতো ২৪ ঘন্টা পর অনুষ্ঠিতব্য পশ্চিম জার্মানী-অস্ট্রিয়া ম্যাচটির ফলাফলের উপর।

আলজেরিয়ার জন্য সমীকরণটি ছিল এমন যে তাদের পরের রাউন্ডে উঠতে হলে অস্ট্রিয়ার জয় কামনা করতে হবে, কিংবা ম্যাচটি যাতে ড্র হয় সে আশা করতে হবে। তাহলে বি গ্রুপ থেকে অস্ট্রিয়ার সঙ্গী হিসেবে পরের রাউন্ডে যাবে তারাই। কিংবা পশ্চিম জার্মানী যদি ৩-০ বা তারচেয়ে বড় ব্যবধানে জয় পায়, তাহলে ছিটকে যাবে অস্ট্রিয়া, আর পরের রাউন্ডে উঠবে পশ্চিম জার্মানী আর আলজেরিয়াই। কিন্তু এ ম্যাচে যদি পশ্চিম জার্মানী জেতে আর তাদের জয়ের ব্যবধান হয় মাত্র এক বা দুই গোলের, তবে বি গ্রুপ থেকে পরের রাউন্ডের টিকিট পাবে পশ্চিম জার্মানী আর অস্ট্রিয়া।

আলজেরিয়ানদের আশা অমূলক ছিল না মোটেই। কেননা তারা নিজেরাই পশ্চিম জার্মানীকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে যে ইউরো চ্যাম্পিয়নরা আর যাই হোক, একেবারে অজেয় নয়। অন্যদিকে অস্ট্রিয়াও এই দলটিকেই আগের বিশ্বকাপের রাউন্ড অফ সিক্সটিনে হারিয়েছিল ৩-২ ব্যবধানে। সবমিলিয়ে বেশ জমজমাট একটি লড়াইয়েরই অপেক্ষা করে ছিল ফুটবল বিশ্ব।

পশ্চিম জার্মানী অবশ্যই তেঁতে ছিল আগের বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার কাছে হারের বদলা নিতে, এবং সেজন্য শুরু থেকেই চড়াও হয়ে খেলতে শুরু করে তারা। তার প্রতিদান তারা পেয়ে যায় মাত্র দশ মিনিটের মাথায়ই। ১-০’তে এগিয়ে যায় তারা। প্রথম দশ মিনিট পশ্চিম জার্মানীর খেলা দেখে মনে হয়েছিল, এই ম্যাচে তাদের পক্ষে অস্ট্রিয়াকে তিন বা তার বেশি গোলের ব্যবধানে হারিয়ে দেয়াটা কোন ব্যাপারই না। অন্যদিকে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে যেহেতু শেষ কথা বলে কিছু নেই, তাই অস্ট্রিয়ার পক্ষেও পিছন থেকে এসে ম্যাচটি নিজেদের করে নেয়া একেবারে অসম্ভব কিছু ছিল না।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ ম্যাচে যা হলো, তার জন্য প্রস্তুত ছিল না কেউই। মাঠের ফুটবলের চেয়ে বড় হয়ে গেল পরের রাউন্ডে উত্তোরণ আর তার নিমিত্তে গাণিতিক হিসাব-নিকাশ। যেহেতু ১-০’তে এগিয়ে আছে পশ্চিম জার্মানী, এই অবস্থায় ম্যাচ শেষ হলে পরের রাউন্ডে উঠতে পারবে তারা এবং অস্ট্রিয়া – দুই দলই। সেই কারণেই কিনা, দুই দলই পুরোপুরি গা ছেড়ে দিল। মোটামুটি ঠিকই করে নিল যে স্রেফ নিয়মরক্ষার জন্য খেলে যাবে ম্যাচের বাকি সময়, কিন্তু কখনোই আক্রমণ করবে না একে অপরকে। পরের ৮০ মিনিট ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক অধ্যায়ের জন্ম দিল দল দুইটি। মাঠের মাঝে ছেলেখেলা করতে লাগল তারা। যেন বলে শট নিতে হবে বলেই শট নেয়া। অথচ শরীরি ভাষায় বিন্দুমাত্র ছাপ নেই খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতার। আর একটিবারের জন্যও গোলের চেষ্টা করল না দল দুইটি। এবং তারা যে ম্যাচটি পাতিয়েছে, সে সত্যটি ঢাকারও বিন্দুমাত্র প্রয়াস দেখা গেল না তাদের মধ্যে।

মাঠে খেলা দেখতে উপস্থিত দর্শকরা তৎক্ষণাৎ তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করল উচ্চকণ্ঠে। টিভিতে ধারাভাষ্যকাররা দর্শকদের অনুরোধ করতে থাকলেন চ্যানেল পাল্টে ফেলার জন্য। জার্মান চ্যানেল এআরডির হয়ে ধারাভাষ্য দিতে থাকা এবারহার্ড স্টানিয়েক তো কেঁদেই দিলেন বলা চলে। কাঁদতে কাঁদতেই তিনি বললেন, ‘এই মুহূর্তে মাঠে যা ঘটছে তা ফুটবলের জন্য চরম লজ্জাজনক একটি বিষয়। আপনারা যার যা খুশি বলতে পারেন, কিন্তু তাতেও হয়ত আদতে এই ঘটনা সম্পর্কে পুরোপুরি কিছু বলা হবে না। অস্ট্রিয়ান ধারাভাষ্যকার তো শেষ আধা ঘন্টা আর মুখই খুললেন না।

এভাবেই শেষ হলো ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিট। এক পাতানো ম্যাচে ১-০ ব্যবধানে জয় পেল পশ্চিম জার্মানী, যার সুবাদে পরের রাউন্ডে উঠে গেল ম্যাচের জয়ী-বিজিত দুই দলই। অপরদিকে কপাল পুড়ল আলজেরিয়ার। এই ম্যাচের পরে পশ্চিম জার্মানীর সাবেক খেলোয়াড় উইলি স্কালজ বর্তমান দলটির প্রত্যেককে অভিহিত করেন ‘গ্যাংস্টার’ নামে। কিন্তু সেই গ্যাংস্টাররা কিন্তু একদমই অনুতপ্ত হননি নিজেদের কৃতকর্মে। পশ্চিম জার্মানীর সমর্থকেরা যখন টিম হোটেলের বাইরে গিয়ে ভিড় জমায় প্রতিবাদ জানাতে, খেলোয়াড়রা ব্যালকনি থেকে পানি ছুঁড়ে মারে তাদের দিকে। অস্ট্রিয়া তো আরও এক কাঠি বাড়া। তাদের ডেলিগেশন হেড হ্যান্স সচ্যাক ম্যাচ শেষে বলেন, ‘আজকের ম্যাচটি খেলা হয়েছে পুরোপুরি কৌশলগত দিক থেকে। এখন মাঠে উপস্থিত হাজার দশের “মরুভূমির পুত্র” যদি এটি নিয়ে স্ক্যান্ডাল তৈরি করতে চায়, তবে এটাই ধরে নিতে হবে যে তাদের দেশে পর্যাপ্ত স্কুল নেই।’

আলজেরিয়ার খেলোয়াড়রা কি এমন মন্তব্যে অপমানিত হয়েছিলেন? কিংবা ক্রোধে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন পশ্চিম জার্মানী-অস্ট্রিয়া ম্যাচটির এমন প্রতারণামূলক ফলাফলে? মোটেই না। পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে আলজেরিয়ার সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ জয়ের নায়ক ও ম্যাচসেরা ফুল-ব্যাক চাবানে মারজিকেন বিতর্কিত ম্যাচটির স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, ‘আমরা একদমই রেগে যাইনি। আমরা যথেষ্ট শান্ত ছিলাম। বড় বড় দুইটি দল আমাদেরকে টুর্নামেন্ট থেকে বের করে দেয়ার জন্য এমন কৌশল অবলম্বন করছে, এই বিষয়টি আলজেরিয়ার জন্য অনেক বড় গৌরবের বিষয় ছিল। তারা হয়ত পরের রাউন্ডে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু মাথা হেঁট করে। অথচ আমরা মাথা উঁচু করে সম্মানের সাথেই বিদায় নিতে পেরেছিলাম।’

এই ঘটনার পর বিশ্বের সকল ফুটবলপ্রেমীরা সরব হয়, ফিফার কাছে দাবি জানায় পশ্চিম জার্মানী ও অস্ট্রিয়াকে শাস্তি দেয়ার, অথবা আবারও ম্যাচটি আয়োজন করার। কিন্তু ফিফা এই দুই দাবির একটিও পূরণ করেনি। তবে গণদাবির মুখে তারা একটি পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়, সেটি হলো বিশ্বকাপে প্রতি গ্রুপের শেষ দুইটি ম্যাচ একই সময়ে আয়োজনের, যাতে করে পশ্চিম জার্মানী-অস্ট্রিয়ার মত আর কোন পাতানো ম্যাচের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

*

এখন ঘরে বসেই অনলাইনে কিনুন ক্যাসপারস্কি ল্যাবের সব পণ্য, খুব সহজে। অনলাইনে পেমেন্ট, অনলাইনেই ডেলিভারি!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close