একটি আনসেন্সরড ফেসবুক জেনারেশনের ইতিবৃত্ত

আলম নামে এক নতুন আশাবাদী নায়ককে দেখা যাচ্ছে ইদানিং ফেসবুকে। তার অভিনয়, অঙ্গভঙ্গি, ভাষা, উচ্চারণ, এমনকি কাজের ধরন দেখলেই সবার হাসি পায়, আমার রাগ হয়। সবাই লিখছে- ‘ইনি নায়ক নাকি জোকার!’ ট্রল হচ্ছে, অজস্র মানুষ পঁচাচ্ছে, কর্মকান্ডে বিনোদিত হচ্ছি। একজন লিখলো- “কুইচ্চা কালা, নায়ক হবার শখ জাগছে এই চেহারা নিয়ে!”

…আ…ওয়েট আ মিনিট…কালো বলে বকা দিলেন কেন?

অন্য যেকোনো কিছু নিয়ে সমালোচনা করেন। রেসিজমের ভয়াবহতায় কত মেয়ে সুইসাইড করে জানেন? কত মানুষ নিজের মনের দুয়ার অবরুদ্ধ করে রাখেন! আল্লাহ না করুক- আপনার বাচ্চা কখনও প্রতিবন্ধী/অটিজম আক্রান্ত হলে? ফানি থিং? তাছাড়া কেউ কালো হলে নায়ক/অভিনেতা হতে পারবে না? আমি তো ভাবতাম ‘মর্গান ফ্রিম্যান’-কে চেনে না এমন কম আছে! কোথায় যাচ্ছি আমরা?

টুনটুনি আদ্রিতা নামের এক আপু আছেন। ‘সামান্য মেকআপ’-এর নামে উনার পাউডারের পরিমাণ আর উনার ভিডিওগুলা দেখলে না হেসে পারা যায়না! সবাই পঁচানি দেয়! পঁচানি সইতে না পেরে তিনি ভিডিও দিলেন, কষ্টে বালতি থেকে পানি চোখে দিয়ে কাঁদছেন! কামকাজ দেখে হাসিও পায়, রাগও লাগে! রাতারাতি ব্যপক পরিচিত হতেই ট্রল করে তার নাম দেয়া হলো- “হাতিপু” (মোটা বলে)…আমি এই ব্যঙ্গ করা দল থেকে নিজেকে সেদিনই সরিয়ে নিলাম।

বন্ধু ও পরিচিতমহলে মজা করতে আমাদের একেকজনের ডাকনাম ছিলো- মমি বয়, ফাক হিম (ফাহিম), ধর্ষনিক, দালাল, গইঞ্জা (না’গঞ্জে বাড়ি), কালিয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। কাউকে এই নামে ডাকতে তার সাথে অধিকারের সম্পর্ক ঐ পর্যায়েই হতে হয়, কিন্তু অপরিচতি কেউ এসে যদি ডাকে! যদি বলেন- সোশ্যাল মিডিয়া একটা উন্মুক্ত প্লাটফর্ম, বিশেষ করে তথাকথিত এডাল্ট গ্রুপগুলোতে যেকোনো মন্তব্যই ‘জায়েজ’, এখানে যে কেউ যা ইচ্ছে বলতে পারে, আমি মেনে নেব। এই জেনে যে কাল আপনাকে/আপনার বোনকে নিয়েও ট্রল হলে মেনে নিবেন!

এক ভাই এই আপুকে নিয়ে মজা করে একটা প্রেমের চিঠি লিখে সেটার ছবি পোষ্ট করেছে। কয়েকজনের কমেন্ট, “সানি কি সইতে পারবে হাতিপুর যাতা?”, “কোমড়ে জোর থাকা লাগবে বুঝলা!” এডাল্ট গ্রুপের হিসেবে এই রকম পোষ্টে এ ধরনের কমেন্ট তো দুধভাতই! শুধু তাই নয়, কয়েকজন তো আগ বাড়িয়ে লিখলেন, ‘তোকে দুচবো *গি!’

বাহ!

আমরা কী চমৎকার এডাল্ট, আনসেন্সরড! হুজুগে বাঙালির এভাবেই বুঝে না বুঝে পচানিকে নিয়ে গেছে নোংরামির পর্যায়ে।
পুকুরে ব্যাঙ আর দুষ্টু ছেলের ঢিল ছোড়ার গল্পের মতো সবাই বন্য উল্লাসে মেতে উঠেছে যেন! তার মন খারাপের সংবাদের চেয়ে বিনোদনের আর কিছু পৃথিবীতে নেই। তাকে উদ্দেশ্য করে বলা খুব কমন কিছু কমেন্ট-

“তোর বাপ-মা যদি ভাগ্যক্রমে ঐদিন কন্ট্রোল করতো, তাইলে জাতি বেঁচে যেত!”
“জনি সিন্স দিয়ে দুচাব। আবাল কোথাকার”
“আমি শিউর তুই বাংলাদেশি প্রোডাক্ট না, যুদ্ধের সময় পাকিস্তানিরা খেলেছে”

আচ্ছা আমরা উনার পিছনে এত লেগেছি কেন? উনি অনেক মেকাপ মারেন, ঢং করে কথা বলেন, কথা শুনলে হাসি পায়, এত পচানির পরেও আবার পোষ্ট করেন? এগুলো কি তুই-তোকারি আর বেশ্যাদের গালি শোনার মতো অপরাধ? হলফ করে বলুন তো? সে কি কাউকে গালি দিয়েছে? তার কথা আপনার ভাল লাগছে না, এড়িয়ে যান। তাকে জানোয়ারের বাচ্চা বলে, কুৎসিত সব গালি দিয়ে নিজের পরিবারের কী পরিচয় দিচ্ছেন!

কিছুদিন আগে তার ফোন চুরি হয়ে ব্যক্তিগত কিছু ছবি প্রকাশ হলো, এরপর সবাই সেই ছবি আপ দেয়া শুরু করলো। এমনকি সে ‘আমাকে নিয়ে ট্রল ভিডিও বানাও, তাও প্লিজ ছবিগুলা আপ দিয়ো না’ বলে অনুরোধও করেছে! অতঃপর কমেন্ট আসতে লাগলো- ‘আগেই বলছিলাম এইটা একটা *গি! সে তো কখনও এসব ছবি আপ দেয় নাই!’ এখন একজন প্রেম করে তার নিজস্ব ফোনে ব্যক্তিগত ছবি তুলবে কি রাখবে সেটা তার ব্যাপার। ছবি তুলে সে কি অপরাধ করছে?

জাতি হিসেবে আমরা আসলে কোথায় যাচ্ছি? ইদানিং তো আমার মনে হয়- এই এডাল্ট গ্রুপগুলা যতটা না বিনোদনের সুযোগ দিচ্ছে, তার চেয়ে বেশি অনেক বেশিই বিবেক-মনুষ্যত্ববোধ নিয়ে যাচ্ছে!

১৮+ প্রাপ্তবয়ষ্কই হচ্ছি শুধু, প্রাপ্তমস্তিষ্কের অধিকারী কবে হব?

 

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-