১৯৯৯ সালে আগমন। ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছেন প্রায় ১৭ বছর ধরে। কিন্তু গত ১৭ বছরে তাঁকে নিয়ে যতটা সুবাতাস বয়েছে, তার চেয়ে বেশি বইছে গত কয়েক দিনে।

মানুষটার নাম শাকিব খান। আমাদের কমার্শিয়াল বা সোজা বাংলায় বাণিজ্যিক সিনেমার সবেধন নীলমণি। শাকিব খান মানেই প্রযোজক অন্তত এতটুকু নিশ্চিত- যেই টাকা তিনি ঢেলেছেন, সেটাতে “খোদা না করুক” লাভ না হলেও, অন্তত মূল পুঁজিটা ফেরত আসবে! শাকিব খান মানেই- হল পেতে আর কোন সমস্যা না হওয়া! শাকিব খান মানেই প্রদর্শক আর ভ্রু কুঁচকাবেন না পরিবেশককের উপর, জিজ্ঞেস করবেন না-  সিনেমাতে “কী আছে”!

স্রেফ এবং স্রেফ এই মানুষটার নামই যথেষ্ট।

শুরতেই যদি প্রশংসার পরিমাণ বেশি হয়ে যায় বা কানে তোষামোদের মতন মনে হয় বিদগ্ধ পাঠকদের কাছে, তবে আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। এই মানুষটাকে নিয়ে সমালোচনা, ঠাট্টা, ট্রলের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। রিকশাওয়ালার নায়ক, ক্ষেত, লিপস্টিক খান, নারী ও পুরুষের মাঝের মানুষ (সচেতনভাবেই এক্ষেত্রে বহুল শব্দটা এড়িয়ে গেলাম)- হেন কোনো নাম নেই যেই নামে তাঁকে ডাকা হয়নি! একদিকে তিনি যেমন নিম্নবিত্ত দর্শকের হৃদয় জয় করেছেন এবং নিয়মিত হলে যারা যায় (সিনেমা যাই হোক না কেন তাদের কিছু যায় আসে না), তাদেরকে সমানে মাতিয়ে যাচ্ছেন। তাদের বিনোদনের অভাব পূরণ করছেন। অন্যদিকে আমরা যারা শিক্ষিত শ্রেণীর দর্শক আছি (প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে শিক্ষিত, প্রকৃত অর্থেই শিক্ষিত কিনা সেটা আলোচনার দাবি রাখে) অথবা যারা উচ্চবিত্ত শ্রেণীর দর্শক আছেন, শাকিব খানের নাম শুনলেই বা তাঁকে দেখলেই তাদের হৃদয়ে জ্বালাপোড়া শুরু হয়ে যায়! একই মানুষ- অথচ ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর মানুষের হৃদয়ে তাঁর অবস্থান আকাশ পাতাল পার্থক্য- চিন্তার খোরাকই বটে!

শাকিব সম্পর্কে প্রধান অভিযোগগুলো কি কি? সে অভিযোগের দায়ভার কি শুধুই শাকিবের একার? একটু তলিয়ে দেখা যাক-

১- শাকিব দেখতে মেয়েলী। হম! অভিযোগ বেশ গুরতর দেখা যায়! একজনের পুরুষের মাঝে মেয়েলী ব্যাপার কিছুতেই বরদাশত করা যাচ্ছে না। যেহেতু সিনেমাতে নায়িকা থাকছেনই, সেহেতু কেন আলাদা করে শাকিবকে মেয়েলী হতে হবে? কেন সব সময় ক্লিন শেভড? কেন আবার সেই ক্লিনশেভে এত চড়া মেকাপ! মেয়েলী তো লাগবেই! শাকিব নিজে এই জিনিসটা না বুঝলে আর কিছু করার নেই। সাথে বুঝতে হবে তাকে মেয়েলী বানিয়ে রাখা ডিরেক্টরদেরও।

২- লিপস্টিক। লিপস্টিক কিন্তু শাকিব একা দেন না, ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো সকল নায়কেরাই কম বেশি লিপস্টিক দেন, সেটা আপনাকে দিতেই হবে যাতে ক্যামেরার ফোকাসে আপনার ঠোঁট দুটো ভালোভাবে আসে। সমস্যা হয় লিপস্টিকের পরিমাণ নিয়ে। শাকিবের নিজের অজ্ঞতার কারণে বা তাঁকে যেই মেকআপম্যান সাজান বা যেই পরিচালকের কারণে মেকাপম্যান এমন কাজ করতে বাধ্য হন, অজ্ঞতাটা তাদের। দোষটা তাদের সবার। শুধু শাকিবের একার না। ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়- পর্দায় শাকিবের চেহারা কম, লিপস্টিকের দিকেই ফোকাস বেশি যায়!

৩- শাকিব অভিনয় পারেন না। এটাতে একটু দ্বিমত আছে। বেশিরভাগ সিনেমাতে শাকিব একই ধরনের অভিনয় করলেও, তাঁর ভিন্ন অভিনয়ের বেশ কিছু সিনেমা আছে। মুশকিল হচ্ছে সেই ধরনের সিনেমার সংখ্যা হাতেগোনা আর বর্তমানে সেই ধরনের সিনেমা তেমন একটা প্রচারও করা হয় না। যার ফলে বেশিরভাগ মানুষ জানতেও পারছে না সেই ধরনের সিনেমা সম্পর্কে। এই ধরনের কিছু সিনেমা হলো- সিটি টেরর (এই সিনেমাতে মান্নাকে গুলি করার পরে শাকিবের যেই এক্সপ্রেশন ছিল, সেটা তুলনাহীন), সুভা, নিঃশ্বাসে আমার তুমি, প্রিয়া আমার প্রিয়া, এক বুক জ্বালা, ভালবাসলেই ঘর বাঁধা যায়না, আমার স্বপ্ন তুমি (শাকিব নিজেই এই ছবিটাকে তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট বলেন), ডাক্তারবাড়ি, ভালোবাসা আজকাল বা সদ্য মুক্তি পাওয়া ‘আরও ভালবাসবো তোমায়’। এই প্রতিটি সিনেমাতে কিছুটা আলাদা এক শাকিবকে দেখা যায়, যেমনটা অন্য সিনেমাতে দেখা যায়না। সমস্যা হচ্ছে- এই ধরনের সিনেমার সংখ্যা বেশ কম।

শুধু কি হাতে গোনা এই কয়েকটা সিনেমাতেই এমন শাকিবকে দেখা যায়? না। পাওয়ার এনার্জি ড্রিংকের বিজ্ঞাপন কিংবা আশিয়ান সিটির বিজ্ঞাপনের শাকিবও একদম ভিন্ন এক শাকিব! টিপিকাল কমার্শিয়াল সিনেমার সাথে সেখানে তাঁকে মেলানোই মুশকিল।

শাকিবের যেই ক্রেজ ; হোক সেটা একটি বিশেষ শ্রেণীতে- সেই জিনিসটা কিন্তু একদিনে বা এমনি এমনি আসেনি। আর এই ক্রেজটা তৈরি করার পিছনে ক্রেডিটটাও কিন্তু তাঁর প্রাপ্য। মান্না মারা যাওয়ার পরে আর কে-ই বা পেরেছেন এমন ক্রেজ সৃষ্টি করতে? কয়েক বছর আগে শাকিবের প্রোডাকশন হাউজের প্রথম সিনেমা ‘হিরো দ্যা সুপারস্টার’ ঈদে মুক্তি পায়। আমার বাসার পাশের যেই সিনেমা হলে আমি যখন খুশি তখন গেলেই টিকেট পাই, সেখানে এই সিনেমার টিকেট আমি তিনদিন না পেয়ে ঘুরে আসি! চার নাম্বার দিন যখন হলে গেলাম, কানায় কানায় পূর্ণ সিনেমা হল! পর্দায় শাকিব আসার সাথে সাথেই দর্শকের তালি আর শিষ যেন থামছেই না! অনেক ছেলেকেই দেখলাম শাকিবের মতো চুলের স্টাইল করে সিনেমা হলে এসেছে সিনেমা দেখতে!

একজন উপমহাদেশীয় নায়ক হওয়ার জন্য যা যা গুণ দরকার, তার সবই কিন্তু শাকিবের মাঝে আছে। তার উচ্চতা ছয় ফুটের মতো, তিনি বেশ সুদর্শন- সেটা মেকাপ দিয়ে না, মেকাপ ছাড়াও। তিনি দারুণ নাচতে পারেন, নিজের প্রথম প্রযোজিত সিনেমাতে শাকিব যেভাবে নেচেছেন- সেটা দুর্দান্ত। কান্নার এক্সপ্রেশন তিনি বেশ ভাল দেন। অনন্ত জলিলের অন্যতম দুর্বল দিকটি শাকিবের মাঝে নেই, উচ্চারণ নিয়ে শাকিবের কোনো সমস্যা নেই। শাকিবের শুধু দরকার একজন ভাল ডিরেক্টর- যার কথা শাকিব শুনবেন, যিনি “নাম্বার ওয়ান শাকিব খান” যা বলবেন সেটাই না করে, নিজের ডিরেক্টরগিরি বা সৃজনশীলতা দেখাতে পারবেন।

এই জিনিসটাই সম্ভবত আমরা গত কয়েকদিনে দেখলাম এবং যেই কারণে এত প্রশংসা। ‘সম্রাট’ আর ‘শিকারি’- শাকিবের আপকামিং দুটো সিনেমার গান মুক্তি পেয়েছে একই দিনে- অল্প কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে। দুটো গানই পেয়েছে দর্শকপ্রিয়তা। সম্রাট দেশের সিনেমা হলেও, শিকারি যৌথ প্রযোজনার সিনেমা। শিকারি সিনেমার ‘হারাব তোকে’ গানে স্লিম শাকিবকে দেখে সবাই তাজ্জব! সাথে গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি তো ছিলোই! এখানে শাকিব এতটাই স্লিম ছিলেন যে, কো-আর্টিস্ট শ্রাবন্তিকেও শাকিবের চেয়ে বেশি মোটা লাগছিল! আর সম্রাট সিনেমার ‘রাতভর’ গানে ড্রেস সিলেকশন, লোকেশন, অপু বিশ্বাসের সাথে কেমিস্ট্রি- অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। যদিও এখানেও সেই পুরনো অভিযোগ- ক্লিন শেভ অবস্থায় একটু বেশি মেকাপ ছিল। শাকিবের এই আমূল পরিবর্তনের ফলাফল দেখা যাচ্ছে সাথে সাথে- শিকারি গানের ইউটিউব ভিউ ইতিমধ্যে উনিশ লাখের উপরে! যেখানে কলকাতার চ্যানেল থেকে দেখা হয়েছে প্রায় নয় লাখ বারের মতো, আর জাজের চ্যানেল থেকে দেখা হয়েছে সাড়ে দশ লাখেরও বেশি! (এই লেখার আগ পর্যন্ত হিসেবটি)

সব কথার শেষ কথা হচ্ছে- শাকিবকে বদলাতে হবে, শুধু সময়ের প্রয়োজনেই নয়, সময়ের দাবি এই পরিবর্তন। হাতে হাতে স্মার্টফোন আর সুলভ ইন্টারনেটের এই যুগে ক্লিক করলেই যেখানে উন্নত দেশের সিনেমা দেখা যায়, সেখানে শাকিব নিজেকে পরিবর্তন না করলে তার যেই দর্শকেরা এখনও তার সিনেমা হলে গিয়ে দেখেন, একদিন তারাও হয়তো মুখ ফিরিয়ে নেবেন, যেটি আমাদের ইন্ডাস্ট্রির জন্য খুবই ভয়াবহ সংবাদ হবে। আর হ্যাঁ, শুধু লুক বদলালেই কিন্তু সব বদলে যায়না, সিনেমাটা একটা টিম ওয়ার্ক; সবাইকে বদলাতে হবে, নতুনদের সুযোগ দিতে হবে, নিজেদের চিন্তাধারা বদলাতে হবে, তামিল নকল বন্ধ করে মৌলিক কিছু চিন্তা করতে হবে। ৬০ কোটির তামিল সিনেমা দেড় কোটিতে বানালে সেটার আউটপুট দেড় কোটির মতই আসবে, ৬০ কোটির মতো না- এই জিনিসটা বুঝতে হবে। লুক বদল করে সেই আগের মতো এক্সপ্রেশন দিলে শাকিবের এখন যেই গ্রহণযোগ্যতা হয়েছে, সেটাও খুব বেশিদিন আর থাকবে না। নিজের ক্যারেক্টার নিয়ে প্রতিটি মুহূর্তে ভাবতে হবে।

বাংলা সিনেমার ভয়াবহ সংকটকালীন সময়ে শাকিব যেভাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন উদ্ধারকর্তা হিসেবে, তাতে এরই মাঝে ইন্ডাস্ট্রিকে অনেকখানি দেওয়া হয়ে গেছে শাকিবের। কিন্তু সিনেমাঅঙ্গনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষদের বিশ্বাস, আরও অনেক অনেক কিছুই দেওয়ার বাকী শাকিবের। কলকাতার প্রসেনজিত যেভাবে নিজেকে আমূল বদলে ফেলেছেন, শাকিবও কি একদিন তেমনই করবেন? সেটা সময়ই বলবে। তবে এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই, শাকিব খান বদলালেই বদলে যাবে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-