সিনেমা হলের গলি

আবারও আসছে ‘থার্টিন রিজনস হোয়াই’!

হাইস্কুল-পড়ুয়া টিনেজার ক্লে জেনসেন – কিছুটা লাজুক, কিছুটা অস্বাভাবিক, এবং সবার সাথে সহজে মিশতে পারে না এমন একটি ছেলে। একদিন স্কুল থেকে ফিরে বাসার সামনে পোর্চে সে পড়ে থাকতে দেখে একটি রহস্যজনক জুতার বাক্স। তার ভেতরে সে আবিষ্কার করে সাতটি ক্যাসেট। ক্যাসেটগুলো পাঠিয়েছে হ্যানা বেকার, যে মেয়েটিকে ক্লে ভালোবাসতো কিন্তু মুখ ফুটে কখনো বলতে পারেনি, এবং মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই যে মেয়েটি হাতের শিরা কেটে আত্মহত্যা করেছে।

সাতটি ক্যাসেটে এপিঠ-ওপিঠ মিলিয়ে মোট ১৩টি খন্ড, যার প্রতিটিতে সে বর্ণনা করেছে তার আত্মহত্যার পেছনে প্রভাব ফেলেছে এমন ১৩টি কারণ। এবং এই ক্যাসেটগুলো তারাই পাবে, যারা ওই ১৩টি কারণের যেকোন একটির সাথে জড়িত, অর্থাৎ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলেছে হ্যানা বেকারের আত্মহত্যার পেছনে।

যেহেতু ক্লে’র কাছেও ক্যাসেটগুলো এসেছে, তার মানে সেও দায়ী হ্যানার মৃত্যুর পেছনে! কিন্তু কিভাবে? তা জানার উদ্দেশ্যে একে একে প্রতিটি ক্যাসেট শুনতে থাকে ক্লে। এবং ক্রমান্বয়ে তার সামনে উন্মোচিত হতে থাকে একের পর এক অজানা তথ্য। তবে সেগুলোকে ঠিক ‘অজানা’-ও বলা চলে না। ক্লে আর অন্য সকলের সামনেই দিনের পর দিন ঘটে গেছে ঘটনাগুলো, কিন্তু তারা কেউই কখনো সেগুলোকে বিশেষ পাত্তা দেয়নি। ভাবতেই পারেনি এইসব কারণই একটি মেয়েকে ভিতরে ভিতরে এতটা হতাশাগ্রস্ত করে তুলেছিল, এতটা অসহায় করে দিয়েছিল, এবং এতটা একাকীত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছিল যে শুধু আত্মহননেই মেয়েটি মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছিল।

একসময় ক্লে জানতে পারে ঠিক কিভাবে সে-ও হ্যানাকে নিজের অজান্তেই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু যখন সে সেই সত্যটি জানতে পারল, ততদিনে তো সব শেষ হয়ে গেছে!

ঠিক এরকম একটা প্রেক্ষাপটের উপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠেছে ‘থার্টিন রিজনস হোয়াই’ নামের নেটফ্লিক্স অরিজিনাল টিভি সিরিজটির কাহিনী। গত বছর ৩০ মার্চ ১৩ পর্বের এই সিরিজটির প্রথম সিজন মুক্তি পায়। এবং তারপর থেকেই চলছে এই সিরিজটি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে গত বছরের প্রথম অর্ধে তথা ৩০ জুন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি টুইট হয়েছিল যে টিভি সিরিজটি নিয়ে, সেটি ‘থার্টিন রিজনস হোয়াই’। এবং শুধু তাই-ই নয়। মুক্তির মাত্র দুই মাসেরও কম সময়েই এ সিরিজটি জিতে নেয় নেটফ্লিক্সের সর্বকালের সবচেয়ে ব্যবসাসফল অরিজিনাল টিভি সিরিজের খেতাব।

থার্টিন রিজনস হোয়াই, নেটফ্লিক্স

এবং মজার বিষয় হলো, এই সিরিজটিকে নিয়ে শুধু বাইরের দেশেই উন্মাদনা সৃষ্টি হয়েছিল মনে করলে ভুল হবে। বাংলাদেশেও ছুঁয়ে গিয়েছিল এ সিরিজের জনপ্রিয়তার রেশ।

বাংলাদেশে হয়ত বিদেশী টিভি সিরিজের দর্শক খুব বেশি নয়। খুব সীমিত সংখ্যক মানুষই নিয়মিত টিভি সিরিজ দেখে থাকে। কিন্তু সেই ছোট্ট পরিধির মাঝেও চলেছে এই সিরিজকে নিয়ে প্রবল উচ্ছ্বাস। এবং সেই উচ্ছ্বাসের মাত্রা এতটাই তুঙ্গে ওঠে যে শুধু টিভি সিরিজ দেখেই ক্ষুধা মেটেনি তাদের।

গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পাইরেটেড বইয়ের বাজার নীলক্ষেত সয়লাব হয়েছিল জে অ্যাশার রচিত ‘থার্টি রিজনস হোয়াই’ নামক বইটি দিয়ে, যেটিরই টিভি এডাপশন হলো এই সিরিজটি। এমনকি বাংলাদেশে হাতে গোনা যে কয়টি অনলাইন বুক শপ আছে, সেগুলোতেও চলেছিল ‘থার্টিন রিজনস হোয়াই’ এর বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি। চলেছিল প্রকাশের আগেই প্রি অর্ডার, এবং কে কাদের চেয়ে কম দামে বইটি বাজারে আনতে পারে তা নিয়ে তুমুল লড়াই।

পেঙ্গুইন বুকসের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রেজরবিল থেকে আজ থেকে এগারো বছর আগে, ২০০৭ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল বইটি। কিন্তু এতদিন এই বইটি নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয়নি এদেশের বইপ্রেমীদের মাঝে। এমনকি ফেসবুকে বাংলা ভাষাভাষী বইপ্রেমীদের বই নিয়ে আলোচনা কিংবা রিভিউ প্রদানের যে কয়টি বড় গ্রুপ রয়েছে সেগুলোতেও এর আগে কখনো এই বইটি নিয়ে এতটা আগ্রহ দেখা যায়নি, যা দেখা গেছে গত এক বছরে।

হঠাৎ করে মানুষের এই আগ্রহ যে কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং টিভি সিরিজটিরই একটি বিশাল ভূমিকা রয়েছে এর পেছনে, তা বলাই বাহুল্য।

ফিরে আসি আবার টিভি সিরিজটির ব্যাপারে। জে অ্যাশারের ইয়ং এডাল্ট ঘরানার বইটিকে টিভি সিরিজে রূপদান করেছেন পুলিৎজার জয়ী চিত্রনাট্যকার ব্রায়ান ইয়রকি। ক্লে জেনসেন ও হ্যানা বেকারের চরিত্রে অভিনয় করেছেন যথাক্রমে ডিনাল মিনেত্তে ও ক্যাথরিন ল্যাংফোর্ড। এই একটি সিরিজই রাতারাতি জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে গেছে এই দুই নবীন অভিনেতাকে।

এই সিরিজের এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসারদের তালিকায় আছে জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী সেলিনা গোমেজের নাম। এই সিরিজে ব্যবহৃত ‘অনলি ইউ’ নামের গানটিও গেয়েছেন তিনি। মূলত নির্মাতাদের প্রাথমিক ইচ্ছা ছিল ইউনিভার্সাল পিকচারসের ব্যানারে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে ‘থার্টিন রিজনস হোয়াই’ উপন্যাসটিকে রূপান্তরের, এবং সেখানে হ্যানা বেকারের চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল স্বয়ং সেলিনা গোমেজেরই। কিন্তু পরবর্তীতে নির্মাতারা সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন, এবং প্রধান দুই চরিত্রে দুইটি নতুন মুখ নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

থার্টিন রিজনস হোয়াই, নেটফ্লিক্স

মুক্তির পর থেকে গত এক বছরে ‘থার্টিন রিজনস হোয়াই’ পরিণত হয়েছে একটি সোশ্যাল ফেনোমেননে। এই সিরিজ নিয়ে বিতর্কেরও ঝড় উঠেছে বেশ ভালোভাবেই। টিভির পর্দায় আত্মহত্যাকে ‘গ্লোরিফাই’ করা হয়েছে, এবং এর ফলে অনেক টিনেজার আত্মহত্যা করতে আগ্রহী হতে পারে বলে অভিমত এক শ্রেণীর মনোবিদদের।

এমনকি নিউজিল্যান্ডের মত অনেক দেশে এই টিভি সিরিজটিকে নিষিদ্ধও করা হয়েছে। তারপরও থেমে নেই এই সিরিজের জয়রথ। বৈধভাবে নেটফ্লিক্সে সিরিজটি দেখা না গেলে কি হয়েছে, অনলাইন থেকে পাইরেটেড সংস্করণ ডাউনলোড করে হলেও সবাই ঠিকই দেখেছে সিরিজটি।

এবং এই সিরিজের পক্ষে দাঁড়ানোর মত লোকেরও অভাব নেই। এর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে সেগুলোকে নাকচ করে দিয়ে অনেক নামকরা রিভিউয়ারই বলেছেন, টিভির পর্দায় এই সিরিজের চিত্রায়ন একটি অসাধারণ সাহসী উদ্যোগ। পশ্চিমা বিশ্বেও আত্মহত্যাকে ‘ট্যাবু’ বা একটি নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে দেখা হয়, যার ফলে প্রকাশ্যে আত্মহত্যা নিয়ে তথা এটির পেছনে কী কী কারণ থাকতে পারে, ঠিক কোন মানসিক পর্যায়ে পৌঁছুলে একজন মানুষ আত্মহত্যার মত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে সেগুলো নিয়ে আলোচনা খুব একটা হয় না। কিন্তু ‘থার্টি রিজনস হোয়াই’ মুক্তির পর সেই নিষিদ্ধ বিষয়টিই সকলের সামনে চলে এসেছে, এবং এ নিয়ে নানাজন নানা ধরণের যুক্তি-তর্ক ও তত্ত্ব তুলে ধরেছেন, যা এক পর্যায়ে আত্মহত্যার বিরুদ্ধে ছোটোখাটো একটি সামাজিক আন্দোলনেও রূপ নেয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমনও অনেকে আছেন যারা দাবি করেছেন এই টিভি সিরিজটি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে, এবং মানসিক অবসাদগ্রস্ত অনেকে যারা আত্মহত্যার চিন্তা করছিলেন তারা এই সিরিজ দেখার পর জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। একটি মানুষের আত্মহত্যা তাদের কাছের মানুষদের জীবনে কি বিশাল প্রভাব ফেলে, এ সিরিজ দেখে তা উপলব্ধি করার পরও আত্মহত্যার চিন্তা বাদ দিয়েছেন বলে দাবি অনেকের।

কিন্তু এই সিরিজের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, এর অতিমাত্রায় সারল্য ও সত্যঘনিষ্ঠতা। আত্মহত্যার মত স্পর্শকাতর একটি বিষয়কে এতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা নিঃসন্দেহে অসাধারণ একটি কাজ, এবং সেজন্যই সকল টিভি সিরিজপ্রেমীর জন্যই এটি হবে একটি ‘মাস্ট ওয়াচ’।

জে অ্যাশার রচিত মূল বইয়ের কাহিনী এক পর্বেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গত বছরই নেটফ্লিক্স কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছিল যে প্রথম সিজনের আকাশছোঁয়া সাফল্যের পর দ্বিতীয় সিজনও নিয়ে আসবেন তারা। এবং বাস্তবে হতে চলেছে সেটিই। আর মাত্র এক সপ্তাহ পরই, আগামী ১৮ মে, শুক্রবার নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেতে চলেছে সিজন টু এর সবগুলো পর্ব। আর তাই এই মুহূর্তে বিশ্বব্যাপী থার্টিন রিজনস হোয়াই ভক্তদের মধ্যে চলছে তুমুল উন্মাদনা আর জল্পনা-কল্পনা। সবার মনে এখন একটাই প্রশ্ন, কী হবে দ্বিতীয় সিজনে?

বলাই বাহুল্য, দ্বিতীয় সিজন মুক্তির পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে আবারও শুরু হবে এই সিরিজটি নিয়ে প্রচন্ড রকমের মাতামাতি। যদি আপনারাও চান সেখানে সামিল হতে, তবে এখনই দেখে নিতে পারেন প্রথম সিজনটি। এরপর দ্বিতীয় সিজন মুক্তি পেলে দেখে নেবেন সেটিও!

থার্টিন রিজনস হোয়াই সিজন-২ এর ট্রেলার দেখুন এখানে ক্লিক করে।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close