প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি ও কুয়োর ব্যাঙ তত্ত্ব

আবার এইখানেই এমন সব ছাত্র ছাত্রী আছেন, ছিলেন, থাকবেন-যারা প্রতি মূহুর্তে আপনাকে চমকে দেবে- মেধায়, প্রজ্ঞায়-চিন্তার শানিত তরবারির ধারে!

লিখেছেন- কাজী তাহমিনা

কাজী তাহমিনা

আনিসুল হকের তিন কাঠায় প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি ও কুয়োর ব্যাঙ তত্ত্ব পড়লাম। অতি সাধারণীকরন(over generalization) ও অতি সরলীকরণ(over simplification) সম্পর্কে উনার ধারণা থাকা উচিত এবং সঙ্গত কারণেই এক পাল্লায় সমস্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মেপে ফেলার প্রবণতা নিয়েও সতর্ক থাকা উচিত বলেই মনে করি।

আমি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাড়ে সাত বছর ধরে পূর্ণকালীন শিক্ষক হিসাবে পড়াচ্ছি এবং আরো একটিতে এক বছর খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগে এক বছর খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসাবেও কাজ করেছি। এই দীর্ঘ সময়ে বহুবারই আমি আমার বেশ কিছু ছাত্র-ছাত্রীর মননশীলতা, চিন্তা করার নতুনত্ব ও নিষ্ঠা দেখে যেমন চমৎকৃত হয়েছি, তেমনি কারো কারো অমনোযোগিতা, জীবনের চমৎকার সুযোগগুলোকে অবলীলায়, অবহেলায় হারিয়ে যেতে দেয়ার প্রবণতায় অবাক এবং ব্যথিতও হয়েছি।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যায়ক্রমে দু’দুটি ক্লাব- ডিবেট ক্লাব ও রাইটার্স ফোরামের কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্ব পালনকালে আমি দেখেছি তথাকথিত ‘অমেধাবী’/’টাকার জোরে ডিগ্রি সংগ্রহকারী’ ছাত্র-ছাত্রীরাও কি বিপুল সম্ভাবনার অধিকারী! কিছুদিন আগে হয়ে যাওয়া ‘স্পেলিং বি’, চিঠি লেখা প্রতিযোগিতা, শৈশবের গল্প লেখার আসর, নাট্যোৎসব, বিজনেস চ্যালেঞ্জ, ম্যাথ অলিম্পিয়াড,মুট কোর্ট এবং আরো অনেক অসংখ্য প্রতিযোগিতার আসরে কোথাও বিচারক, কোথাও দর্শক , কোথাও পরামর্শক হিসাবে আমি দেখেছি -আমাদের ছেলে মেয়েরা কি অপূর্ব মেধার/ প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের/ নতুন ধ্যান -ধারণার অধিকারী।

তবে সবাই যে এরকম, তা অবশ্যই নয়। আমার অভিজ্ঞতা ও ধারণা বলে যে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন কম পরিশ্রমী, অচিন্তক, মুখস্থবিদ, ডিগ্রিকামী বেশ কিছু শিক্ষার্থী রয়েছে; খুঁজলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও তেমন অনেক শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে। তার মানে নিশ্চয়ই এই নয়, যে সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্র-ছাত্রীরাই এমন! আমি নিজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে পড়া লেখা করার সময় এবং পরবর্তীতেও দেখেছি, ইংরেজি বিভাগের অনেক ছাত্র- ছাত্রীও ঠিক ঠাক ইংরেজি বলতে ও লিখতে ভুল করেন। সাহিত্যের ছাত্র-ছাত্রী হয়েও মুখস্থবিদ্যায় তারাও কেউ কেউ কম যান না! আবার এইখানেই এমন সব ছাত্র ছাত্রী আছেন, ছিলেন, থাকবেন-যারা প্রতি মূহুর্তে আপনাকে চমকে দেবে- মেধায়, প্রজ্ঞায়-চিন্তার শানিত তরবারির ধারে!

তাই সরকারি বা বেসরকারি- যে কোন ধরণের বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ঢালাও মন্তব্য করা- আসলে নিজেকেই কুয়োর ব্যাঙ প্রতিপন্ন করার নামান্তর।

আর আনিসুল হক সম্ভবত জানেননা যে, বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া) নিয়োগ প্রক্রিয়া এখন পর্যন্ত রাজনীতি ও চাটুকারিতামুক্ত। এখানে শিক্ষকদেরকে ক্রমাগত ছাত্রদের দ্বারা পরীক্ষিত হয়ে (স্টুডেন্টস্ ইভালুয়েশন) টিকে থাকতে হয় এবং নিজের জন্যই বারে বারে নিজেকেই ছাড়িয়ে যেতে হয়। এছাড়াও বটবৃক্ষ হিসাবে মাথার উপরে কিন্তু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঘা বাঘা শিক্ষকরাই আছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাথা হয়ে।

তাই, অনুরোধ জানাচ্ছি ও আশা করছি যে, জনাব আনিসুল হক অতি উৎসাহী হয়ে অতি অবাস্তব গল্প বানানো অন্য কোথাও চর্চা করবেন- কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সম্পর্কে ঢালাও আষাড়ে গল্প বানিয়ে ও ছড়িয়ে নিজেকে কুয়োর ব্যাঙ বানাবেন না!

-কাজী তাহমিনা,
শিক্ষক,
ইংরেজি বিভাগ, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি।
  • আরও পড়ুন

# কোথায় শান্তি পাবে তুমি, কোথায় গেলে?

# রাষ্ট্র তুমি নতজানু হও কার কাছে?

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-