সোয়াটের প্রয়োজন বিশেষায়িত ট্রেনিং

Ad

/১২ মিনিটের অপারেশন শুরু করতে ১২ ঘন্টা দেরি হল কেন?? সাথে সাথে আপারেশন শুরু করলে হয়ত ২২ জন মানুষকে জবাই করার সুযোগ পেত না!/

/১২ ঘন্টা পর অপারেশন কেন? সারা রাত পুলিশ-র‍্যাব-সোয়াট মিল্লা হোটেলের সামনে খাড়ায়া খাড়ায়া কি চুলটা ছিড়লো? ১৩ জন উদ্ধারের কথা বলস, বাকিগুলারে যে মাইরা ফেলসে তার কথা কে বলবে…/

প্রশ্ন দুটো বিভিন্ন ফেসবুক পেইজের কমেন্টবক্স থেকে নেওয়া। গতকাল থেকে এমন অজস্র মন্তব্য দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি। শোক আর বিস্ময় ছাপিয়ে মাথায় যে প্রশ্নটা ঘুরছে তা হলো, জাতিগতভাবে ন্যুনতম কমনসেন্সবিহীন উদ্ভট চিড়িয়া হয়ে গেলাম কবে আমরা? আমরা কি মানুষ হবো না?

২০০৮ সালে মুম্বাই হামলায় মাত্র ১০ জন জঙ্গী চারদিন ধরে পুরো দিল্লি শহর জুড়ে ম্যাসাকার চালিয়েছিল। ১৬৪ জন মারা গিয়েছিল। হোটেল তাজ জঙ্গীমুক্ত করে জিম্মিদের উদ্ধার করতে নিরাপত্তাবাহিনীর লেগেছিল ৫৭ ঘন্টা। ২০০৪ সালে রাশিয়ার ককেশাস অঞ্চলে বেসলান স্কুলে সাড়ে সাতশ বাচ্চাসহ ১১০০ জিম্মি করে চেচনিয়ার জঙ্গীরা, তিনদিন পর ১৮৬ বাচ্চাসহ ৩৮৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। গতবছরে প্যারিসের থিয়েটারে হামলায় জিম্মি কেউই অবশ্য বাঁচেনি। পেশোয়ারের স্কুলের জিম্মি ১৩২ টা বাচ্চাকেও বাঁচাতে পারেনি পাকিস্তানি কমান্ডোরা।

কিন্তু গতকাল সকালে আমাদের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ফার্স্ট প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন মাত্র ১২ মিনিটে যে দুর্ধষ অপারেশন চালিয়ে ১৩ জন এক্সিস্টিং জিম্মিকে উদ্ধার ও একজন জঙ্গীকে এলাইভ গ্রেফতার করেছে, সেটা এ ধরনের কমান্ডো অপারেশনের ক্ষেত্রে বিরলতম সফলতা। তার স্বীকৃতি মিলছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমেও, সিএনএনে এক এফবিআই অফিসার জানতে চেয়েছেন কোন ডাইভারশনে আর্মি কমান্ডোরা জিম্মি এবং মিলিট্যান্টদের এলাইভ উদ্ধার করতে পারলো! এ তো মোটামুটি মিরাকল!

এফবিআই এজেন্টকে বলা হয়নি, আর্মির এই প্যারা কমান্ডো ব্যাটেলিয়ন থাকে সিলেটে। বেশ কয়েকবার তাদের ঢাকায় আনা হলেও আবার সিলেট পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী বেশ কয়েকবার অনুরোধ করেছিল কমান্ডোদের ঢাকায় রাখতে, ট্রেনিংয়ের কারন দেখিয়ে, তবুও তাদের সিলেটেই রাখা হয়। স্ট্রাটেজিক লেভেলে ডিসিশন মেকিং প্রসেস আমলাতান্ত্রিক তালগাছ টাইপ দীর্ঘসূত্রিতা কমপ্লিট করে C130 বিমান সিলেট পাঠিয়ে কমান্ডোদের নিয়ে আসা আলাদীনের চেরাগে ঘষা দিলেই হয়ে যাবার কোন ব্যাপার না। তবুও সাড়ে চারটার মধ্যে ঢাকায় রীচ করে গুলশান পৌছে মাত্র আড়াই ঘন্টার মধ্যে ব্রিফিং, প্ল্যানিং, এবং অ্যাকশনের মাধ্যমে মাত্র ১২-১৩ মিনিটে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে এনে হোস্টেজ উদ্ধার এবং একজন মিলিট্যান্টকে গ্রেফতারের মত সাফল্য দেখাতে পারেনি আজতক কেউই। তবুও আমরা নাক সিটকাই, এতো দেরী হইল কেন? মাত্র ১৩ জন উদ্ধার হলো কেন? বাহ!

অথচ এই কাজটা পুরোটাই করবার কথা ছিল আমাদের পুলিশের সোয়াট টিমের। সেনাবাহিনীর বীর প্যারা কমান্ডোদের পৃথিবীর সব জায়গাতেই তাই-ই হয়। এই ধরনের ক্রাইসিস সিচুয়েশন হ্যান্ডেল করার জন্যই বাংলাদেশ পুলিশে এই এলিট ট্যাক্টিক্যাল ইউনিট SWAT (Special Weapons And Tactics) তৈরি করা হইছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, ডিএমপির ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের আন্ডারে অপারেশন চালানো এই বাহিনী শুরুতে অনেক প্রত্যাশা নিয়ে চালু হলেও ক্রমাগত অবহেলা আর আধুনিকায়নের অভাবে আজো একটি স্বয়ংসম্পুর্ন অত্যাধুনিক বাহিনীতে পরিনত হতে পারেনি।

২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত সোয়াট ডিবির আন্ডারে একটা ছোট্ট ইউনিট হয়েই রয়েছে। কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার কাছে জানতে পারলাম, ২০১৩ সালের পর থেকে এই স্পেশালাইজড কমান্ডো ফোর্সের কোন ফুল ফ্লেইজড ট্রেনিং হয় নাই! অথচ এইটা আমাদের পুলিশের সবচেয়ে চৌকষ এবং ট্রেইন্ড অফিসারদের নিয়ে তৈরি, যারা সেরাদের সেরা। সুতরাং তাদের ট্রেনিংটাও হওয়া উচিত সবচেয়ে গুরুত্বসহকারে।যাদের প্রয়োজন হয় সবচেয়ে ভয়ংকর এবং মারাত্মক সময়ে, তাদের তিন বছর বিনা ট্রেনিংয়ে বসায়ে রেখে ক্রাইসিস মোমেন্টে মিশন একমপ্লিশ করতে অর্ডার করাটা কত যৌক্তিক, বুঝতে পারছি না।

এই মুহুর্তে সোয়াটের বিশেষায়িত ট্রেনিং প্রয়োজন। স্পেশালাইজড ট্রেনিং, উইপন এবং রিসোর্স দিয়ে এই বাহিনীকে একটা পুর্নাঙ্গ ক্রাইসিস রেস্পন্স টিম হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবী। বিশেষ করে গতকালের অপারেশনে বুলেটপ্রুফ সাঁজোয়া যানের অভাব বোধ হয়েছে খুব। শেষপর্যন্ত সকালে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানে অপারেশন চালিয়েছে প্যারা কমান্ডোরা। বুলেটপ্রুফ সাঁজোয়া যান থাকলে এবং ট্রেইন্ড হলে হয়তো সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হত না। আর আগেই ঝাঁপিয়ে পড়তে পারতো সোয়াটের কমান্ডোরা। এই মুহুর্তে সোয়াটকে কার্যকর করবার জন্য যা যা প্রয়োজনঃ

১। সর্বপ্রথমে স্পেশালাইজড স্নাইপার টিম, যেকোনো অপারেশনে এরা সোয়াটকে ঈগলের ক্ষিপ্রতা এনে দেবে।
২। বুলেটপ্রুফ সাঁজোয়া যান
৩। হেলিকপ্টার
৪। ফুলফ্লেজড স্পেশালাইজড ট্রেনিং- দরকার হলে উন্নত দেশগুলো থেকে ট্রেইনার হায়ার করে এনে (বছরে মিনিমাম দুবার)
৫। নতুন রিক্রুটেড মেম্বার। (প্রতিষ্ঠার পর থেকে সোয়াটের অনেক কমান্ডো নানা জায়গায় বদলী হয়ে গেছেন, মজার ব্যাপার হলো তাদের জায়গাগুলো সেভাবে পূরন হয়নি! )
৬। সোয়াটকে একটা ব্যাটেলিয়নে উন্নীত করে বাংলাদেশের ৬৪টা জেলায় একটি করে প্লাটুন স্থাপন করা, যেন যে কোন মুহুর্তে ভয়ংকর ক্রাইসিস মোমেন্টে অতি দ্রুত সোয়াটের কমান্ডোরা ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন- গুলশানের মত সারা রাত অপেক্ষা করতে না হয়)
৭। ক্রাইসিস মোমেন্টে ডিসিশন মেকিং প্রসেসে আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দীর্ঘসূত্রিতা থেকে সোয়াট ইউনিটকে দূরে রাখা। (কেন, সেইটা আর ব্যাখার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না)

বনানীর ওসি সালাউদ্দীন শুক্রবার রাত সাড়ে আটতার দিকে স্ত্রীর জন্য শাড়ি কিনছিলেন। হঠাৎ করেই গুলশানে রেস্তোরাঁয় হামলার খবর এল। প্রিয়তমা স্ত্রীকে শাড়িটা আর উপহার দেওয়া হলো হয়নি তার। ডিবির অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার রবিউল ইসলামের স্ত্রী প্রেগন্যান্ট ছিলেন। প্রথম সন্তানকে কোলে নিয়ে আদর করার সৌভাগ্য আর হয়নি এদুজনের।

কর্তব্যের ডাকে এ দুজন অফিসারই সেদিন ছুটে গিয়েছিলেন গুলশানে। বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন জিম্মিদের উদ্ধারে, লাশ হয়ে ফিরেছেন অসমসাহসী এ দুজন অফিসার। দ্যা ব্রেইভ হার্টস! ডাই ইন হারনেস!

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে ধর্মান্ধ বর্বর পশু পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে সামান্য থ্রি নট থ্রি সম্বল করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন রাজারবাগের অকুতোভয় পুলিশেরা। ৪৫ বছর পর দেখতে একই রকম সেই ধর্মান্ধ পশুদের মোকাবেলায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন অকুতোভয় পুলিশ অফিসাররা। এ ধরনের ভয়ংকর পরিস্থিতি মোকাবেলায় তাদের স্পেশাল ট্রেনিং ছিল না, কমান্ডোদের মত ফুল-ফ্লেইজড গার্ড ছিল না, অস্ত্র ছিল না, কেবল বুকে ভেতরে থাকা ইনসেইন ব্রেভারী সম্বল করে কর্তব্যের টানে নিজেদের বন্দুকের সামনে স্যাক্রিফাইস করলেন তারা। স্বাধীন বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে প্রথম শহীদ বনানী থানার অফিসার ইন চার্জ সালাউদ্দীন এবং ডিবির অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার রবিউল ইসলাম।

যে কর্তব্য পালনে অকুতোভয় বীরত্বে প্রানটা বিসর্জন দিলেন এ দু চৌকষ কর্মকর্তা, সেই কাজটি ছিল স্পেশালাইজড ইউনিট সোয়াটের।অথচ স্রেফ ইকুইপমেন্ট আর উন্নত ট্রেনিংয়ের অভাবে তাদের যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেল না। দেশের স্বার্থে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাদের, সোয়াটকে স্পেশালাইজড ট্রেনিং, উইপন এবং রিসোর্স দিয়ে একটা অত্যাধুনিক পুর্নাঙ্গ ক্রাইসিস রেসপন্স কমান্ডো ব্যাটেলিয়ন হিসেবে গড়ে তুলবো নাকি আমাদের উদাসীনতায় আর অবহেলায় অকার্যকর হতে বসা সোয়াট ইউনিটের ব্যর্থতার দায় পূরন করতে ইনসেইন ব্রেভারী দেখিয়ে বন্দুকের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ে শহীদ হবেন সালাউদ্দীন আর রবিউলের মত ক্র্যাক পিপলেরা!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমরা আপনার সহৃদয় বিবেচনার দিকে তাকিয়ে আছি!

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

Ad