সমাধান করার প্রথম ধাপ হচ্ছে সমস্যাটাকে স্বীকার করে নেওয়া

Ad

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল গত বছরের আগস্টে একটা কলাম লেখেন, সেই কলামের শিরোনাম ছিল, “নিলয়ের হাতে বিজয়ের চিহ্ন”। কলামটির এক জায়গায় স্যার লেখেন, “একটা সমস্যা সমাধান করার প্রথম ধাপ হচ্ছে সমস্যাটাকে স্বীকার করে নেওয়া, যদি এটি কখনও স্বীকার করা না হয়, সেই সমস্যার সমাধান কখনও হবে না।” গতকাল রাত নয়টার পর থেকে আজ রাত নয়টা পর্যন্ত (মোটামুটি প্রধানমন্ত্রীর প্রেস ব্রিফিং পর্যন্ত) চলমান শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনাপ্রবাহ নীরব একজন দর্শক হিসেবে পর্যবেক্ষণ করে যখন নিজের দুর্বল বিবেচনায় এর কারণ অনুসন্ধান করার চেষ্টা করলাম, আমার মনে প্রথমেই আসলো স্যারের উল্লেখিত কথাগুলো।

আজকের বাংলাদেশ আর চব্বিশ ঘন্টা আগের বাংলাদেশ একই দেশ নাই। নিজের ভেতরে বিভিন্ন যুক্তি-তর্ক দিয়ে নিজেকে যতই বুঝ দেয়ার চেষ্টা করি, যতই চাপা দেয়ার চেষ্টা করি, তবুও স্বীকার করতেই হয় আজকের বাংলাদেশ আর গতকালের বাংলাদেশে আসলেই এক জায়গায় নাই। আমার এই আলোচনায় হত্যাকান্ডের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে দ্বন্দ্বকে বাইরে রাখলাম। নিশ্চয়ই সময়ের সাথে সাথে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত আমাদের হাতে আসবে, আমার চাইতে প্রাজ্ঞ এবং যোগ্য কেউ বিষয়গুলো নিয়ে লিখবেন।

একজন অনলাইন এক্টিভিস্ট হিসেবে সাম্প্রতিক বছর গুলোতে- জবাই করে মানুষ খুন, চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে মানুষ খুন ইত্যাদি টার্মের সাথে আমি এবং আমাদের কমিউনিটির লোকজন আত্মিকভাবে পরিচি। আমাদের রাজপথের আন্দোলনের সারথী অনেক পরিচিত মানুষদের, অনেক বড়ভাইদের আমাদের এই কায়দায় হারাতে হয়েছে। আমাদের অনেককেই ব্যাক্তিগতভাবে পরিচিত অনেক শহীদের লাশ কাঁধে নিতে হয়েছে, আমাদের অনেককেই ঘণ্টার পর ঘন্টা মর্গে দাঁড়িয়ে থেকে বিকৃত লাশগুলো সংগ্রহ করতে হয়েছে। এভাবে স্বজন হারানোর ব্যাথা আমাদের চাইতে আর কে ভালো বোঝে?

এ সমস্ত ঘটনাগুলো যখন ঘটছে তখন আমরা রাজপথে দাঁড়িয়েছি, প্রতিবাদ করেছি। চেয়েছি এই সময়টার অবসান হোক, চেয়েছি দেশটাকে পাকিস্তান হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে। এই চলার পথে আমাদের হুমকি দেয়া হয়েছে, আমাদের নামের লিস্ট পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছে। অনেকেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, অনেকেই লুকিয়ে আছেন এখনো।

গত প্রায় তিন বছর ধরে চলমান এই পরিস্থিতি। এত এত খুন, এত এত আন্দোলন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে পারে নাই। আর সেই পরিবর্তন না আনতে পারার মূল কারণ- সমস্যাটাকে অস্বীকার করা। সারা দেশব্যাপী জঙ্গিবাদের যে ভয়াবহ বীজ বপন করা হয়েছে শাহবাগ আন্দোলনের পর থেকে, সেই বীজকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি সরকার। দেশের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি কত খারাপ সেটা বুঝতে হলে ফেসবুকে সাম্প্রদায়িক উসকানি দেয়া বিভিন্ন পেইজ/গ্রুপ/ফোরামের আলোচনাগুলো লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়।

অপ্রিয় হলেও সত্য আমাদের দেশের এক শ্রেণীর মানুষ তথাকথিত নাস্তিক ব্লগার হত্যাকান্ডকে সমর্থন যুগিয়েছে, সেই সমর্থনকে আরও এক কাঠি বাড়িয়ে দিতে আমাদের মন্ত্রীরা ব্লগার হত্যা বন্ধ করার উপায় খুঁজতে চান ব্লগারদের লেখাগুলোতেই। এ যেন সেই দুষ্ট বাঙালি কুলাঙ্গারপনা, যারা ধর্ষণে নারীর পোশাকের দোষ খুঁজে পান। নারীর পোশাকে যেমন ধর্ষণ খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয় ঠিক তেমনিই ব্লগারদের লেখার বিষয় খতিয়ে কখনোই ব্লগার হত্যাকারীদের ধরে ফেলা সম্ভব নয়। যেই উগ্র মানুষগুলো সাধারণের ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে খেলতে চেয়েছে, সরকার তাদের সেই খেলাটা খেলতে দিয়েছে। এই ছাড় দেয়াটা উগ্রবাদীদের বেড়ে উঠতে দিয়েছে গুণোত্তর ভাবে। হেফাজতকে নগ্ন আস্ফালন করার সুযোগ দিয়ে, শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ দিয়ে সরকার জঙ্গিবাদকে একেবারে খোলা মাঠে কাজ করার লাইসেন্স দিয়ে দিয়েছে।

আমাদের দেশে উগ্র ধর্মবাদীরা সাধারণত পরজীবীর মত কোন একটি দলকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকে। এই আমলে এসে সরকারের গত তিন বছরের ভুল সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে সবার উপরে ছিলো জনসমর্থন ধরে রাখতে এদের আশকারা দেয়া। ফলে  প্রকাশ্যে বের হয়ে আসার সাহস পেয়েছে তারা। জঙ্গিবাদের যেসব তাত্ত্বিক নেতারা গোপনে জঙ্গি তৈরি করতো, আজকাল তারা প্রকাশ্যে ওয়াজ নসিহত করে বেড়াতে পারছে, ফলে জঙ্গি হামলা সমর্থনের পক্ষে মানুষ বেড়েছে অনেক। এই সমর্থনটা কি ভয়াবহ পর্যায়ে বেড়েছে সেটা বুঝতে হলে সামাজিক গণমাধ্যমগুলোতে একটু নজর দেয়াই যথেষ্ট।

আমরা যদি একটু লক্ষ করি, সারা পৃথিবীতেই জঙ্গিবাদের উত্থানকে একটা প্যাটার্নে ফেলার চেষ্টা করলে আমরা কিছু জিনিস দেখতে পাই। যেমন প্রথমে ইসলামের নামে ভিন্নমতালম্বিদের বিচ্ছিন্ন হত্যা করা। এদের বিচ্ছিন্নভাবে মারলে গণমত গড়ে ওঠে না, মডারেটদের একটা অংশই সমর্থন দিয়ে বসে, কারণ সেই মৃত মানুষের মতের সাথে সংখ্যাগরিষ্ঠ মডারেট সাহেবেদের মত মেলে না। মত যেহেতু মেলে না সুতরাং মেরে ফেললে বুকে লাগে না।

এরপর হত্যা করা হয় একই ধর্মের ভিন্ন ধারার লোকদের, সেই ভিন্ন ধারা যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ মডারেটের মতের সাথে যায় না, সুতরাং সেটা নিয়েও আমজনতা কথা বলতে পছন্দ করে না।

এরপর বিচ্ছিন্নভাবে বিদেশি হত্যা করতে হবে। এতে করে যেই দেশের নাগরিক মরল, সেই সব দেশ আমাদের দেশ জঙ্গি হয়ে গেছে বুঝে নিয়ে ন্যাশনাল-ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার থেকে দূরে সরে আসবে। আর সেই সব দেশ শক্তিশালী দেশ হলে সেই দেশের আশেপাশের দেশগুলোও আমাদের দেশকে জঙ্গি তালিকায় ঢোকাবে।

মোটামুটি পৃথিবী যখন একটা দেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে মোটাদাগে না হলেও “ঝুঁকিপূর্ণ দেশ” হিসেবে তালিকাভুক্ত করে ফেলবে, তখন আসবে ফাইলান পার্ট। প্রক্লেইমেশন। ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসা। প্রাথমিক পর্যায়ে কিছুটা বাধার সম্মুখিন হলেও নানান রাস্তায় নানান নামে আত্ম-প্রকাশ তারা করবেই। আমাদের সেই আত্ম-প্রকাশের পর্ব এখন চলছে।  দ্রুত গতিতে কম্ম সম্পাদন করতে আর একটা জিনিস দরকার, সেটা সেনাবাহিনীর কিছুটা অংশের সমর্থন। সেটা অর্জন করতে ঢাকা শহরের আনাচে কানাচে সেনাদের উসকানি দেয়া পোষ্টার দেখা যায়। বোঝা যায় সেই প্রক্রিয়াও চলছে।

নিজের বোধ বিবেচনায় যেটা বুঝি যে দেশে জঙ্গিবাদের ক্ষেত্র প্রস্তুত, এমনকি অনেক দেশে গণতন্ত্রের নামে সমঝোতার যে জঙ্গিবাদ চলে তেমন জঙ্গিবাদও নয়, বরঞ্চ সম্পূর্ণ শাসনব্যবস্থাকে গুড়িয়ে দিয়ে একটি জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড় করানোটাই তাদের লক্ষ্য। এই সমস্ত প্রক্রিয়াটিকে বন্ধ করতে হলে সরকারকে সবার আগে জঙ্গিবাদকে দেশের নাম্বার ওয়ান সমস্যা মেনে নিয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। এতদূর চলে আসার পর পুরো ব্যাপারটা সম্পূর্ণ বিলোপ করে দেয়া প্রায় অসম্ভব মনে হলেও আমাদের মনে রাখতে হবে আমাদের দেশের অনেক মানুষ এখনো অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে। এই অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষগুলো যদি একটু বলিষ্ঠভাবে সোচ্চার হতে পারে, আর সরকার যদি পুরো ব্যাপারটা আমলে নিয়ে সমাধানে সর্ব শক্তি প্রয়োগ করে, তাহলে এখনো কিছুটা আশা রয়েছে পরিস্থিতি পরিবর্তনের।

(এই লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। egiye-cholo.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে egiye-cholo.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না)

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

Ad