#ছোটগল্প

বাড়িটায় কি রং করবা?
: নীল!
– কোন বইয়ে যেন পড়েছি, নীল কষ্টের রঙ। পড় নাই তুমি?
: ধুর ছাই! নীল কেন কষ্টের রঙ হইতে যাবে? আমার তো নীল রঙই ভালো লাগে! অদ্ভুত টান রঙটার উপর। এক ঝাঁক নীলের দিকে চাইলেই কেমন ঘোর লাগে। চোখ সরাইতে পারি না।

– তাইলে তো কোনভাবেই বাড়িটায় নীল রং করা যাবেনা|

: ‘কেন’- বিষ্ময় ছড়াতো মেয়েলী কণ্ঠে। আর পুরুষ কন্ঠে দুষ্টুমির ছোঁয়া- ‘বিকালে বাগানে বসে চা খাবো আর দুইজন দুইজনকে দেখব। তুমি তো এই সুদর্শন পুরুষটারে ফেলে বাড়িটার দিকে তাকাইয়া থাকবা ঘোরে ডুবে। হিংসা হবে যে!’

তারপর হাসির রোল পড়তো ছোট্ট টিনের ঘরটায়। স্বপ্নরা ছুটে বেড়াতো। একদিন আরো ভালো চাকরি হবে তরিকের, অনেক টাকা জমাবে স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলে; ইট, বালু, সিমেন্ট সবই জমবে, বাচ্চা ছেলে মেয়ে দুটোর বাড়ি নিয়ে আর মন খারাপ হবে না। কত কী গল্প ওদের! আলাদা রুম থাকবে সবার, হলদে রঙের, গোলাপী রঙের, কমলা রঙের।

মেয়েটা ঝড়ের দিনে মেঘলাকে জড়িয়ে বলতো, ‘দালানবাড়িতে আমাদের ভয় থাকবে না, তাই না মা?’ মেঘলা ঠোঁটে হাসি ছড়িয়ে মেয়ের চুলে হাত বুলাতো। কপালে চুমু খেয়ে বলতো, ‘হু চাঁদু বুড়ি। এক ঘুমেই দেখবা ঝকঝকা সকাল। সারারাত ঝড়মশাই ছোটাছুটি করবে তোমাকে আর অয়ন বাবুইকে ভয় দেখাইতে। তোমরা টেরই পাবা না! দিব্যি ঘুমাবা। শেষে ঝড় রাগ করে অন্য দেশে চলে যাবে। আর বলে যাবে কোনদিন আসবে না তোমাদের ভয় দেখাইতে। চাঁদু বুড়ি আর অয়ন বাবুইয়ের ভয় নাই!’

বাচ্চা মেয়েটা ঝড়ের কথা ভুলে হাসতো খিলখিলিয়ে। নতুন বাড়ির স্বপ্নটায় ডুবে যেত। ছেলেটা তখন থেকেই এমন চুপ চুপ থাকতো। কিছুই বলতো না। বাবার পাঁজর জাপটে ছোট বোনকে শোনানো মায়ের গল্পটা শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে যেত। মধ্যবিত্ত দিনগুলো কীভাবে কীভাবে যেন কেটে যেত স্বপ্ন দেখে দেখে!
তরিকের এখনো স্পষ্ট সবটা মনে পড়ে। যেন এইতো সেদিন কলেজ ছাড়লো। হইহই করে ঘুরে বেড়ানো সদ্য তরুণ হওয়া ছেলেটা ছোট্ট একটা চাকরী শুরু করলো। হঠাৎই একদিন মা বললো, ‘তোর জন্নি মেয়ে দেখিসিরে তরি! শুক্কুরবারে বিয়া তোর। করিম ভাইয়ের মাইয়া মেঘলার লগে। কী চান্দের লাহান মাইয়াখান! ঘরডা গুছাইয়া রাকপেনে। তোর আপত্তি নাইতো তরি?’

কী বলবে খুঁজে পায় না তরিক। ভাবে বিয়ের কথা শুনে মেয়েরা একাই লজ্জা পায় নাকি? লজ্জাশরম পুরুষেরও আছে!

তারপর শুক্রবারে বাবা, ছোট চাচা আর দুই চাচাতো ভাইয়ের সাথে গেল তরিক। সে এক অন্যরকম অনুভূতি! তরিক মাথা নুইয়েই কাটালো সারা দিন। সন্ধ্যার পর বউ নিয়ে বাড়ি ফিরলো। পথে একবারো তাকানোর সাহস পেল না ঘোমটা টানা মেয়েটার দিকে। কত বার দেখেছে সে এই মুখটা! তবুও সেদিন কেমন যেন আগের মত ছিল না সবটা। নতুন ছিল। একেবারেই নতুন।

নবম শ্রেনীর পর পড়ার স্বপ্নটা চাপিয়ে রেখে সংসার নিয়েই ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল মেয়েটা। এদিকে মায়ের একটু শরীর খারাপ হলেই কাঁদো স্বরে বুলি ছুঁড়তেন তিনি, ‘ও মেঘু বউ, তোমারে অনেক ভালা লাগে। সারাদিন কাছে রাখতে মন চায়। ও মেঘু বউ এতো ভালা কেন তুমি?” একদিন মা চলে গেল। সংসার অনেকটা এলোমেলো হলেও মেঘলা গুছিয়ে নিলো সবটা। তারপর একদিন বাবাও আর রইলেন না। টোনাটুনির ছোট্ট ঘরটা আলো করে অয়ন এলো, চাঁদনী এলো। তরিক আর মেঘলার দায়িত্ব বাড়লো দিনে দিনে। সাথে যোগ হলো একটা বাড়ির স্বপ্ন। খাওয়া, পরা- কোনোদিনও পরিপূর্ণ ছিল না মেঘলার। অভিযোগ করেনি কখনো। নিজের জন্য কিচ্ছুটি চায়নি মুখ ফুটে।

মাসের শুরুতে হাতে পাওয়া টাকাতে যে সংসার চালাতে একটু বেশিই কষ্ট হবে মেঘলার, তা খুব ভালো করেই জানতো তরিক। তবুও কীভাবে কীভাবে যেন টাকা জমাতো মেয়েটা। আহ্লাদী স্বরে বলতো, ‘একটা বাড়ি হলে মন্দ কী! নীল বাড়ি। আসমান আসমান লাগবে। ছাদে দাঁড়াইলে মনে হবে আসমানে দাড়াইয়া আছি।’ তরিকও জুড়ে দিত সাথে, ‘‘ও মেঘ, বাড়ির সব কি তোমার মনের মতই হইবো নাকি? আমাদের অধিকার নাই? আমি নাম ঠিক করব বাড়িটার। আসমান বাড়ি না, বাড়ির নাম রাখব ‘মেঘবাড়ি’, হু!’’

মেঘলা হাসতো বাচ্চা মেয়ের মতো। লজ্জাও পেত। এত লজ্জাবতী ছিল মেয়েটা! পুরনো দিনের কথাগুলো মনে করে চোখ অশ্রুতে ভরে ওঠে তরিকের। বৃদ্ধ হাতের ওপর টপ টপ করে জল পড়ে। পাঁচ বছরের এক বাচ্চা মেয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তরিকের দিকে। মন খারাপের সুরে বলে, ‘কাঁদো কেন নানাভাই?’ তরিক মুচকি হেসে বলে, ‘চোখে সমস্যা ইথু সোনা! দেখো না, বুড়া হইয়া গেছি!”

ফিক করে হেসে ফেলে ইথিকা। নানার হাত ধরে বলে, ‘গাড়ি রেডি। চল আমরা নতুন বাড়িতে যাই।’

জায়গাটার মাঝখানে একটা বিশাল সাদা বাড়ি। ছোট্ট একটা গেট। চারিদিকে উচু ইটের পাঁচিল। ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে ফুলবাগান। কোন ফুল গাছটার উপস্থিতি নেই বাগানে তা হিসেব করতে হিমশিম খেতে হবে। বাগানের ডান দিকটায় বড় কাঠগোলাপ গাছটার পাশে লোহার দোলনা। বাগান পেড়িয়ে বাড়িটার পর পেছনে সিঁড়িবাধানো মাঝারি পুকুর। পুকুরের পাশঘেঁষা করবী গাছের সাঁড়ি। সাঁড়ির ফাঁকে চিকন একটা পথ দেখা যায়। ওই পথ ধরে মিনিট দুয়েক হাঁটলেই দেখা যায় মেঘলার ছোট্ট ঘরটা। নীল টাইলসে সাদা রঙে লেখা নাম আর মৃত্যু তারিখটা দূর থেকেই নজর কাড়ে। সেদিকে না তাকানোরই চেষ্টা করে অয়ন। রোজ রোজ এখানটায় বসে থাকে ও। ভালো লাগে। মনে হয় মায়ের কাছে বসে আছে। আরো অনেকটা কাছে যেতে ইচ্ছে করে ওর। এইতো সেদিন যেন মা হাত ছুঁয়ে বললো, ‘অয়ন বাবুই অনেক কষ্টে জমিটুক কিনছি বুঝলা! তোমাদের শিক্ষিত বানাইছি। বড় অফিসে চাকরী করবা। বাড়িটা তোমরাই বানাবা। তোমার মায়ের ক্লান্ত লাগে। বাড়িটা দেখে যাইতে পারবো না হয়তো। মইরা যাই যদি, পারলে জমির এককোনায় কবর দিও। বাড়ি হইলে কবরে শুইয়া দেখবো তোমাদের। কাছে কাছে থাকা হইবো।’

অয়নের রাগ হয়েছিলো সেদিন। ভেবেছিল এমন কথা কেন বললো, এই নিয়ে কথা শোনাবে মাকে। তবে কিছুই বলা হয়নি। বরাবরের মতো চুপচাপ ছিল। তারপর সেদিন! বাবার ফোন পেয়ে তড়িঘড়ি ছুটলো অফিস থেকে ছুটি না নিয়েই। হাসি খুশি ঘরটা সেদিন কান্নার আওয়াজে মুখর হয়ে গেল। কারা যেন কান্নার সুরে বলছিল, ‘উঠানে পিঁড়িতে বইসা গপ্প করতাছিল শক্ত পুক্ত মানুষটা। অমনি কইলো বুকে বেদনা করে। দুই তিনবার চাঁদু বুড়ি আর অনয় বাবুই কই রে কইয়া চিল্লাইলো। কইলো চাঁদুর বাপে খায় নাই দুপুরে। উনারে তোমরা কেউ খাইতে দেও। বেচারার শুকনা মুখ। তারপরেই দমডা গেল।’

অয়ন ভাবতেই পারেনা ওর জীবনে সবচেয়ে প্রিয় মানুষটা অনেক বছর আগেই ওর কাছ থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। মনে পড়লেই ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায়। কিছু বলে না। মায়ের কবর ঘেঁষে বসে থাকে। মায়ের কাছে কাছে থাকতে ইচ্ছে করে যে!

তরিক গাড়িতে স্থির হয়ে বসতে পারে না। দম যেন আটকে আসতে চায়। হা করে নিঃশ্বাস নেয় কিছুক্ষণ পর পর। মেঘলার কথা মনে পড়ে। বাড়িটা নিয়ে কত স্বপ্ন ছিলো ওর! চোখের জল আটকাতে পারে না তরিক। হু হু করে কেঁদে ওঠে। চাঁদনী বাবার হাত মুঠোয় চেপে অস্থির হয়ে ওঠে। কাঁপা স্বরে বলে, ‘বাবা অসুস্থ লাগে তোমার? এমন করছ কেন?’ ইথিকা বিস্ময় নিয়ে কিছুক্ষণ মা আর নানার দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, ‘আম্মু তোমারও কি নানাভাইয়ের মত চোখে সমস্যা? তুমিও কি বুড়ো হয়ে গেছো?’
.
.
ঘন্টা দেড়েক পরে বাড়ির সামনে গাড়িটা এসে থামলো। অয়ন বউ ছেলে মেয়ে নিয়ে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিল ওদের জন্য। গাড়ির দরজা খুলে সবার আগে ছুটে বের হলো ইথিকা। দৌড়ে গিয়ে গেটের ডান পাশে সাদা দেয়ালে নীল রঙের লেখাটা অনেক আগ্রহ নিয়ে বানান করে পড়তে শুরু করলো। ম এ কারে মে, ঘ- মেঘ, ব আকারে বা, ড় ই কারে ড়ি; মেঘবাড়ি। তখন মেয়ের হাত ধরে গেটের সামনে দাঁড়ালো তরিকও। ইথিকা জ্ঞানী ভঙ্গিতে হাত নেড়ে নেড়ে বললো, ‘জানো নানুভাই, বাড়িটা এক খন্ড সাদা মেঘের মতো তো, তাই মামা আর আম্মু মিলে এই সাদা বাড়িটার নাম রেখেছে মেঘবাড়ি।’

বাচ্চা তিনটে ছাড়া খুশি খুশি ভাবটা আর কারো মাঝে দেখা গেল না। বাকি চারজন মানুষ নীরবে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো। তরিকের কেমন শূন্য লাগছে নিজেকে। মেয়ের হাতটা খুব বেশি শক্ত করে ধরে রাখতে পারল না। পরে গেলো মাটিতে। চাঁদনী চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল বাবার মাথা কোলে তুলে। অয়নের মা হারানোর সেদিনের মতো যন্ত্রণা ছড়াতে লাগলো বুকে। বাচ্চারা অসহায়ের মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। মন খারাপ লাগছে ওদেরও। তরিক বাড়িটার দিকে আঙ্গুল তুলে ইশারা করে বললো, ‘ও চাঁদু বুড়ি, একঝাঁক নীল কেন এইখানে? ঘোর লাগে তো। আসমান নাকি এইটা? দেখো তোমার মা আসমানে দাঁড়াইয়া আছে। দেখে আমারে, ডাকে আমারে।’ চাঁদনীর কান্নার স্বর বাড়ে। ইথিকা বাঁ হাতের তালুতে চোখ মুছতে মুছতে বলে, ‘নানু ভাই, নীল কই? ওইটা তো মেঘবাড়ি। সাদা।’

তরিক শেষবারের মত বিড়বিড় করে, ‘ও চাঁদু বুড়ি, নীল তো কষ্টের রঙ। মেঘের রঙ হয় সাদা। মেঘবাড়িটার রঙ নীল কেন?’

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-