রিডিং রুম

দেনা পাওনা

‘এগিয়ে চলো’-এর পাঠকদের জন্য রাফিউজ্জামান সিফাত ভাইয়ার ঈদ উপহার!

 

(১)

আমি কি পাষাণ? প্রায় সাতত্রিশ বছর যে মানুষটি আমার জীবনসঙ্গী ছিল, ছিল আমার সমস্ত জানা অজানা জড়িয়ে, তার মৃত্যু আমাকে ব্যথিত করছে না। কেন জানি না, রাবেয়ার মৃত্যু আমি স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছি। রাবেয়া যে অনেকদিন যাবৎ অসুস্থ ছিল তা নয়, ডায়বেটিকস, হাই প্রেশার কিছুই নেই।একদিন সকালে আমার চা দিতে দেরী হচ্ছিল। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে সকালেরচা আমার ঠিক সময়ের এদিক সেদিক হয় না। আমি রাবেয়া বলে একটি ডাক দিয়েছিলাম। কোন কারণে দেরী হলে সেই একটি ডাকই যথেষ্ট। সেই ডাকের উত্তর আসেনি। সাতত্রিশ বছরে প্রথম সেই উত্তর আমি পাইনি, আর পাবো না।

অনেকদিন যাবৎ আমরা আলাদা বিছানায় ঘুমাই। বড় বাড়ির উত্তর দিকের কোণার রুমে আমার ঘাটি। চাকুরী থেকে অবসরের পর বই, লেখলিখি আর আমি। আমার অপ্রকাশিত সেই লেখাগুলো নিজের মতো সাজিয়ে আমার জগৎ গড়ে নিয়েছিলাম। রাবেয়া থাকতো অপরদিকে দিকে তার ছোট নাতনীর সাথে। প্রতি সকালে আমাদের দেখা হতো চা দেয়ার ছলনায়।

ছলনা? হুম, ছলনা শব্দটিই হয়তো সঠিক। তা না হলে রাবেয়ার মৃত্যু আমাকে স্পর্শ করছে না কেন।

বেশ কয়েক বছর যাবৎ খুব সাধারণ ছিল রাবেয়ার সাথে আমার দৈনন্দিন জীবন। কোনকালেই আমাদের ভিতর খুনসুটি ছিল না। ইদানীং তো প্রয়োজন ছাড়া কথা বলাও প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। আমার জানা মতে তার তেমন কোন চাওয়া পাওয়া ছিল না। কেবল তার গ্রামের বাড়ি বগুড়ায় যেতে চাইতো প্রতি বছরে একবার। এই সামান্য চাওয়াও হয়তো ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা, আমার অফিসের আগে সাজিয়ে দেয়া টিফিন ক্যারিয়ারের বাহানায় হয়ে উঠত না।

তাই প্রতি সকালে চা নিয়ে আসাটাই আমাদের কথা বলার একটি উপলক্ষ। চা আমার টেবিলে রেখে সে কিছুক্ষণ বসতো আমার বিছানায় কোণায়। জানালার দিকে মুখ করে। আমি চায়ে চুমুক দিতে দিতে তাকে পড়ে শুনালাম আমার রাতে লিখে রাখা জমানো লেখা। সে শুনতো। কোন কথা বলতো না, কেবল শুনতো। চা শেষ হলে খালি পিরিচ নিয়ে নীরবে চলে যেতো। এইটুকুই।

দৈনিক ওষুধের সময় হলে কাজের মেয়েকে দিয়ে ওষুধ পাঠাত, খাওয়ার সময় আমি নিজে চলে আসতাম ডাইনিং রুমে। চেয়ার টেনে চুপচাপ বসে থাকতাম। সে পাশে দাঁড়িয়ে আমার পাতে ভাত তরকারী বেড়ে দিতো, সেখানেও কথা হতো না তেমন। মাঝে মধ্যে হয়তো বলতো,

-এমদাদের শ্বশুরবাড়ি থেকে আগামীকাল রাতে দাওয়াত দিয়েছে, যাবে?

-তুমি যাও, ঘুরে এসো।

-আরেকটু মাছের ঝোল নিবে?

-দাও একচামচ।

আর রাতে শোয়ার আগে একবার ঢু মেরে যাওয়া।

-কিছু লাগবে?

বরাবরের মতো আমি  লেখার খাতায় মুখ ডুবিয়ে জবাব দিতাম – না।

(২)

রাবেয়া চলে গেছে প্রায় এক সপ্তাহ। ছোট ছেলে এমদাদ কানাডা থেকে এসেছিল মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার তিনদিন পর, তার জন্যই লাশ প্রিজার্ভ করে রাখা ছিল মর্গে। সেই তিনদিন বাড়ির কেউ না কেউ হাসপাতালে যেতো একবার করে লাশ দেখে আসতো। আমি যাইনি। রাবেয়ার লাশ আমায় টানেনি। ওরা বলাবলি করছিল শোক কাটিয়ে উঠতে ইকবাল সাহেবের সময় লাগছে। উনি বড় ধাক্কা পেয়েছেন।অবাক হতাম। ধাক্কা, কিসের ধাক্কা! আমি তো কিছুই ফিল করছি না। আমি কয়েকবারই বলতে চেয়েছিলাম– তোমরা ভুল ভাবছো, আমি শোকগ্রস্ত নই। আমি অনুভূতি শূন্য। অনুভূতি শূন্য মানে কিছুই বুঝতে পারছিনা, তা নয়। মশার কামড় টের পাচ্ছি, ইদানীং খুব গরম পড়েছে, মশারী টাঙ্গানো যাচ্ছে না। কয়েলেও কাজ হচ্ছে না। সারারাত বসে মশার কামড় টের পাচ্ছি, কিন্তু রাবেয়া নামের সাতত্রিশ বছরের জীবনসঙ্গীর হারিয়ে যাওয়া আমি টের পাচ্ছি না।

রাবেয়া মারা যাওয়ার পর বড় যে সমস্যা হয়েছিল আমার ওষুধ মেইন্টেন। রাবেয়া এইটার দেখভাল করতো। সময়মত পৌঁছে দিতো। তার রুমেই ছিল ওষুধের বক্স। যেদিন মারা গেল সেদিন সকালের খাবার হয়নি কিন্তু ওষুধ খাওয়াটা আমার হার্টের জন্য জরুরী ছিল, আমি রাবেয়ার ঘরে গিয়েছিলাম, আমায় দেখে বড় মেয়ে বলল– বাবা এসেছে। দেখলাম ঘর ভর্তি মানুষ ধীরে ধীরে বের হয়ে গেল। তারা ভেবেছে আমি রাবেয়ার সাথে একা সময় কাটাতে চাই।

ওষুধের বক্স খুঁজতে অস্বস্তি হচ্ছিল। আমি আর চোখে সমস্ত রুমে চোখ বুলালাম। অনেকদিন আসা হয় না এই রুমে। রুমটা আগের মতোই আছে, সেই খাট, আলমারি সেই আগের জায়গায়। শোকেজ, সেলাই মেশিন। সব ঠিক আগের মতো। আচ্ছা রাবেয়া কি এখনো সেলাই করতো? অনেক দূরে রুম, শব্দ পেতাম না। তবে মাঝে মধ্যে তার চোখে চশমা দেখেছি, নিশ্চয়ই সেলাই করবার কর্মফল।

বেশী খুঁজতে হল না। দেখলাম তার খাটের মাথার কাছেই বক্সটি। চট করে পাঞ্জাবীর ভিতরে বক্সটি লুকিয়ে বেড়িয়ে আস্তে গিয়েও থমকে দাঁড়ালাম। রাবেয়াকে বেশ শান্ত দেখাচ্ছে। একটা সাদা চাদরে গলা পর্যন্ত ঢাকা তার শরীর। চুলে পাক ধরেছিল রাবেয়ার। মুখে বয়সের ভাঁজ। তারপরও কি সিগ্ধ লাগছে!!

এমনিতেও সে খুব শান্ত স্বভাবের মেয়ে ছিল। কখনো জোরে কথা বলেনি, আমার প্রতি তার কোন দাবী কিংবা চাওয়া ছিল না। চুপচাপ আমার মতো খেয়ালি মানুষকে নিয়ে এতো বড় সংসার সে এক হাতে সামলে এসেছে।এখনো স্পষ্ট মনে আছে বিয়ের সময় আমার মা বলেছিল– খোকা, আমি তোকে রাজরানী এনে দিতে পারেনি, কিন্তু লক্ষ্মী একটা বউ এনে দিয়েছি, যে তোকে আগলে রাখবে। রাবেয়া আগলে রেখেছিল। আমাকে, তার সংসারকে।

(৩)

করুণা পেতে আমার ভালো লাগে না, আজকাল বাজারে যাওয়া যায় না, সবাই কেমন করে জানি তাকায়। ভয়ে থাকি কে কখন বুকে জড়িয়ে নেয়। বিশ্রি অবস্থা। সেদিন স্যান্ডেল ছিঁড়ে গেল, মুচির কাছে গেলাম সেলাই দিতে।এক পাটি স্যান্ডেলের সাধারণ সেলাই খুলে যাওয়া ঠিক করতে ব্যাটা চেয়ে বসলো পাক্কা বিশ টাকা। বড়জোর দশ টাকা হতে পারে। আমিও তর্ক জুড়ে দিলাম। পরক্ষনেই মনে পড়লো গত পরশু আমার স্ত্রী মারা গিয়েছে, আর আজ মুচির সাথে দশ টাকা নিয়ে তর্ক করছি? লজ্জিত চোখে আশেপাশে তাকালাম। ভাগ্যিস কেউ ছিল না। স্যান্ডেল আর সেলাই করা হয়নি, আমি চলে এসেছিলাম।কিন্তু ছেঁড়া স্যান্ডেল পড়ে কয়দিন থাকা যায়?

সত্যি বলতে  আমি বুঝতে পারছি না, আমার কি করা উচিৎ। অনেকেই আসছে, আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, হাত মুঠি করে শক্ত করে এমনভাবে ধরে রাখছে যে রক্ত চলাচল বন্ধ হবার উপক্রম। আমি অস্বস্তি অনুভব করছি। বড্ড হাঁসফাঁশ লাগছে। অথচ কাউকে কিছু বলতে পারছি না, কেউ বুঝতে পারছে না আমার কাউকে দরকার নেই। আমি চিৎকার করে ওদের মুখের উপর বলে দিতে চাচ্ছি-  আমার সান্ত্বনার দরকার নেই, প্লীজ fuck off.  কিন্তু সদ্য স্ত্রী মারা যাওয়া স্বামীর মুখে এইসব শব্দ মানায় না। আমি সয়ে যাচ্ছি। জোর করে দুঃখী সাজিয়ে রাখা এ আমাদের অদ্ভুত সমাজ।

 

(৪)

রাত জাগা আমার অভ্যাস। রাতে তাই বিস্কুটের পটে কিছু না কিছু থাকে। গতকাল শেষ রাতে প্রচন্ড ক্ষুধায় পট খুলে দেখি কিচ্ছু নেই। ক্ষুধা আমি সহ্য করতে পারি না। এই শেষ রাতে মরা বাড়িতে আমি কোথায় খাওয়া খুঁজবো?

কোলবালিশ পেটে চাপা দিয়ে আমি চুপ করে শুয়ে ছিলাম। ভাবছিলাম, আর কয়েক ঘণ্টা। ভোরের আলো ফুটলে রাস্তায় বেড়িয়ে পড়বো, চৌরাস্তার দোকান সকাল সকাল খুলে যায়। পোরটা আর পায়া দিয়ে একটা রাজকীয় ভোজ হয়ে যাবে। হঠাৎ লালা গড়িয়ে বালিশ ভিজিয়ে দিল।

ছি ছি, কি লজ্জা। এতো বয়স্ক মানুষের এইসব মানায়? আমি ক্ষুধা পেটে এপাশ ওপাশ করছি।

কিছু লাগবে?

চমকে আমি তাকালাম দরজায়। বন্ধ দরজা। কেউ নেই। রাবেয়ার গলায় কে কথা বলল? নিশ্চয়ই কোন বইয়ের প্রভাব। এখন পড়ছিলাম – আগাথা ক্রিস্টির ‘দা বিগ ফোর’ সাইকলজিকাল থ্রিলার। হয়তো মাথায় এইসবই ঘোল পাকিয়ে কিছু শুনাচ্ছে। আমি ঘুমাতে চেষ্টা করছি। আমার কিছু লাগবে না। আমার কখনো কিছু লাগেনি। আমার কাউকে দরকার নেই। আমার কিছু লাগবে না।

(৫)

বাড়ি ধীরে ধীরে খালি হয়ে যাচ্ছে। এমদাদ পনেরো দিনের ছুটি নিয়ে এসেছিল। সে ফিরে গেছে। বড় মেয়ে আপাতত  তার স্বামীর কাছে যশোরে। ছেলে আর্মি পারসন। সেখানেই পোস্টিং। মেয়ে ঢাকায় আমাদের কাছে থাকতো। এখন মা নেই, তার নাকি মরা বাড়িতে ভয় করে। তবে নাতনীটা যাওয়ার আগে খুব কাঁদছিল। সেই তো নানুর সাথে ছিল সারাটা সময়। বেচারী। এ জগতে কেউ কারো নয়। বুঝতে শিখছে, মানতে পারছে না। তাই কান্নাকাটি।

আমি কিছুটা রিলিফ ফিল করছি।মানুষ যত কম হবে তত ভালো। এই কয়দিন একটা অনিচ্ছাকৃত দুঃখী দুঃখী মুখ করে চলাফেরা করতে হতো। এখন স্বস্তি। লেখাটা শেষ করতে পারবো। দীর্ঘদিন যাবৎ আমি কিছু লিখতে চেষ্টা করছি। হয়তো উপন্যাস হয়ে যাচ্ছে, আমি জানি না কি। যা মনে আসছে লিখছি। চাকুরীর পর অবসরে এই লিখাটাই যেন আমকে বাঁচিয়ে রেখেছে।কাউকে বলিনি লিখাটার কথা। বন্ধু বান্ধবরা আসতো আড্ডা দিতে, একেকজন দলবেঁধে বেড়াতে যাচ্ছে, কে কেউ ছেলেমেয়ের বাসায় যাচ্ছে, দেশে বিদেশে। আমি আমার উত্তরের কোণার ঘরে খুটি গেঁড়ে পড়ছিলাম আর লিখছিলাম।

এখন বাসা খালি। কাজের মেয়েটা খাওয়ার সময় হলে ডাক দেয়। খেয়ে আবার রুমে চলে আসি।  নির্ঝঞ্ঝাট জীবন। এমন দায়িত্ববিহীন, ঝামেলাহীন জীবনই আমি আশা করেছিলাম।

টেবিলে আলো এসে পড়ে। সকালের তাজা আলো। মিষ্টি গন্ধ, সামনের বাসার বকুল গাছের। আমি লেখার টেবিলে বসি। পাশেই চায়ের ফ্লাক্স। কিনে এসেছি। সকালে পিচ্চিকে দিয়ে দোকান থেকে ফ্যাক্স ভর্তি চা আনিয়ে রেখেছি। বিকল্প ব্যবস্থা। কলম খুলি। অনেকদিন যাবৎ আটকে থাকা লেখাটি শেষ করতে চাই। আমি শুরু করি।লিখি।টানা একটার পর একটা পাতা ভরে উঠে শব্দের যান্ত্রিকতায়, আমি থামি না, থামতে পারি না। মনে ভরে আমি লিখে যাই। আমার সবটুকু ভালোবাসা আমি কাগজে ঢেকে দিয়ে লিখে চলি। তৃপ্তি নিয়ে লিখে চলি আমার প্রথম উপন্যাস।
(৬)

শেষ রাত। আমি কলমের খাপ বন্ধ করলাম। হাত ভর্তি কাগজ। আমার উপন্যাস। সমাপ্ত। অথচ আমি অস্থির। আমার পড়ে শুনাতে হবে। কাউকে আমার লেখাগুলো পড়ে শুনাতে হবে।

ভোরে আলো ফুটছে এমন সময় আমি আমার কালো হাত ব্যাগে পান্ডুপিলি আর একটা চাদর নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। ঢাকা থেকে বগুড়া যাওয়ার প্রথম বাস ছয়টায়, মিস করতে চাচ্ছি না। রাস্তা ফাঁকা। রিক্সা নেই। আমি জোরে জোরে পা চালাই।

(৭)

সুনসান নীরবতা। চারিপাশে কেউ নেই। মাঝে মধ্যে অচেনা পাখির ডাক। আমি মাটিতে হাঁটু গেঁড়ে বসি। সামনে পাণ্ডুলিপি খোলা। রাবেয়ের কবরের সদ্য লাগানো শিমুল গাছের চারা বাতাসে দুলছে। আমি পড়া শুরু করি – “ভালোবাসা, তোমায় দিলাম”

Comments
Tags
Show More

Related Articles

One Comment

Close