সময়ের বৃক্ষ থেকে আরো একটি পত্র ঝরে যাবে দিন তিনেকের মধ্যেই – যবনিকা পতন হবে ২০১৭ সালের। শুরু হবে নতুন বছর ২০১৮।পৃথিবীর ও বৃহত্তর মানব জীবনের পথ পরিক্রমায় তিনশত পয়ষট্টি দিবস নিশ্চিতভাবে পরমানুসম ক্ষুদ্র, একটি দেশ বা সমাজের সার্বিক বিবর্তনেও একটি বছর তেমন কিছু নয়, একজন ব্যক্তিমানুষের পুরো জীবন বলয়েও হয়তো একটি বছরের সামগ্রিক গুরুত্ব তেমন একটা বড় নয়, তবু প্রতিটি বছরই তার নিজস্ব তাৎপর্য্যে ভাস্বর যেমন পুরো পৃথিবীর জন্যে, তেমনি একটি দেশ বা সমাজের জন্য এবং সেই সঙ্গে একজন ব্যক্তি মানুষের জন্যে।

এই যে ১৯৬৯ সাল। মানুষ প্রথম চাঁদে পা রাখল – ইতিহাস সৃষ্টি হয়ে গেল সারা পৃথিবী আর মানব সভ্যতার জন্যে। আর কোন বছর এই অভূতপূর্ব অর্জনের ওপরে দাবী রাখতে পারবে না – ওটা শুধুমাত্র ১৯৬৯ এর। তেমনি ১৯৮৯ – বার্লিন দেয়ালের পতন।পূর্ব আর পশ্চিম জার্মানী মিলে অখন্ড জার্মানী হয়ে গেল। অন্য কোন বছর চিহ্নিত হবে এ অভাবিত ঘটনার জন্য – ওটা ১৯৮৯ এর। তেমনি প্রতিটি ব্যক্তিমানুষের জীবনেও কোন কোন বছর হিরন্ময় স্মৃতি হয়ে থাকে – সুখের কারনে অথবা ধূসর পর্দা হয়ে থাকে – ‘পাতার নীচে, ছাতার মতো’ পরম ব্যপ্ত দুঃখময় স্মৃতির কারনে।

প্রায়শই বহু মানুষকে বছরের শেষে বলতে শুনি, “হায়, আরো একটা বছর ঝরে গেল জীবন থেকে” – উক্তির সঙ্গে বেরিয়ে আসে বুকভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাস। কেউ কেউ আবার এমনও বলেন, “মৃত্যুর দিকে আরো এক পা এগুলাম”। এ সব মানুষের জন্যে চলে যাওয়া বছর একটি ক্ষয়। আমার জন্যে শেষ হয়ে যাওয়া বছর একটি প্রাপ্তি। আমি ভাবি, “জীবন ভারী সুন্দর। ইস্, ভাগ্যিস, বিগত বছরটা পেয়েছিলাম জীবনে। তা নইলে এত সব নতুন মানুষের দেখা পেতাম কি আমার জীবনে, নতুন করে জানা হতো কি পুরোনো মানুষদের, যেতে পারতাম কি নতুন নতুন জায়গায়, জানতে পারতাম কি যা ছিল অজানা? কতটা দিয়ে গেল আমাকে পুরোনো বছরটা!”

এই যে ২০১৭। পৃথিবীতে কত বদল হয়েছে এ বছরে, ঘটেছে কত পরিবর্তন নানান দেশের, সমাজে। ঐ সব পরিবর্তন নিয়ে অনেকের মতো ভাবি, ব্যাখ্যা খুঁজি, জানি যে এসবের প্রভাব আমার জীবনেও পড়বে। কিন্তু বাইরের বৃহত্তর পৃথিবীর পরিবর্তনে ততটা আন্দোলিত হই না, যতটা হই আমার নিজস্ব পৃথিবীর বদলে।

এর কারন হয়তো নানাবিধ – বাইরের পৃথিবীর পরিবর্তন অনেক সময়েই নৈর্ব্যক্তিক দূরের জিনিষ বলে মনে হয়, আমার পৃথিবীর বদলগুলো আমার ধরা-ছোঁয়ার মধ্যে বাস্তব বিষয় বলে মনে হয়; বাইরের পৃথিবীর ঘটনা গুলো বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে অনুধাবন করতে পারি, আমার পৃথিবীর জিনিসগুলো হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারি। তাই যে কোন বছরকে আমি মূলত: দেখি আমার পৃথিবীর আরশিতে।

কি নিয়ে আমার পৃথিবী? আমার অতি প্রিয়জনেরা, আমার কাজ, আমার পারিপার্শ্বিকতা – এই নিয়েই তো আমার পৃথিবী। আমার পৃথিবী আমাকে ধারন করে আছে এবং আমিও আমার পৃথিবীকে ধারন করে আছি। তাই আমার পৃথিবী আমার ধর্মও বটে, কারন যা আমাকে ধারন করে আছে আর আমি যা ধারন করে আছি, তাই তো আমার ধর্ম।

২০১৭ তে কতো নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। চিলিতে যে পুত্রহারা অন্ধ মাতা আমার বক্তৃতা শেষে আমাকে শুধু স্পর্শ করতে চেয়েছিলেন, তাঁর প্রতি নমিত হই পরম শ্রদ্ধায়। বিদায় নেয়ার মুহূ্র্তে যখন তিনি আমাকে বলেছিলেন, “অনেক বড় হও বাবা”, তখন তাঁকে আমার নিজের মায়ের থেকে আলাদা করা যায় নি। কিংবা যে কেনিয়ান তরুনীটি আমাকে বলেছিল যে কেমন করে সে তাঁর দেশে নারী নির্যাতনে বিরুদ্ধে এককভাবে নিরন্তর সংগ্রাম করে যাচ্ছে, আমার চেতনায় তাঁরও তো একটি বিশাল স্হান আছে। বিজয়ফুল কর্মসূচীর মাধ্যমে দেশে-বিদেশে কত অনন্যসাধারন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে – তাকেও তো ভাগ্য বলে মানি।

গত বছরে নতুন করে চিনেছি কত প্রিয়জনকে। এতদিন আমাদের কন্যা হিসেবেই দেখেছি যে মানুষটিকে, সে মাতার ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছে – আরেকটি ছোট্ট মিষ্টি মানুষের জননী হিসেবে। বলতে দ্বিধা নেই, এ পরিবর্তনে গর্বিত হয়েছি। আমার যে ভগ্নীকে ঘরের চার দে’য়ালের মাঝে দেখে অভ্যস্হ আমরা, তাঁকে একটি পেশাজীবি সন্মিলনীতে দেখে মুগ্ধ হয়েছি। কন্যাসম আমার যে সহকর্মীকে কোন এক অনুষ্ঠানে বেহালা তুলে নিতে দেখেছি, তার প্রথম ছড় টানাতেই বুঝেছি এখানে আমার অহংকারের জায়গা আছে।

কত নতুন জায়গা চিনেছি গত বছর। ঐ যে কেপটাউনের লাঙ্গা বস্তিতে যেতে পেরেছিলাম, তা’তো তীর্থস্হান দর্শনেরই সামিল। দক্ষিন আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ বা লাওয়ের মেকং নদীর তীরে যে নুড়িগুলো তুলে নিয়েছিলাম, সেও তো নতুন জায়গা থেকে নতুন কিছু সংগ্রহ। আইসল্যান্ডের তুষার ঝড়ে আটকা পড়ে সে অঞ্চলকে অনরূপ্ দেখার কি কোন তুলনা আছে?

২০১৭ তে কোন জীবনকে আমি ছুঁতে পেরেছি কি না জানি না, কিন্তু বহু মানুষের শ্রদ্ধা, মমতা, শুভকামনা আমার জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে। অবয়ব পত্রেই তো তার স্বাক্ষর মেলে।তার বাইরে আমার অতি প্রিয়জনেরা আমার সব সীমাবদ্ধতা, দূর্বলতা, অক্ষমতা সত্ত্বেও আমাকে নি:শর্তভাবে ভালোবেসেছেন, মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন, ক্ষমা করেছেন আমার সব অপূর্নতাকে।

সবার কাছে ঋণ আমার অনেক। কিন্তু কোন কোন ঋণ মানুষকে রিক্ত করে না, তাকে সমৃদ্ধ করে। তাই ঋন শোধ করার করার কথা ভাবি না, কারন কোন কোন ঋণ শুধবার নয়, আর সব ঋণ শোধ করাও যায় না এক জীবনে। ২০১৭ কে বলতে ইচ্ছে হয়, ‘যা পেয়েছি, তা’ও থাক, যা পাইনি তা’ও, যা মোরে দিয়েছ, তা’ই মোরে দাও’। জয়তু: ২০১৭।

_

ড. সেলিম জাহান,
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয়ের পরিচালক

Comments
Spread the love