দুই চাকায় বাংলাদেশ

দেশের একমাথা থেকে সাইকেল নিয়ে দেশের অন্য মাথায় যাওয়ার ইচ্ছেটা অনেকদিনের। অবশেষে গত বছর অক্টোবরের শুরুতে স্বপ্নটা পূরণ হয়েছে। তেতুলিায়ার বাংলাবান্ধা সীমান্ত থেকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত। পথে পথে এগারো দিন।

সাইকেল রাইডের সময় পথে পথে মানুষের নানান প্রশ্ন, মন্তব্য, আর কৌতুহল মেটাতে হতো। সবচেয়ে কমন প্রশ্ন হচ্ছে ‘ভাই আপনে রাইডটা কেন দিচ্ছেন?’ এর কোন উত্তর হয়না। সেই নীলফামারী রংপুর থেকে শুরু করে পুরো পথে অনেকেই জিজ্ঞেস করেছে সরকার আমাকে ঘোরার জন্য টাকা দেয় কিনা। তাদের ধারণা সরকার টাকা দেয়, প্রতি জেলায় থাকা খাওয়ার ব্যাবস্থা করে দেয়। অনেকের ধারণা ব্যাপারটা পোস্টপেইড। মানে রাইড শেষ করতে পারলে সরকার টাকা দিবে। টাঙ্গাইলে একজন জিজ্ঞেস করেছে এটা কি আমি গিনেজ বুকে নাম উঠানোর জন্য করতেছি কিনা? সবচেয়ে মজা পেয়েছিলাম বগুড়ার কাহালুতে এক লোকের ধারণায়। একটা বাজারে সবাই ঘিরে ধরেছে। একজন জিজ্ঞেস করলো রাইড কেন দিচ্ছি? পাশ থেকে আরেকজন মতামত দিয়েছিল “এইটা আমেরিকান ভিসা পাওয়ার জন্য করতেছে!” কয়েকজন তাকে সমর্থনও দিয়েছে। কুমিল্লায় ভরদুপুরে এমন একটা জায়গায় সাইকেলের ব্রেক নষ্ট হয়েছে আশেপাশে কিছু নাই। গ্রামের একটা বাজারে গেছি ঠিক করতে। একটা ছেলে জিজ্ঞেস করতেছে ‘ভাই আপনি কি মডেল করতেছেন?’ আমি প্রথমে বুঝি নাই। পরে বুঝেছিলাম সে জিজ্ঞেস করতেছে আমি সাইকেলের মডেল কিনা। আমার যে চেহারা, আমি মডেল হলে ঐ সাইকেল আর বিক্রিই হবেনা।

12087316_841192805999211_2771888578083879141_o

 

শাহ পরীর দ্বীপে একটু পরপর সাঁকো পার হতে হয়। সাঁকো পার হতে এখনো আমার হাঁটু কাঁপে। তার উপর সাইকেল পার করতে হচ্ছিলো। আমার জন্য রীতিমতো পানিপরীক্ষা। তবে দুপাশ মন ভরিয়ে দেয়। দুপাশেই সাগর। সাগর পাড়ে বিস্তৃর্ণ লবন ঘের। মাঝে মাঝে কিছু ঘর দেখে মন খারাপ হয়। টিনশেড, সামনে বারান্দা, একপাশে রান্নাঘর, সুন্দর ডিজাইন। কিন্তু এখন পরিত্যাক্ত। কারণ জোয়ারের সময় ঘরে এখন গলা সমান পানি থাকে। পরিবারটা এখন হয়তো উদ্বাস্তু। তাদের সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে হয়তো বাড়িটা বানিয়েছিলো। একটা বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়াতে এই অবস্থা। এখান থেকে বসতি আধা কিঃমিঃ দূরে সরে গেছে। ঐরকম একটা সাঁকো পার হওয়ার পর দেখি দুইজন লোক টেবিল পেতে টাকা তুলছে। তারাই সাঁকোটা বানিয়েছে। এজন্য টাকাটা তুলে নিচ্ছে, টোল বলা যায়। সাঁকো পার হওয়ার পর তাদের একজন বলতেছে পাঁচ টাকা দিতে। পাশ থেকে অন্যজন সাইকেলে পতাকা দেখে বললো ‘উনি সরকারী লোক, উনার টাকা লাগবেনা, ভাই যানগা।’ আমিও মজা পেয়ে হেলেদুলে চলে আসছি। পুরা ট্যুরে এই পাঁচ টাকাই সেভ হয়েছে। তাও পতাকার জন্য। এবার অন্য জায়গার আরেকটা ঘটনা। সাইকেলের কিছু একটা নষ্ট হয়েছে। একটা দোকানে ঠিক করতে গিয়েছি। পাশ থেকে এক লোক রেগে বললো ‘সাইকেলে কেন পতাকা লাগাইছেন? এই পতাকা পতাকা করেই দেশটা গেলো! পতাকার দোহাই দিয়ে পুরা দেশ লুট হইতেছে।’ একটু পর ঐ লোক নিজেই সরি বলেছে। মানুষের এরকম আক্রোশের কারণ নিশ্চই আছে। তবে আক্রোশটা পড়তেছে ভুল জায়গায়। স্থান সীতাকুন্ড।

হাইওয়েতে চালানোর ব্যাপারে সবাই সাবধান করেছিল। এজন্যই ভয় পাচ্ছিলাম। পরে হাইওয়েতে প্রায় ৬/৭শ কিঃমিঃ চালিয়ে ভয় কেটে গেছে। যদিও বড় ধরণের এক্সিডেন্ট হওয়া এক সেকেন্ডের ব্যাপার। সবাই ঢাকা চিটাগাং হাইওয়ের কথা বলছে অথচ সবচেয়ে বেশি কঠিন মনে হয়েছে যমুনা সেতুর ওপারের একশ কিঃমিঃ। পেছন থেকে যখন সাই সাই করে বাস আসে তখন হর্ণ লাগেনা, গাড়ির আওয়াজ শুনেই বোঝা যায় একশ কিঃমিঃ স্পীডে দানব আসতেছে। ঐ রোডে গাড়িও বেশি। অনেকগুলো জেলার গাড়ি এক রাস্তা দিয়ে চলে, কারণ একটাই পথ যমুনা সেতু। ঢাকা চিটাগাং হাইওয়েতে বাস কম, ট্রাক কাভার্ড ভ্যান লরি অনেক বেশি। পাশ দিয়ে যখন ত্রিশ টনের লরি যায় তখন কলিজা সাথে থাকেনা।

12109835_841312012653957_8551738226704638990_o

চালাতে চালাতে গাড়ি নিয়ে অনেক গবেষণাও করেছি। রাস্তায় সবচেয়ে নিয়ম মেনে গাড়ি চালায় ট্রাক লরির ড্রাইভাররা। একটা লাইন ধরে সুশৃঙ্খল ভাবে চালায়। অথচ সবাই তাদের দোষ দেয়। বাস ড্রাইভাররা কোন নিয়মতো মানেই না, উল্টো বেপরোয়া। ট্রাকগুলো এক্সিডেন্ট করে অন্য গাড়ির জন্য অথবা মাত্রাতিরিক্ত লোড নেওয়ার কারণে। রাস্তায় থ্রি হুইলার বন্ধ রাখতে পারলে এক্সিডেন্ট অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব।

ডোমার দিয়ে নীলফামারী ঢুকে মীরগঞ্জ, টেংগনমারী, কিশোরগঞ্জ, মাগুরা, পাগলাপীর হয়ে রংপুর যাবো। এগুলো গ্রামের রাস্তা। কিশোরগঞ্জ পার হওয়ার আগেই সন্ধ্যা নেমে গেছে। কিন্তু এদিকে রাতে থাকার জায়গা নেই। আরো ৩০ কিঃমিঃ যেতে হবে। রাস্তার দুপাশে বড় বড় ধানক্ষেত তারপর গ্রাম। আশেপাশে জনবসতি নেই। অন্ধকার রাত। হালকা কুয়াশা পড়ছে। আকাশ ভরা নক্ষত্র। আমার আবার তারা দেখার বাতিক আছে। রাস্তার দুপাশে ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি। সাইকেল চালাতে ইচ্ছে হচ্ছিলো না, আবার থামলেও হবেনা, রংপুর অনেক দূর। শেষে সাইকেল রেখে রাস্তায় বসে একটা সিগারেট খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ততক্ষন চুপচাপ জোনাকি আর তারা দেখা। তারপর আবার চলতে শুরু করেছি। কয়েক কিঃমিঃ যাওয়ার পর কয়েকজন এসে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়াইছে। অন্ধকার জনবসতিহীন রাস্তায় বুঝতে বাকি রইলো না ছিনতাইকারীর কবলে পড়ছি। তাদের একজন বললো দশটাকা দেন। ততক্ষণে আরো নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম আজকে সবকিছু এখানেই খোয়াতে হবে। পরে তারা বললো এদিকে খুব ডাকাতি হয়। তারা গ্রাম পাহারা দেয়, প্রত্যেকটা যানবাহন থেকে দশ টাকা নেয়। সেই যে তীব্র ভয় আর আতঙ্ক ঢুকেছে মনে, রংপুর পৌঁছানোর আগে আর কাটে নাই।

12239206_866023513516140_7097657654260411226_o

ঢাকাতে নানান কারণে দেরি হয়েছে। এটা পোষানোর জন্য সন্ধ্যার পরও কিছুক্ষণ চালানোর কথা ভাবছি। সায়েদাবাদ যখন পার হই তখন সন্ধ্যা শেষ। রাত নয়টার ভিতর নারায়ণগঞ্জ। পরে ভাবলাম নারায়ণগঞ্জ না থাকি, মেঘনা ঘাটের আগে পরে কোথাও থাকবো। আরো একটু পথ আগানো হবে। কিন্তু এটা মারাত্নক ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। সামনে থাকার কোন হোটেল নাই। বাজারগুলো ছাড়া মাইলের পর মাইল জনবসতি নাই। হতাশ হচ্ছিলাম খুব, ভয় লাগতেছিলো। নিজেকে রিকি মার্টিনের গান বুঝাচ্ছিলাম Every endless night, has a dawning day. Every darkest sky, has a shining ray. বিপদ কাটবে, আলো আসবে। মেঘনা ব্রিজ পার হওয়ার সময় দেখি ঘড়িতে রাত এগারোটা। চালানো নিরাপদ নয় দেখে সব বড় ব্রিজ হেঁটেই পার হয়েছি। ১ কিঃমিঃ চওড়া মেঘনাও ব্রিজের ফুটপাথের উপর দিয়ে পার হচ্ছিলাম। একটু পর তীব্র বাতাসের কবলে পড়েছি। মাঝনদীতে যখন পৌঁছেছি তখন মনে হচ্ছিলো বাতাস ঝাপটা দিয়ে আমাকে বিশাল মেঘনায় ফেলে দিবে। নদীর ওপাড়ে একটা দোকানে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছিলাম আশেপাশে হোটেল কোথায় পাওয়া যাবে? বললো আশেপাশে নাই, এমনকি দাউদকান্দিতেও না পাওয়ার চান্স আছে। তারা অবাক হলো সোনারগাঁয়ের পর বাকি পথটুকু কিভাবে আসছি এটা ভেবে। এই পথে প্রতিদিন ডাকাতি হয়। এর আগেরদিনও একজন ট্রাক ড্রাইভারকে কুপিয়ে হাতের আঙ্গুল সব ফেলে দিয়েছে। সেদিন রাতে কোন মসজিদে থেকে যেতে পারতাম। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে আমার কাছে কোন ফুলপ্যান্ট নাই। দুইটা প্যান্ট ছিল, দুইটাই থ্রি কোয়ার্টার। এটা পরে নিশ্চই মসজিদে ঢোকা যাবেনা। শেষ পর্যন্ত ঐদিন ঐ দোকানদারের বাসায় ৩০০ টাকার বিনিময়ে থাকার ব্যাবস্থা হয়েছিলো। ঐদিনের হিসেবে ওটা আমার জন্য ফাইভ স্টার মানের ব্যাবস্থা।

চকরিয়ার পর সন্ধ্যার অন্ধকারে হেডল্যাম্প জ্বালিয়ে সাইকেল চালাচ্ছিলাম। লামা/রামুর একটা জায়গা এরকম দুপাশে পাহাড় জঙ্গল, বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যও। এমনিতেই এরকম রাস্তায় গা ছমছম করছিলো। হঠাৎ হেডল্যাম্পের আলোতে দেখি দূরে দুইটা চোখ জ্বলজ্বল করছে। সাইকেল থামিয়ে দিলাম। সাথে সাথে মাটি থেকে চোখের উচ্চতা মাপার চেষ্টা করলাম। কুকুর বিড়ালই হবে। হুঁ বড়সড় বিড়ালই ছিল।

প্রথম কয়েকদিন খুব শারিরীক কষ্ট হয়েছে। সকালে একদিনও বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে হতো না। রাতে হোটেলে ঢোকার পর ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে যেতো। প্রিয় মানুষের সাথে ঠিকঠাক কথা হতো না। মনে মনে বলতাম, পারবোনা হতে আমি রোমিও/ রাত দশটা বাজলে তুমি ঘুমিও/ আসতে হবেনা আর ভাইবারে।

12119799_1714355762126819_1640439592_o

শেষদিন যখন দেশের সর্ব দক্ষিণের থানা টেকনাফ জিরো কিঃমিঃ পৌঁছেছি তখন খুব খারাপ লাগতেছিলো। টেকনাফ জিরো কিঃমিঃ দেশের শেষ সীমান্ত না, স্থলভাগের শেষ হচ্ছে শাহপরীর দ্বীপ জেটি ঘাটের শেষ প্রান্ত। টেকনাফ থানা সদর থেকে তেরো কিঃমিঃ। বাকি এই পথটুকুতে ফেলে আসা দীর্ঘ পথের টুকরো টুকরো স্মৃতি খুব যন্ত্রণা দিয়েছে। মনে পড়ে যাচ্ছিলো সেই প্রথমদিনের বিকেলের কথা, পঞ্চগড়ের অমরখানা ইউনিয়নে পৃথুরাজার খনন করা দীঘির পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখেছিলাম। ওটার নাম মহারাজা দীঘি।

দেখতে দেখতে পথ চলা। হুটহাট যেখানে সেখানে থেমে খাওয়া শুরু করা। ফেরিওয়ালার কাছ থেকে ছানার মিষ্টি কিনে খাওয়া। এগুলো ভালো স্মৃতি। দুপুরবেলার গরমে সাইকেল একপাশে রেখে জামাকাপড় খুলে গামছা পরে নদীতে নেমে গোসল করে ফেলেছি। গোসল করেছি মহানন্দা করতোয়া যমুনা সহ অনেক নদীতে। রাস্তায় দশ বারো কিঃমিঃ এর ভিতর হয়তো কিছু নেই। দুপুর তিনটার দিকে রাস্তার একপাশে গাছের ছায়ায় শুয়ে পড়েছি ব্যাগকে বালিশ বানিয়ে। ঘন্টাখানেক বিশ্রাম। পাশের বিশাল বিল বা বিস্তৃর্ণ ধানক্ষেত থেকে হু হু বাতাস আসতেছে। এই সময়গুলো অসাধারণ। সারাজীবন মনে থাকার মতো কিছু।

দেশটা এত সুন্দর, বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয় খুব। শঙ্খচিল শালিকের বেশে আবার ফিরে আসতে মন চায়।

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-