বিশ্বকাপের প্রথম তিনটি আসর পরপর অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩০, ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে। চার বছর অন্তর বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবার ঐতিহ্য চলছিল বেশ ভালোভাবেই। কিন্তু এরপরই ছন্দপতন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ আর ১৯৪৬ সালে বাতিল হয় পরিকল্পিত দুইটি বিশ্বকাপ। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রেশ পুরোপুরি কাটতে না কাটতেই, ১৯৪৯ সালেই চতুর্থ বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য উঠেপড়ে লাগে ফিফা। কিন্তু কোথায় অনুষ্ঠিত হবে এই বিশ্বকাপ?

ইউরোপের দেশগুলো তখনও বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সঙ্গত কারণেই তাদের পক্ষে বিশ্বকাপের মত এত বড় একটি টুর্নামেন্ট আয়োজনের আর্থিক সঙ্গতি ছিল না। তাছাড়া অনেক দেশ তো এমনকি বিশ্বকাপের চতুর্থে আসরে অংশ নেবে না বলেই জানিয়ে দেয়। সবমিলিয়ে হুমকির মুখে পড়ে যায় ১৯৪৯ বিশ্বকাপের ভবিষ্যৎ।

অনেকেই মনে করেছিলেন, আগের দুই আসরের মত এবারও বুঝি শেষমেষ ভেস্তে যাবে বিশ্বকাপ। কিন্তু ১৯৪৬ সালে ফিফার ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় একটি দেশ, যে দেশের মানুষের কাছে ফুটবলই ধ্যানজ্ঞান, ফুটবলই পুরো একটি ধর্ম। যে দেশের মানুষ ফুটবলে হাসে, ফুটবলে বাঁচে। সেই দেশটি হলো ব্রাজিল।

লুক্সেমবার্গের ফিফা কংগ্রেসে ব্রাজিল প্রস্তাব রাখে যে পরবর্তী বিশ্বকাপটির আয়োজক দেশ হতে পারে তারা, কিন্তু একটি শর্তে। তা হলো, বিশ্বকাপটি ১৯৪৯ সালের পরিবর্তে ১৯৫০ সালে অনুষ্ঠিত হবে। পরবর্তী চার বছরের মধ্যে নিজেদের প্রস্তুত করে নেবে তারা বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য। আর কোন উপায় না দেখে অগত্যা ব্রাজিলের প্রস্তাবেই সায় জানিয়ে দেয় ফিফা। আর তখন থেকেই কাজ শুরু করে দেয় ব্রাজিল সরকার। শুধু বিশ্বকাপকে সামনে রেখেই তারা নির্মাণ করে মারাকানার মত তৎকালীন সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম।

১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ তাদের কাছে পরিণত হয় একটি প্রেস্টিজ ইস্যুতে। আর এই টুর্নামেন্ট জেতা ন্যাশনাল প্রায়োরিটি। সফলভাবে এই টুর্নামেন্টের আয়োজন, আর শেষমেষ বিজয়ীর ট্রফি নিজেদের করে নেয়ার মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিশ্বের নতুন পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চেয়েছিল ব্রাজিল। আর এজন্য তারা ফুটবলকে প্রধান ঢাল হিসেবে বেছে নিয়েছিলও যুক্তিসঙ্গত কারণেই। ফুটবলের মত আর কিছুই যে ব্রাজিলের মানুষকে এতটা ঐক্যবদ্ধ করতে পারে না!

যাইহোক, বুঝতেই পারছেন ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ জেতা ব্রাজিলিয়ানদের জন্য এক প্রকার অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গোটা দেশটির ভাগ্যই যেন নির্ভর করছিল তাদের ফুটবল দলটির উপর। আর সেই দলটিও জাতীয় ডাকে বেশ ভালোই সাড়া দিতে পেরেছিল। খেলেছিল বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটিও।

অবশ্য সেই ম্যাচটিকে আদৌ ফাইনাল বলা চলে কি না এ নিয়েই তর্ক জুড়ে দিতে পারেন অনেকে। কেননা উরুগুয়ের বিপক্ষে মারাকানায় অনুষ্ঠিত সেই ফাইনালটি আদতে অফিসিয়াল কোন ফাইনাল ছিল না। এবং ১৯৫০ এর আসরটিও এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের একমাত্র সংস্করণ যেখানে প্রকৃত অর্থে কোন ফাইনাল ম্যাচ ছিল না।

আসলে সেবারকার টুর্নামেন্টের ফরম্যাটটাই যে ছিল বড্ড বিদঘুটে। প্রাথমিকভাবে ১৬টি দলের অংশ নেয়ার কথা ছিল বিশ্বকাপে। তাদেরকে চারটি আলাদা গ্রুপে ভাগ করে দেয়া হয়। প্রতি গ্রুপের চার দল নিজেদের মধ্যে একবার করে খেলবে। এর মাধ্যমে প্রতি গ্রুপ থেকে সেরা হবে যে চারটি দল, তাদের নিয়ে গঠিত হবে একটি ফাইনাল গ্রুপ। এবং সেই গ্রুপের চার দল আবারও নিজেদের মধ্যে একবার করে মোট তিনটি ম্যাচ খেলবে, আর শেষ পর্যন্ত যে দলের পয়েন্ট সবচেয়ে বেশি হয়, তারাই ঘোষিত হবে আসরের সেরা দল হিসেবে।

শেষমেষ অবশ্য ১৬টি দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়নি ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপটি। এ বিশ্বকাপে খেলার জন্য মনোনীত হয়েও বিভিন্ন কারণে নাম প্রত্যাহার করে নেয় তিনটি দেশ – ভারত, স্কটল্যান্ড ও তুরস্ক। ফ্রান্সেরও পরে খেলা কথা ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ায় তারাও। তাই ১৩টি দেশ নিয়েই বিশ্বকাপ আয়োজন করে ফিফা। তবে ফরম্যাট সেই আগের মতই থাকে। গ্রুপ ১ ও ২-এ মোট চারটি করে দল, গ্রুপ ৩-এ তিনটি দল আর গ্রুপ ৪-এ দুইটি দল।

ব্রাজিল ছিল গ্রুপ ১-এ। তাঁদের গ্রুপসঙ্গী হিসেবে ছিল যুগোস্লাভিয়া, সুইজারল্যান্ড ও মেক্সিকো। ২৪ জুন নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলে স্বাগতিক ব্রাজিল। মেক্সিকোকে ৪-০ ব্যবধানে হারিয়ে দিয়ে আসরে নিজেদের যাত্রার শুভ সূচনা করে তারা। ২৮ জুন পরের ম্যাচে অবশ্য হোঁচট খায়। সুইজারল্যান্ডের সাথে ম্যাচে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে ব্যর্থ হয় তারা। ২-২ গোলে ড্র হয় ম্যাচটি। অবশ্য ১ জুলাই গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে আবারও দারুণভাবে প্রত্যাবর্তন করে তারা। যুগোস্লাভিয়াকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে গ্রুপ ১ এর সেরা দল হিসেবে নিশ্চিত করে ফাইনাল গ্রুপের টিকিট। অন্য তিন গ্রুপ থেকে গ্রুপ সেরা হিসেবে ফাইনাল গ্রুপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে যথাক্রমে স্পেন, সুইডেন ও উরুগুয়ে।

ফাইনাল গ্রুপের প্রথম দুই ম্যাচে দেখা মেলে এক অনন্য সাধারণ ব্রাজিল দলের। এ যেন এক বেপরোয়া, বিধ্বংসী ব্রাজিল দল। তাদের সামনে যারাই আসবে, কচুকাটা হওয়াই যেন তাদের নিয়তি। বাস্তবিক হয়েছিলও তা-ই। ৯ জুলাই নিজেদের ফাইনাল গ্রুপের প্রথম ম্যাচে তারা ৭-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দেয় সুইডেনকে। ১৩ জুলাই পরের ম্যাচে ছেলেখেলা করে স্পেনের সাথেও। এবার অবশ্য জয়ের ব্যবধান ৬-১। সবমিলিয়ে ফাইনাল গ্রুপের প্রথম দুই ম্যাচে পূর্ণ দুই পয়েন্ট করে তাদের ঝুলিতে যোগ হয়ে চার পয়েন্ট। সেই সাথে মাত্র দুইটি গোল হজমের বিপরীতে তারা প্রতিপক্ষের জালে জড়ায় ১৩টি গোল।

১৬ জুলাই রিও ডি জানেইরোর মারাকানায় উরুগুয়ের বিপক্ষে ব্রাজিলের শেষ ম্যাচ। উরুগুয়েও তাদের মতই ফাইনাল গ্রুপের প্রথম দুই ম্যাচে অপরাজিত। স্পেনের সাথে কোন রকমে ২-২ গোলে ড্র করার পর সুইডেনের বিপক্ষে তারা পেয়েছিল ৩-২ ব্যবধানের জয়। তাই উরুগুয়ে-ব্রাজিল ম্যাচের সমীকরণ ছিল খুবই সহজঃ যে দল জিতবে, বিশ্বকাপও হবে তাদেরই। তবে ম্যাচটি যদি ড্র হয়, সেক্ষেত্রে আসরের বিজয়ী দল ব্রাজিলই। কারণ এক ম্যাচ ড্র করার সুবাদে ইতিমধ্যেই তাদের থেকে এক পয়েন্টে পিছিয়ে ছিল উরুগুয়ে।

অবশ্য এই ম্যাচে জয় ভিন্ন অন্য কোনকিছুই যেন মাথায় ছিল না ব্রাজিলিয়ানদের। কেনই বা থাকবে! আগের দুই ম্যাচে অমন পারফরম্যান্স দেখানো দলটির কাছ থেকে জয় ছাড়া অন্য কিছু আশা করা কি তাদের সামর্থ্যকেই খাটো করে দেখার সামিল নয়? সেজন্যই কিনা, ২ লক্ষেরও বেশি (অফিসিয়াল হিসাব অনুযায়ী অবশ্য ১ লক্ষ ৭৪ হাজার) দর্শক হাজির হয়েছিল সেদিন মারাকানায় ইনভিন্সিবল ব্রাজিলের প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ জয়ের সাক্ষী হতে।

জয়ের ব্যাপারে ব্রাজিলিয়ানরা এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল যে ম্যাচ শুরুর আগে থেকেই মাঠের পাশে মজুদ ছিল একটি সাম্বা ব্যান্ড, ম্যাচ শেষ হওয়া মাত্রই তারা ধরবে ‘ব্রাজিল দ্য উইনার্স’ নামের একটি গান। স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো তো আরও এক কাঠিবাড়া। বল মাঠে গড়ানোর আগেই তারা প্রকাশ করে দিয়েছিল পরবর্তী দিনের পত্রিকার অগ্রিম সংস্করণ, যেখানে ব্রাজিলকে অভিহিত করা হয়েছিল ‘চ্যাম্পিয়নস অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ হিসেবে।

কিন্তু দিনশেষে মারাকানায় যে দৃশ্যের অবতারণা ঘটল, তার জন্য প্রস্তুত ছিল না কেউই। ম্যাচের ৪৫তম মিনিটে ফ্রিয়াকার গোলে ব্রাজিল এগিয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু ৬৬তম মিনিটে উরুগুয়ের শিয়াফিনোর পা থেকে আসে সমতাসূচক গোলটি। আর ৭৯ মিনিটে আরও একবার ব্রাজিলের জালে বল জড়ান ঘিগিয়া, যা আজও যেন সূঁচ হয়ে বিঁধে ব্রাজিলিয়ানদের মনে। কারণ পরের ১১ মিনিটে শত চেষ্টা করেও ম্যাচে ফিরতে পারেনি স্বাগতিকরা। ফলে গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়ে, এবং আক্ষরিক অর্থেই গোটা মারাকানাকে স্তব্ধ ও অশ্রুসিক্ত করে দিয়ে অবিশ্বাস্য এক জয় তুলে নেয় প্রথম বিশ্বকাপের বিজয়ী দল উরুগুয়ে। আরও একবার বিশ্বসেরার মুকুট ওঠে তাদের মাথায়। কিন্তু এ এমনই এক জয়, যা এমনকি উরুগুয়ের খেলোয়াড়দেরও হজম করতে বড্ড কষ্ট হচ্ছিল। তারা যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে ব্রাজিলকে তাদেরই ডেরা মারাকানায় হারিয়ে দিয়ে বিশ্বজয় করে নিয়েছে তারা। তাই তো ম্যাচ শেষে বিজয়ী দল হিসেবে তারা গোটা মাঠ প্রদক্ষিণ করে ল্যাপ অফ অনার দিলেও, তাতে যেন ঠিক প্রাণ ছিল না। এতটাই হতবিহবল, বিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন তারা।

অবশ্য উরুগুয়ের এমন প্রতিক্রিয়া তো বিজয়ের অবিশ্বাসে। ব্রাজিলিয়ান শিবিরে তখন সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। তারা যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না যে ‘জিতে গেছি’ হিসেবে ধরে নেয়া ম্যাচটিই তারা হেরে গেছেন। মারাকানায় উপস্থিত দুই লক্ষাধিক ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের প্রত্যেককে দেখেই তখন মনে হচ্ছিল, তাদের প্রাণপাখি বুঝি খাঁচাছাড়া হয়ে গেছে। সামগ্রিকভাবে ধরতে গেলেও মারাকানায় সেদিন মঞ্চস্থ হয়েছিল যে ট্র্যাজেডি উপাখ্যানের, তার সাথে বোধহয় তুলনা করা যাবে না ক্রীড়া দুনিয়ার আর কোন হতাশা বা ব্যর্থতাকেই। এরপরে পাঁচ-পাঁচবার বিশ্বকাপ ট্রফিতে চুমু খেলেও এখন অবধি ব্রাজিলিয়ানরা ভুলতে পারেনি মারাকানার সেই করুণ ইতিহাসকে, যার নামকরণ তারা করেছে ‘মারাকানাজো’।

কে জানে, সেদিন মারাকানায় ব্রাজিল জিতলে, কিংবা নিদেনপক্ষে ড্র করে বিশ্বকাপ জয় করতে পারলে তাদের শোকেসে আজ পাঁচটির বদলে ছয়টি বিশ্বকাপই শুধু থাকত না, বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসও হয়ত ভিন্নভাবে লেখা হতো, যেখানে ব্রাজিলের নামের পাশে থাকত বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তির তকমা।

*

এখন ঘরে বসেই অনলাইনে কিনুন ক্যাসপারস্কি ল্যাবের সব পণ্য, খুব সহজে। অনলাইনে পেমেন্ট, অনলাইনেই ডেলিভারি!

Comments
Spread the love