‘ভেঙে যেতে পারি, হারবো না’

Ad

২৫ মার্চ, ২০১৬। হোমপেজ স্ক্রল ডাউন করতে করতে চোখে পড়েছিল স্ট্যাটাসটি। পড়ে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলাম। স্ট্যাটাস তো নয়, রীতিমতো অগ্নুৎপাত! শেকলভাঙ্গার গল্পগুলো বুঝি এমনই হয়! স্ট্যাটাসটি হয়তো অনুপ্রেরণা যোগাবে অনেককেইএডিটর

একটা কথা বলি। ফ্রেন্ডলিস্টে আমার সবগুলো আত্মীয় স্বজন আছে (স্ট্যাটাস দেবার সাথে সাথে মা জানবে। ভয় কি? প্রতিটা শব্দ সত্য), তা জেনেও এটা বলছি। বলছি মানে বলতে বাধ্য হচ্ছি।

আজ যদি আমি রেপড হতাম, আমি ২০৭% শিউর, বাসায় ফেরার সাথে সাথে আমার মা আমাকে মেরে তক্তা বানিয়ে দিত। বলতো, “ঠিকই আছে, তুই জামাকাপড় ঠিকমতো পড়িস না। ওড়না ঠিক থাকেনা, ফতুয়া গেঞ্জি পড়ে বাইরে দেহ দেখায়ে বেড়াস। রেপ করবে না তো মাথায় তুলে রাখবে!”

আমাকে যারা চিনে তারা জানবে। আমি ছোট থেকে খুব ভালো নাচ পারি, আবৃত্তি জানি, ছবি আঁকতে জানি, বিতর্ক, গান জানি। জাতীয় পর্যায়ের, বিভাগীয় পর্যায়ের সার্টিফিকেট আমাদের দুই বোনের ঘর ভর্তি ছিল। কিন্তু, যেহেতু আমি মুসলিম পরিবারের, সেহেতু নাচ-গান-ছবি হারাম, এই লজিক দেখিয়ে আমাকে শিশু একাডেমী থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। আমাকে একবার জিজ্ঞেসও করা হয়নি আমার কী ইচ্ছা ছিলো। মেয়েরা “খারাপ” হয়ে যায় এসব করলে।

একবার একটা মুভি করার ডাক আসলো। বেশ ভালো কাহিনী, পরবর্তীতে সেখানে অপু বিশ্বাস কাস্টিং করে। প্রডিউসার আর কে কে যেন বাসায় এসে বসে ছিল স্ক্রিপ্ট নিয়ে, টাকা নিয়ে। আমার মা তাদেরকে খুব বাজে কথা বলে ঘর থেকে বিদায় দেয়। সেটা ২০১০ সালের কথা। আফসোস করিনা। ইচ্ছাও নাই। কিন্তু আম্মুর মতে মিডিয়ায় গেলে মেয়ে “খারাপ” হয়ে যেত।

কোনো এক কর্মশালার জন্য আমেরিকায় লোক নিয়ে যাবে। বাংলাদেশ থেকে শর্টলিস্টেড শিশু শিল্পীর সেই তালিকায় আমি দুই নম্বরে। অবশ্যই যেতে পারতাম। আমার মা তখন আমাকে বলেছে, “তুই কি নর্তকী হবি? আমার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখতে হলে আজ থেকে এসব বাদ। নইলে মরা মুখ দেখবি।” ছোট ছিলাম, ভয় পেলাম যে মা মরে যাবে আমি গেলে! মনের কষ্টে সারাটা দিন নাচের নুপুর জোড়া বুকে ধরে পুকুর পাড়ে কান্নাকাটি করেছি। বাসায় ফিরে আসার সময় পানিতে ফেলে দিয়ে এসেছি। এটা অবশ্যই অনেক বড় সুযোগ ছিলো, আমি যেতে পারি নাই। আফসোস নাই অবশ্য, আমি তার চেয়ে অনেক ভালো অবস্থানে আছি।

এইচএসসি পরীহ্মার রেজাল্ট একটু খারাপ নিয়ে যে কত কী! ৩১ দিন কথাই বলে নাই আম্মু। একটা শব্দও না! আমার মুখ দেখলে নাকি তার ঘেন্না হতো। আমি খাইনি, সারা দিন রাত কান্নাকাটি, সারাদিন কটু কথা। হাতে ধরে যেন আমি আমার জীবন নষ্ট করতে চাইছি! সেই আম্মুকেই যখন দুই দিন পরে বাইরে ভার্সিটিতে স্কলারশিপ পাওয়ার কথা বলি, কথা ঘুরে যায়। একে ওকে কল দিয়ে “ভাবী, আমার মেয়ে তো যাচ্ছে, হু সরকারিভাবে, যে কষ্ট করছি ওর পড়ার পিছনে! দিনরাত বসে পড়াতে হয়েছে!” আমি শুধু শুনি, হাসি পায় আমার।

আমি আম্মুর দোষ দেইনা। সে এভাবেই বড় হয়েছে, এসব শুনেই বড় হয়েছে, এসব দেখে তার চিন্তাভাবনা-কথাবার্তা এরকমই হয়ে গেছে! তার মা এভাবে বলতো, নানুর মা নানুকে তাই বলতো। সেও আমাকে বলেছে। কিন্তু ‘I swear on the name of dark chocolates, I won’t tell these to my children.’

যখন আমি Pastels (অনলাইনভিত্তিক বুটিক শপ) শুরু করি, আমার মা আমাকে প্রচুর জঘন্য কথাবার্তা বলেছে। “সারাদিন হাটে বাজারে ব্যবসা করে বেড়ায়, ভালো মেয়েরা এসব করে না, এত দেরি করে বাসায় আসার কী দরকার ছিল, রাস্তাতেই রাত কাটায়ে দে, তোর মত মেয়ে জন্ম দিয়ে লজ্জা হয়….!” আমি কিন্তু থামিয়ে দেইনি আমার কাজ। কেন থামাব? আমি তো কোনো খারাপ কাজ করছিনা, আইনত নিষিদ্ধ কিছু করছিনা। আমার বিবেকে বলে নাই এটা খারাপ। আমি ছাড়ি নাই। ছাড়বো না। ভেঙে যেতে পারি, হারবো না।

Today, I’m getting featured for my works and I kept quiet and watched her reaction. আম্মু এখন নিউজের প্রিন্ট আউট নিয়ে বসে থাকে, কেউ আসলেই দেখায়। এতদিনের সব কিছু ভূলে আম্মু এখন বলে, “ভালোই  করতেছিলি। দেশেই থাকতি। বাইরে না গেলেই তো ভালো হতো, বিদেশে একা মেয়ে খারাপ হয়ে যায়।আমিও হেল্প করব প্যাস্টেলস-এ।”

আমার খুশিতে লাফালাফি করা উচিৎ।

কিন্তু, আমি এটায় খুশি হতে পারি না। কেন পারি না? কারণ যখন আমার পরিবারকে সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল পাশে, আমি পাইনি। উৎসাহ দেয়া দূরে থাক, উল্টো পকেটমানি আটকে দিয়েছে যেন সেই টাকা ব্যবসাতে না ব্যবহার করতে পারি।

সামান্য ২০ হাজার টাকার জন্য আমাদের ব্যবসা অফ হয়ে যেত, বন্ধুরা ধার দিয়েছে। মা দেয়নি, বাবাও না। আমার বাবা, যাকে আমি দেবতাসুলভ ভাবি, সে দেয়নি। অথচ সে মানুষকে এক কথায় ৫-১০ লাখ লোনের ব্যবস্থা করে দেয়।

I work with Unicef, NCTF, Save the Children’s Australia. Still, I was unable to fulfill my needs and have my legal rights. তারপর?

একদিন খুব ঝগড়া চলছে আমার সাথে মায়ের, এর ভেতর বিদেশি নম্বর (সিডনি হেডকোয়ার্টার, পরে জেনেছি) থেকে কল এলো মায়ের ফোনে। কী বললো জানি না, মা শুধু এটুকু বলেছিল, “না এই নামে কেউ এই বাসায় থাকেনা, যারা ছিল তারা চলে গেছে, আমি জানি না। Don’t disturb!” তারপর, আমার ফোনটা নিয়ে নিল হাত থেকে। আমি তখনো জানি না কী হয়েছে। পরের সপ্তাহে আরেক বন্ধুর কাছে শুনি রাজশাহী বিভাগ থেকে “ক” নামের মেয়েটি যাচ্ছে “খ” ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স এটেন্ড করতে। (নাম বা ডিটেলস উল্লেখ করলাম না) যেখানে আমার যাবার কথা, আমার মা নাকি নিষেধ করে দিয়েছে, তাই সেই মেয়েকে নেয়া হলো! বাহ। ফোন নিয়ে নেওয়ায় মেইল চেক করতে পারিনি। তারা আমাকে ১৩ টা মেইল দিয়েছিলো।

বাহ বাহ বাহ!

যখন আমি বাইরে ছুটোছুটি করে কাজ করেছি, তখন শোনা লাগে এসব কাজ ভদ্র মেয়েরা করেনা। যখন বাসায় বসে থেকেছি, শুনেছি, “সারাদিন এত বড় মেয়ে বাসায় খাটে বসে খায় আর ঘুমায়। দিন দিন হাতি হচ্ছে।” আমি যাবোটা কই!

তবুও, আমিই কিন্তু আম্মুর বেস্ট ফ্রেন্ড। তাকে নিয়ে মজার মজার স্ট্যাটাস দেই ফেসবুকে। সবাই পড়ে আর হাসে। কত সুখ! আমি জানি তার মত নিঃসঙ্গ মানুষ আর নেই। একা বাসায় বসে থাকে। আমার সাথে ফোনে একটু ঝগড়াঝাঁটি করে তার দিনের সামান্য অংশ এনটারটেইন্ড হয়। আমি মেনে নেই যে সবাই সব পায় না। আমি আমার বড় বোনের মত খুব ভালো রেজাল্ট নিয়ে ডাক্তার না হতে পারি, খুব ভালো মেয়ে না হতে পারি। তবে আমি চেষ্টা করি একজন ভালো মানুষ হবার।

মা,

এমন দিন আসবে, যেদিন তুমি গর্ব করে বলবা তুমি আমার মা। (ঈষৎ সম্পাদিত)

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

Ad