ভয় দেখালেই কি আমরা দমে যাব?

Ad

আমির খানের মতো বড় মাপের অভিনেতার স্মৃতিশক্তি অনেক ছোট মাপের- এরকমটা আমরা দেখেছিলাম গজিনি সিনেমায়। খুব কষ্ট লেগেছিল আমির খানের জন্য, যিনি ১৫ মিনিট পর পর সব ভুলে যান। আইএস এর তিন তরুণের ভিডিও দেখে আমার মনে হলো- এদের মেমোরি আমির খানের চেয়েও খারাপ।

তিন তরুণ আমাদের ভিডিওতে বাংলাতে বলেছেন- তারা আমাদের শেষ করে দিবেন, হামলা করতেই থাকবেন করতেই থাকবেন জিতে যাওয়া বা মারা যাওয়া না পর্যন্ত। নার্সারির বাচ্চাও বলতে পারবে এই ভিডিওর একমাত্র উদ্দেশ্য আমাদেরকে ভয় দেখানো এবং সেটাতে তারা মোটামুটি সার্থক বলা যায়। কিন্তু এই তিন তরুণের ধারণাই নাই আমাদের সহ্যশক্তি সম্পর্কে। দীর্ঘদিন দেশের সাথে যোগাযোগ নাই দেখে মনে হয় সেটাও ভুলে গেছেন। বললাম না অবস্থা আমির খানের চেয়েও খারাপ!

আমরা সেই জাতি যারা ইভা রহমানের আর তার স্বামীর গান দিনের পর দিন সহ্য করে যেতে পারি, আমরা সেই জাতি যারা সারারাত মশার কামড় খেয়ে পরের সারাটা দিন অফিস করতে পারি, আমরা সেই জাতি যারা ২০ মিনিটের রাস্তা দেড় ঘণ্টায় পাড়ি দেই, অসহ্য গরম দিনের পর দিন স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহ্য করে আমরা এমন একটা ভাব করি যেন আমরা সানি লিওনের চেয়ে বেশি “হট”, দিনের পর দিনের খাদ্যে ভেজাল খেয়ে নিজেদের কিউট ভুঁড়িটাকে ভেজালপ্রুফ বানায় ফেলা জাতি আমরা, আমরা সেই জাতি যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেটে দাঁড়িয়ে গল্প করতে পারি কিন্তু ভেতরে এসে বসতে বললে “আজকে একদম সময় নাই ভাবি, অনেক তাড়াহুড়াতে আছি!” বলি, দিনের পর দিনের নিজেদের ক্রিকেটের খারাপ পারফর্মেন্স দেখেও “পাশে আছি” বলা জাতি আমরা আর সেটার ফলাফলও পাই আমরা কারণ আমাদের ক্রিকেট এখন অনেক উন্নত পর্যায়ে আছে, আমরা সেই জাতি যারা অভিনয় আছে কি নাই সেটার পরোয়া না করে দিনের পর দিন অনন্ত জলিলের সিনেমা দেখি আর তাকে রজনীকান্তের কাছাকাছি পর্যায়ে নিয়ে যাই, বজ্রপাত একবারে আমাদের ৩০ জনের বেশি মানুষকে “খেয়ে দেয়”- এরপরেও আমরাই লড়াই করি, এই কালবৈশাখীর মাঝেও আমরা আম কুড়াই। দিনের পর দিন আমাদের মন্ত্রীদের এক একটা হাস্যকর মন্তব্য সহ্য করা আর সেগুলো নিয়ে ট্রল বানানো জাতি আমরা।

এই তিনজন আমাদের ভয় পাওয়াতে পারেন কারণ তারা জানেন আমাদের মাঝে বিভেদ বেশি, আস্তিক-নাস্তিক, আওয়ামী-বিএনপি তো অনেক পরের ব্যাপার, শুধু সাদা-কালো ইস্যুতেই আমাদের কয়েক সেকেন্ডে ভাগ করে ফেলা যায়।আজকে কালকে শুরু হয়নি এই বিভেদ, এটা সেদিন শুরু হয়েছিল যেদিন আপনি ভিন্ন ধর্মের মানুষকে দেখলেই মালাউন বলে গালি দিতেন, যেদিন আপনি দাড়ি টুপি দেখলেই জঙ্গি বলতেন, যেদিন আপনি ধর্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করলেই তাকে অবিশ্বাসী বলতেন, যেদিন আপনি অবিশ্বাসী বা অন্য ধর্মের মানুষের মৃত্যুতে খুশি হতেন, যেদিন আপনি কালো পিঁপড়া মুসলমান আর লাল পিঁপড়া হিন্দু- এর মতো জঘন্য সাম্প্রদায়িক বাক্য বানিয়েছিলেন, বোরখা পড়লেই ভাল আর জিন্স পড়লেই খারাপ যেদিন বলেছিলেন, যেদিন আপনি রাষ্ট্রের সমস্ত অন্যায় দেখেও মুখ বুজে সহ্য করতেন, পারিবারিক বন্ধনের চেয়ে ফেসবুকের ফেক আইডির দেয়া “হাই জানু” যেদিন আপনার কাছে বেশি আবেদন তৈরি করল, বাবা হয়ে নিজের ব্যবসা আর মা হয়ে নিজের “কিটি পার্টিতে” যেদিন আপনি আপনার সন্তানের চেয়ে বেশি মনোযোগ দেয়া শুরু করলেন, সন্তানকে চুপ করাতে আপনি যেদিন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই তার হাতে ট্যাব তুলে দিয়েছিলেন, নিজের ছেলেমেয়েকে স্বাধীনতা দেয়ার নামে কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে, ফেসবুকে কীসে লাইক দিচ্ছে- এগুলোর খোঁজ নেননি, সন্তান নামাজ পড়লেই খুশি কিন্তু ধর্মটাকে সে ধারণ করছে কিনা, অন্যায় এর প্রতিবাদ করছে কিনা, গরীবদের কষ্ট দেখে তার চোখে পানি আসছে কিনা সেটা দেখেননি, সন্তান চিল্লায় গেলে খুশি কিন্তু তিনদিন বন্ধুদের সাথে বেড়াতে যেতে চাইলে আপনি তেড়ে আসতেন অযথাই- এইসব সমস্যা সেদিন থেকে অল্প অল্প করে কুণ্ডলী পাকিয়েছে, যার ফল আজকে আমরা দেখছি। সব বিষয়ে দ্রুত জাজ করে ফেলা, ভাল খারাপ অতি সহজে জাজ করে ফেলার খেসারত দিচ্ছি আমরা আজ।

সময় আছে এখনও অনেক। ঐক্য রুখে দিতে পারে সব সমস্যা- আমি বাঙালি বা আমি বাংলাদেশী, আরেকজনও এই দেশের নাগরিক আমার মতো, আমার আর তার অধিকার সমান- আপনার এই একটা ধারণাই অনেক প্রবলেম সল্ভ করে দিতে পারে নিমিষে।৭১ এ হাজার হাজার পাকবাহিনীকে ভয় পাইনি আমরা, সেখানে এখন এত সহজে ভয় পেয়ে যাব? ঈদে আমাদের শাকিব খানের তিনটা সিনেমা আসছে, তিনটাতেই খান সাহেব ভিন্নরূপে- চলে যান ফ্যামিলিসহ সিনেমা দেখতে, সময় দেন পরিবারকে। পাশের দেশের সালমান খান সবসময় শার্ট খুলে ফেলেন, এবার প্যান্ট ও খুলে ফেলেছেন ক্যারেক্টারের জন্য, সিনেমার নাম সুলতান- বসে পড়েন ফ্যামিলি নিয়ে দেখতে। আপনার ভয়কে পুঁজি করে কিছু নিকৃষ্ট জীবকে উপরে উঠতে দেয়ার কোন মানেই হয়না।

কাছের মানুষের সাথে সময় দেন, পুরনো বিবাদ মিটিয়ে ফেলেন, একটা কল বা একটা এসএমএস সব সমস্যা শেষ করতে পারে। নিজের বয়ঃসন্ধি পেরুনো ছেলেটার গলার আওয়াজ যে চেঞ্জ হয়েছে সেটা একটু খেয়াল করেন, নিজের ছোট্ট মেয়েটা হঠাৎ করে বড় হয়ে গেছে- সেটা একটু দেখেন। জীবনটা অনেক বড় মনে হবে, জীবনের মানে অনেক বড় হয়ে দেখা দিবে আপনার কাছে, “জীবন মানে জি বাংলার” চেয়েও বড়।

বনের বাঘে খায়না, মনের বাঘে খায়। ভয় পাবেন না, সাহস রাখেন। সন্দেহজনক কিছু দেখলেই পুলিশকে জানান। সবার খোঁজ নেন। এরপরেও যদি বিপদজনক কিছু ঘটেই যায়, তাহলে তো আর বলার কিছু নাই। শুধু একটাই কথা- একা মইরেন না, পারলে দুই তিনটা জঙ্গিরে সাথে নিয়া মইরেন।

ঈদটা “মোবারকের” হবে কিনা জানিনা, তবে এবারের জন্য ঈদটা যেন নিরাপদের হয়। ভালোবাসা ছাড়া কেও বাঁচাতে পারবে না আমাদের, ঘৃণা আমাদের শেষ করে দিবে। আমরা শেষ হতে চাইনা, বিশ্বাস করেন আমরাই থাকব শেষপর্যন্ত- উগ্রআস্তিক, উগ্রনাস্তিক, জঙ্গি, সুশীল- কেও থাকবে না। শুধু বেঁচে থাকার ইচ্ছাটা দরকার, সাহস দরকার। ঈদ মোবারক।

পুনশ্চ- তিন জঙ্গির প্রথমজন ক্লোজআপওয়ানের প্রতিযোগী ছিলেন, ইউটিউব এ তার গান আছে- মন শুধু মন ছুঁয়েছে। যদিও এখন তার মুখে শুধুই- বোম শুধু মানুষ ছুঁয়েছে। নাচ গান করলেই বা সংস্কৃতির সাথে থাকলেই একজন ভাল হয়ে যাবে, এই ধারণাও মনে হয় ঠিক না সবসময়।

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

Ad