ফিচারটি যতবার পড়া হয়েছেঃ 24

বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ক্রসফায়ার এবং সংকটময় ভবিষ্যৎ

Ad

লাখো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে আমরা একটি নতুন পতাকা পেয়েছিলাম। পতাকাটি ছিল বাংলাদেশ নামক একটি গণতান্ত্রিক, স্বাধীন, সার্বভৌম দেশের প্রতিনিধি। যে স্বপ্ন ও মূলনীতি নিয়ে নতুন দেশটি তাঁর পথচলা শুরু করে, সেগুলো একত্রে লিপিবদ্ধ হয় বাংলাদেশের সংবিধানে। সংবিধানের মূল দর্শন সংক্ষেপে তুলে ধরা হয় ‘প্রস্তাবনা’ অংশে। যেখানে সুস্পষ্টভাবে অঙ্গীকার করা হয়, “আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা, যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।” স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর এসে আমরা কতটুকু শোষণমুক্ত সমাজ গড়তে পেরেছি সেটা তর্কসাপেক্ষ। তার চেয়ে বরং আজ কথা বলছি আইনের শাসন নিয়ে। বাকি বিষয়গুলো নিয়ে নাহয় পরে একদিন আলোচনা করা যাবে।

আইনের শাসন মূলত একটি ধারণা। এর মূল কথা হলো- রাষ্ট্র ব্যক্তি নয়, বরং আইনের দ্বারা পরিচালিত হবে। সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আইনের দৃষ্টিতে সমান চোখে দেখা হবে। এই একই কথার পুনরাবৃত্তি দেখা যায় সংবিধানের ২৭ নং অনুচ্ছেদেও। আক্ষেপের বিষয়, সংবিধান কিংবা আইনে যা-ই লেখা থাকুক না কেন, বাস্তবে প্রয়োগের জায়গাটা বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন যেকোন বাংলাদেশীর মনে হতাশা সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট।

সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা। এটা নিয়ে দেশে ও বিদেশে তোলপাড় হয়ে যাবার পরেও প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের সম্মুখীন করা, কিংবা ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের তৎকালীন ভূমিকা সম্পর্কে বিশদ প্রতিবেদন জনসম্মুখে আসেনি। এমনকি অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীও এসকল ঘটনার দায় সরাসরিই এড়িয়ে গেছেন। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে আইনের শাসন অনুপস্থিত এবং বিচারহীনতা স্পষ্টতই দৃশ্যমান।

একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা যায়, তনু হত্যা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে চলমান একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও। প্রতিটা হত্যাকাণ্ডের পর দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা আমাদের পুরো সিস্টেমকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। এই লেখাটা যখন লেখছি, ঠিক তার দুদিন আগেও কথিত ক্রসফায়ারে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে রিমান্ডে থাকা গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিম নামের একজন নিহত হয়েছেন। যে কিনা মাদারীপুরে একজন শিক্ষককে হত্যা করতে গিয়ে জনগণের হাতে আটক হয়েছিল। লক্ষণীয় বিষয়, এই হত্যার ফলে সাধারণ মানুষের মাঝে দুই ধরণের প্রতিক্রিয়া হয়েছে। এক দলের মতে, যেহেতু প্রচলিত বিচারিক প্রক্রিয়ায় অপরাধীদের দ্রুততার সাথে সাজা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রেই তারা জামিনে বেরিয়ে আসছে, তাই এটাই অপরাধীদের দমনের সঠিক পদ্ধতি। এই ধারণার সব থেকে ভয়াবহ দিক হলো, যদি এটা স্বীকার করে নেওয়া হয় যে বিচার বিভাগ তার দায়িত্ব পালন করতে পারছে না, তবে বিচার বিভাগের পুরো কাঠামোটাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়! অন্যভাবে বলা যায়, আমাদের সংবিধানের মাধ্যমে যে ‘আইনের শাসনের’ কথা বলা হয়েছে সেই পুরো ধারণাটাকেই চ্যালেঞ্জ করা হয়। দ্বিতীয় দলের মতে, এই ধরণের ক্রসফায়ারের ফলে মূল অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে লিমনের মত নিরীহ মানুষদের ভিকটিম হবার আশংকা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই আশংকা যে অমূলক নয় তা বলাইবাহুল্য।

এই দুই মতবাদের বাইরে গিয়ে একজন আইনের ছাত্র হিসেবে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরী মনে করছি। আইন মতে, একজন মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত না সাক্ষ্য প্রমাণ দ্বারা আদালতের মাধ্যমে অপরাধী হিসেবে ঘোষিত হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে নিরপরাধী বলে বিবেচনা করতে হবে। তাই বিনা বিচারে এমন প্রতিটি হত্যাই অন্তত আইনের চোখে নিরপরাধ মানুষের হত্যাকাণ্ড। ফলে, যারা এসব ঘটনায় নিহত হচ্ছে তাদের পরিবারের সদস্যদেরকেও যে কেউ ভুল বুঝিয়ে সহজেই প্রতিশোধপরায়ণ করে তুলে ভয়াবহ নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পারে। অপরদিকে, গ্রেফতারের সাথে সাথেই ক্রসফায়ার দেওয়ার সংস্কৃতি চালু থাকলে মূল পরিকল্পনাকারীরা সবসময়ই নিরাপদে থেকে যাবে।

তাই এমতাবস্থায় বিচার বিভাগ ও মান্ধাতা আমলের সকল আইনের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে যুগোপযোগী করা সময়ের দাবী। একইসাথে ক্রসফায়ার নামক অপসংস্কৃতির জরুরী ভিত্তিতে অবসান করা উচিত। নয়তো আমরা ধীরে ধীরে হয়তো এমন এক অন্ধকারের দিকে ধাবিত হব যেখান থেকে চাইলেও হয়তো আর ফিরে আসা যাবে না।

তাপস পাল
মাস্টার্স শিক্ষার্থী,
আইন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
(এই লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য- লেখকের একান্তই নিজস্ব। egiye-cholo.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে egiye-cholo.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না)

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (No Ratings Yet)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

Ad